জোট-ভোট এই শব্দ দুটি নির্বাচন সামনে রেখে অন্যভাবে আলোচনায় আসে। এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটছে না। রাজনীতির মাঠে এরই কিছু চিত্র দৃশ্যমান। আগামী বছর যেহেতু জাতীয় নির্বাচন হবে, সেই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলো চেষ্টা করছে ভোটে জেতার কৌশল নির্ধারণ করতে। এই কৌশলেরই অংশ জোটবদ্ধ হওয়া। কার্যত নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, মনোনয়নের বিষয়টি ততই গুরুত্ববহ হয়ে উঠবে এবং সেই নিরিখেই হিসাব-নিকাশ হবে। এই নিয়ে রাজনীতির মেরূকরণ দৃশ্যমান হয়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। আমরা কিছু প্রক্রিয়া এরই মধ্যে দেখেছিও। বর্তমান সরকার টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে। দীর্ঘ সময়ে তারা কতটা সফল বা ব্যর্থ- এরও বিশ্নেষণ ফের নতুন করে শুরু হবে।

দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নেতৃত্বের। বিএনপির অন্যতম শীর্ষ নেতা তারেক রহমান বিদেশে। দেশের বাইরে থেকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভূমিকা রাখা বিশেষ করে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে কিংবা তাদের আস্থায় আনতে সমস্যার মুখোমুখি কেন হতে হয়; সচেতনদের এগুলো না বোঝার কোনো কারণ নেই। তা ছাড়া তারেক রহমানের সঙ্গে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বয়সের পার্থক্য অনেক। জ্যেষ্ঠরা নেতৃত্বের ব্যাপারে অন্তর্গতভাবে কতটা তাঁকে মান্য করেন- এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। আমরা দেখেছি, এর মধ্যে কেউ কেউ দল থেকে চলেও গেছেন। এ ক্ষেত্রে শমশের মবিন চৌধুরীর প্রসঙ্গ বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। তিনি দলত্যাগের পর অনেকটাই যেন আওয়ামী লীগের ভাষায় এখন কথা বলেন। এটি একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। এই ধরনের পরিবর্তন দলের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিএনপির সমস্যা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যতটা না আওয়ামী লীগ- তার চেয়ে বেশি তারা নিজেরাই। দলের ভেতরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব কিংবা অনেক ক্ষেত্রেই জ্যেষ্ঠদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি তাদের রাজনীতির জন্য সুফল বয়ে আনছে না। তা ছাড়া বিএনপির অনেক নেতাই আইনগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতেও জটিলতার মুখোমুখি হবেন। এ পরিস্থিতি কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত তাদের ক্ষেত্রে রয়েছে। বিরোধীপক্ষের রাজনীতিকদের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করার যে বিষয়গুলো বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে অতি জরুরি হয়ে দাঁড়ায়, তা তারা করতে পারছে না নেতৃত্ব পর্যায়ে বিভাজন কিংবা জ্যেষ্ঠদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ দানা বেঁধে থাকার কারণে।

বিএনপি তাদের জোটের ব্যাপারে ইতোমধ্যে কিছুটা সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বটে; কার্যত তা এখনও বেশি দূর এগোয়নি। তারা তাদের নতুন মিত্রের সন্ধানেও রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেখছি, তাদের তরফে এমন কিছু করা সম্ভব হয়নি, যাতে জনগণের আস্থা তারা অর্জন করতে পারে। তাদের দিকে জনসমর্থন ২৫ থেকে ২৭ শতাংশের মতো লক্ষ্য করা গেলেও এটুকু পুঁজি করে বড় কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দেখছি না। জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে তাদের নিজেদের মধ্যেই ব্যাপক কথা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসন্তোষও দেখা গেছে। তাদের অনেক নেতাই মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গ ছাড়লে তাঁরা আরও সংকটে পড়বেন। তাঁরা এও মনে করেন, জামায়াত যদি তাঁদের সঙ্গে থাকে, তাহলে এই শক্তির সমর্থকরা তাঁদের জন্য একটা বাড়তি শক্তি।


জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমেই নিম্নমুখী। তাদের রাজনীতি বা এ প্রজন্মের কাছে তাদের অবস্থান সবকিছুই একাত্তরের প্রেক্ষাপটে এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি পর্যালোচিত। তাই জামায়াতের পক্ষে সেভাবে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। অন্য ইসলামী উগ্রবাদীদের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার কারণে বিদেশিদের চোখেও এখন তারা অনেকটা অস্পৃশ্য। কারণ উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এখন একটি বড় ইস্যু। তার পরও বিএনপির অনেক নেতা এখনও মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকলে উল্লেখযোগ্য সুফল তাঁরা পাবেন। বাস্তবতা কিন্তু এখন আর সে রকম নয়- এটিও আমলে নেওয়া প্রয়োজন তাদেরই রাজনৈতিক স্বার্থে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা কেন এ ব্যাপারে বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তাঁদের চিন্তায় নতুনত্ব আনছেন না, তা তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন। এক সময় জামায়াতকে সঙ্গে রেখে বিএনপি যে রাজনৈতিক লাভ গুনেছে, সেই প্রেক্ষাপট এখন বদলে গেছে বলে মনে করি।

বাম রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা ছন্নছাড়ার মতো। কয়েকটি বাম দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। আবার কয়েকটি আছে শুধু ভাঙাগড়ার খেলায়। বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে বামদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দেশে খুব একটা ভালো বলে মনে হচ্ছে না। বাম দলগুলো দুটি শিবিরে বিভক্ত আগে থেকেই। একটি ধারা চীনপন্থি, অন্যটি রুশপন্থি। তাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, স্বতন্ত্র ধারায় এখানকার অবস্থার প্রেক্ষাপটে নিজেদের দাঁড় করাতে না পারা। মস্কো আর বেজিং যখন তাদের বাম রাজনীতি অন্যভাবে নিয়ে গেল, তখন এখনকার বামেরা পড়ে গেলেন আরও বিপর্যয়ের মধ্যে। এক সময় যাঁরা দেশে বাম রাজনীতির নীতি বা পথনির্দেশক ছিলেন, বিশেষ করে ইন্টেলেকচুয়াল ফোর্স; তাঁদের কেউ কেউ পরে বিশ্বব্যাংক কিংবা এ রকম অন্য সংস্থার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের এই বাঁকটা যেন সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁদের উত্তরসূরি অনেকের বসবাসও এখন বলতে গেলে পশ্চিমা বিশ্বে। বুদ্ধিবৃত্তিক বাম রাজনৈতিক শক্তি গড়তে যতটুকু চেষ্টা এখানে হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাঁরা সেই ধারায় সেভাবে আর থাকলেন না।

দেশের বাস্তবতা আমলে না রেখে কিংবা প্রাধান্য না দিয়ে অন্য কারও ওপর নির্ভরতা রেখে রাজনীতিতে পরিবর্তন আনা দুরূহ। এখনও তাঁরা তাঁদের নিজেদের দূরদর্শী চিন্তাধারায় কিংবা বাংলাদেশ সামনে রেখে কাঙ্ক্ষিত বাম রাজনীতি করতে পারছেন না। একই সঙ্গে এও লক্ষণীয়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার বিশেষ করে আওয়ামী লীগ বামদের অনেক রাজনৈতিক এজেন্ডাই নিয়ে নিয়েছে। তৃণমূলে বামরা সেভাবে শিকড়ই গাড়তে পারেননি। তাই তাঁদের এদিক-ওদিক ছোটাছুটিতে বাম রাজনীতির কোনো চমক আশা করা দুরাশার নামান্তর।

অনেকটা একই চিত্র এখন দৃশ্যমান জাতীয় পার্টিতেও। এরশাদের মৃত্যুর পর তাঁদের মধ্যে নেতৃত্বের সংকটের পাশাপাশি এক ধরনের রশি টানাটানি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে তাঁদের সমর্থক বা ভোট দেশের সর্বত্রই কমবেশি আছে, কিন্তু তা এমন কিছু নয় যা দিয়ে তাঁরা একক শক্তিবলে কাজে লাগতে পারবেন। এরই মধ্যে কখনও কখনও তাঁদের নেতৃত্ব সংকট বড় হয়ে সামনে এলেও জোড়াতালি দিয়ে যেভাবে ধরে রাখার চেষ্টা চলছে, তা শেষ পর্যন্ত কতটা স্থায়িত্ব পাবে, বলা কঠিন।

এতদিন আমরা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যেও এক ধরনের টানাপোড়েন লক্ষ্য করেছি। জোটভুক্ত ছোট দলগুলোর নেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সম্প্রতি হঠাৎ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাদের নেতৃত্বাধীন জোটকে সক্রিয় করার চেষ্টা চালাতে দেখা গেছে। ইতোমধ্যে সৃষ্ট মানসিক দূরত্ব কাটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচির কথাও ভাবা হচ্ছে। তাঁদের অনেকেরই যে ক্ষুব্ধ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে, তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে মনোনয়নকেন্দ্রিক বললে অত্যুক্তি হবে না। তাঁদের যাঁরা এখন জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাঁরা তাঁদের নিজেদের শক্তিবলে নয়; আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থাকার কারণেই তা পারছেন। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এ রকম ক্ষুব্ধতার প্রকাশ হয়তো আমরা আরও দেখব, যার লক্ষ্য হবে মূলত মনোনয়ন। তাঁদের এককভাবে নির্বাচনে জেতার সুযোগ আছে কি? এই জোটের ছোট দলগুলো থেকে যাঁরা মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন, তাঁরাও খুব যে দক্ষতা দেখাতে পেরেছেন, তা নয়।

আওয়ামী লীগ অত্যন্ত পুরোনো রাজনৈতিক দল। তাদের তৃণমূল পর্যন্ত ভিত্তি এখনও মজবুত। কিন্তু তাদের এখন সবচেয়ে জরুরি হলো জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও নিবিড় করা। তাদের কারও কারও দুর্নীতি, অনিয়ম, রাজনৈতিক অস্বচ্ছতা ইতোমধ্যে অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। তাদের এখন থেকেই মনোনয়নের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক-সজাগ অবস্থান নিতে হবে। যত কৌশলই করা হোক; প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের জন্য স্বচ্ছতা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি জনগণের ওপর নির্ভর করতে হবে। সাধারণ মানুষ কিন্তু অনেক কিছু চায় না। তারা অনেক কিছু বুঝতেও চায় না। এই যে মেরূকরণ, এর সমীকরণ নিয়েও তারা মাথায় ঘামায় না। তারা তাদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিকভাবে চালাতে পারছে কিনা, এটাই বিবেচনায় রাখবে। টানা দীর্ঘ মেয়াদে এ সরকারের শাসনামলে উন্নয়ন-অগ্রগতির সড়ক অনেক চওড়া হয়েছে- তা অসত্য নয়। কিন্তু টেকসই উন্নয়নের জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে হবে ও ক্ষতের উপশম ঘটাতে হবে। মানুষের মনের ভাষা বুঝতে হবে। এত উন্নয়ন-অগ্রগতি সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ নানা করণে তুষ্ট নয়। সর্বাগ্রে এটুকু বোঝা আওয়ামী লীগের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়