সুন্দরবনের চারপাশে নির্ধারিত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন ১০ কিলোমিটার এলাকা তথা ইসিএ (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া) 'পর্যালোচনা' করার যে উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, সেটাকে সরলভাবে দেখার অবকাশ নেই। শনিবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের এমন ভাষ্য আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। মন্ত্রণালয়ের সচিব যদিও বলেছেন, এরই মধ্যে উত্থাপিত কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য এই পর্যালোচনা; পাল্টা প্রশ্ন হতে পারে- কারা এই প্রশ্ন তুলছে? আমরা জানি, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুসারে ১৯৯৯ সালেই দেশের প্রথম ইসিএ ঘোষণা করা হয়েছিল সুন্দরবন ঘিরে। প্রাকৃতিক এই ম্যানগ্রোভের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে এর বিকল্পও ছিল না। বস্তুত মূল প্রতিবেশ অঞ্চলের চারপাশে এভাবে 'ডোন্ট ডিস্টার্ব জোন' গড়ে তোলা বৈশ্বিকভাবেই স্বীকৃত সুরক্ষা ব্যবস্থা। প্রতিবেশী ভারতেও বন ও বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ কৌশল হিসেবে এই সীমারেখা ১০ থেকে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এখন, দুই দশকেরও বেশি সময় পরে এসে যারা এর 'বৈজ্ঞানিক ভিত্তি' নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তারা আর যা-ই হোক সুন্দরবনের মঙ্গল চাইতে পারে না। আমরা আশঙ্কা করি, যারা সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় পরিবেশ দূষণকারী কলকারখানা স্থাপন করেছে এবং স্থাপন করতে দিয়েছে; এই 'পর্যালোচনা' তাদেরই স্বার্থ রক্ষার অপপ্রয়াস।

আমাদের মনে আছে, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা সুরক্ষায় ২০১৭ সালের আগস্টেই উচ্চ আদালত সেখানে নতুন কোনো শিল্পকারখানা স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা এবং বিদ্যমান স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। নানা গড়িমসির পর আদালতের নির্দেশে ২০১৮ সালের এপ্রিলে সুন্দরবনের ইসিএ এলাকায় বিদ্যমান স্থাপনার তালিকা উপস্থাপন করেছিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। এতে থলের বেড়াল বের হয়ে এসেছিল। তখনই দেখা গিয়েছিল, বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ সুন্দরবনের আশপাশে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ১৯০টি শিল্পকারখানা রয়েছে, যেগুলো রীতিমতো 'অনুমোদিত'। তার মধ্যে ২৪টিই ছিল 'লাল' শ্রেণিভুক্ত বা ব্যাপক হুমকিমূলক। এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, উচ্চ আদালতে উপস্থাপিত ওই 'সরকারি' প্রতিবেদনের ভাষ্যের চেয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও নাজুক ছিল। গত কয়েক বছরে পরিস্থিতির আরও যে অবনতি ঘটেনি- সে নিশ্চয়তাই বা কে দেবে? উচ্চ আদালতের নির্দেশনা প্রতিপালন দূরে থাক; এখন এসে খোদ ইসিএর 'পর্যালোচনা' কি অবৈধ স্থাপনাগুলোকেই বৈধতা দেওয়ার পাঁয়তারা? প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা এবং এর দায়-দায়িত্ব নিয়ে সমকালের কাছে বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে চাপানউতোরের যে চিত্র সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সেটাও যথেষ্ট সন্দেহজনক।

আমরা মনে করি, বিদ্যমান ইসিএর পর্যালোচনা হতে পারে শুধু এই অর্থে যে, এরই মধ্যে স্থাপিত কলকারখানা কীভাবে সরিয়ে নেওয়া এবং নতুন স্থাপনা কীভাবে রোধ করা যায়। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার সরল ও স্পষ্ট মর্মার্থ সেটাই। তার বদলে ইসিএ এলাকা কমিয়ে আনার অর্থ হবে রাষ্ট্রের নিজের ঘোষিত আইন ও নীতির বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের অবস্থান।

মনে রাখতে হবে, সুন্দরবনের নির্বিঘ্ন থাকা শুধু বনটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশ্বের বৃহত্তম এই প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক, প্রতিবেশগত এমনকি সাংস্কৃতিক তাৎপর্য গভীরভাবে জড়িত। এই বন যেমন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগে আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে, তেমনই এর বনজসম্পদ দেশের অর্থনীতিতে বিপুল ভূমিকা রেখে চলেছে। জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে এই বনের স্বাতন্ত্র্যও বিশ্বে বাংলাদেশকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। বিবিধ গুরুত্ব, তাৎপর্য ও স্বাতন্ত্র্যই কিন্তু সুন্দরবনকে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল ও রামসার সাইটের মর্যাদা দিয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত এত গুরুত্ব সত্ত্বেও সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যান্ত্রিক নৌযান চলাচল, বনদস্যুদের গাছ ও প্রাণী শিকার এর স্বাভাবিক প্রতিবেশ বিনষ্ট করে চলেছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এসেছে সুন্দরবনের চারপাশে ক্রমবর্ধমান হারে কলকারখানা স্থাপন। এর ওপর যদি ইসিএ এলাকা কমিয়ে আনা হয়, তাহলে বনটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ কতটা বজায় থাকবে?