শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগামী ১২-ঊর্ধ্ব শিশু অধিকাংশের করোনার টিকা দেওয়ার খবরে যতটা আশান্বিত হয়েছি, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা শিশুদের বঞ্চনা আমাদের ততটাই শঙ্কিত করেছে। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশ, শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ঝরে পড়া ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় এক কোটি শিশু-কিশোরের টিকার আওতায় আনতে সরকার এখন পর্যন্ত কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। আমরা মনে করি, শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট বয়সের সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ওই বয়সের ঝরে পড়া শিশুদেরও টিকা নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা জানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া বাংলাদেশের দুঃখজনক বাস্তবতা। করোনার কারণে প্রায় দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়ার হারও বেড়েছে। শুধু এই বাস্তবতায়ই নয়, বরং নাগরিকের সুরক্ষার স্বার্থেই নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সবাইকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। তার চেয়েও বড় যে প্রশ্ন উঠছে তা হলো টিকার ন্যায্যতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তো বটেই, আমাদের মনে আছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিশ্ব ফোরামে টিকার ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। সেদিক থেকেও পড়াশোনার বাইরে থাকা শিশুদের টিকার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা না থাকা বিস্ময়কর।
এটা সত্য, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সবাই টিকার জন্য নিবন্ধন করতে পারছেন। এমনকি ১২ বছরের ঊর্ধ্বে যাদের ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন রয়েছে তারাও সরকার নির্ধারিত সুরক্ষা ওয়েবসাইট কিংবা অ্যাপের মাধ্যমে টিকার নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারছে। কিন্তু যেসব শিশুর ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন নেই, তারা কী করবে? আমরা দেখছি, যেসব শিশু পড়াশোনা করছে তারা অ্যানালগ জন্মনিবন্ধন দিয়েও সংশ্নিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টিকা নিতে পারছে। প্রশ্ন হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে যেসব শিশু রয়ে গেছে, তাদের দায়িত্ব কে নেবে? আমরা মনে করি, তাদের জন্য সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা জানি, যেসব শিশু শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ঝরে যায় তাদের অধিকাংশের পরিবারেই অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবার অসচেতনতার কারণেও শিশুরা ঝরে পড়ে। ঝরে পড়া এসব শিশুর উল্লেখযোগ্য অংশেরই ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন থাকার কথা নয়।
সে জন্য তাদের টিকার আওতায় আনতে হলে অন্য মাধ্যমে তাদের বয়স নিশ্চিত করা যায়।
স্কুলের বাইরে থাকা শিশুর করোনার টিকা দিতে প্রশাসনের বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করা প্রয়োজন। প্রথমত, স্কুলের শিশুদের মতো তাদেরও অনলাইনে নিবন্ধনের শর্ত শিথিল করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জন্মনিবন্ধনের বিকল্প হিসেবে তাদের জন্য কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। যেসব শিশু পঞ্চম শ্রেণির পর ঝরে পড়েছে তারা টিকাকেন্দ্রে গিয়ে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষার সনদ দিয়ে টিকা নিতে পারে। যারা পঞ্চম শ্রেণি সমাপ্ত করতে পারেনি তাদের বয়স নিশ্চিতে যে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল, সেখানকার প্রধান শিক্ষকের প্রত্যয়নের মাধ্যমে তাকে টিকা দেওয়া যেতে পারে। এর বাইরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির প্রত্যয়ন কিংবা শিশুর সাধারণ টিকাকার্ড প্রদর্শনের মাধ্যমেও বয়স নিশ্চিত হয়ে তাকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব।
আমরা মনে করি, ঝরে পড়া শিশুর বয়সের প্রমাণ পাওয়া কঠিন নয়। কিন্তু টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের তালিকা যাতে প্রশাসনের কাছে থাকে, তা নিশ্চিত করা চাই। বস্তুত টিকা দেওয়া প্রত্যেক নাগরিকেরই জাতীয় নিবন্ধন থাকা জরুরি। শিশুদেরও টিকা দেওয়ার পর সেই নিবন্ধনের আওতায় এনে তাদের টিকা সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু সংখ্যা কিন্তু কম নয়। যেহেতু টিকার সংকট নেই সেহেতু প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা। আমরা প্রত্যাশা করি, প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে শুধু নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সব শিশুকেই টিকার আওতায় আনবে না; একই সঙ্গে যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা জন্মনিবন্ধন নেই তাদেরও টিকা দেওয়ার পথ মসৃণ করবে।