গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের একজন মানুষ হিসেবে অত্যন্ত মর্মাহত বোধ করছি। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এমন নৃশংস ও নির্বিচার হামলায় বিক্ষুব্ধ তো বটেই। একটা পরাজয়ের বোধেও আক্রান্ত হচ্ছি।
দীর্ঘ কয়েক দশকের আন্দোলন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। সেই মুক্তিযুদ্ধ প্রথাগত সামরিক যুদ্ধ ছিল না যে, কোনো সেনাপতি নির্দেশ দেবেন আর সৈনিকরা ঝাঁপিয়ে পড়বে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ, আদর্শিক যুদ্ধ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা শুনে এদেশের ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। স্বাধীন বাংলাদেশে সব নাগরিক সমান অধিকার পাবে; সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে- এমন একটি স্বপ্ন নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম।
মনে আছে, গণজাগরণ মঞ্চ আয়োজিত এক চিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন করতে গিয়েছিলাম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর তাঁবুর ভেতর বসে ছিলাম। আমার পাশে এসে একজন বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন। চেহারা ও পোশাক দেখেই বোঝা যায়, খেটে খাওয়া মানুষ। আয়োজকরা তাকে জিজ্ঞেস করল, কী দেখছেন? বলেছিলেন- 'আমাগোরেই দেখতেছি'। তার ছবি ওই প্রদর্শনীতে ছিল না। কিন্তু তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে নিজের ছবিই দেখতে পেয়েছিলেন। এই যে 'আমিও তাদের একজন' অনুভূতি, সেটা বোধহয় আমরা হারিয়ে ফেলছি। হিন্দু জনগোষ্ঠীর মন্দির, বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা হচ্ছে; কিন্তু কোনো প্রতিরোধ দেখতে পাচ্ছি না। এই আক্রমণ যে আমাদের ওপরেও, সেটা অনুধাবন করতে পারছি না।
এই পরিস্থিতির ঐতিহাসিক কারণ নিশ্চয়ই রয়েছে। পঁচাত্তরের মর্মান্তিক পট পরিবর্তনের পর পরবর্তী কয়েক দশক রাষ্ট্রীয়ভাবে সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ২০০৮ সালের পর থেকে তো টানা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে! তাদের ক্ষমতাও নিরঙ্কুশ। তারপরও এভাবে সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপকতা এত বৃদ্ধি পেল কেন?
অনস্বীকার্য যে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি হয়েছে ও হচ্ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, জীবনমানের উন্নতি হয়েছে। এখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে- আমরা একটি বহুপাক্ষিক ও সহিষুষ্ণ সমাজ তৈরি করতে পারলাম না কেন? মানবিকতা, সামাজিকতা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ধস নামলো কেন? রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা স্বাস্থ্য- সব ক্ষেত্রে অনৈতিকতার অনুপ্রবেশ ঘটলো কেন? বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিশ্নেষণের দাবি রাখে। এই পরিস্থিতিতে আত্মপ্রেম থেকে বেরিয়ে আত্মবিশ্নেষণ জরুরি।
যারা রাষ্ট্র ও সরকারের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত, আত্মবিশ্নেষণে তাদের এত অনীহা বলেই আজ দেশের নাগরিকদের একটি অংশ কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিপন্ন। আমাদের এই ঔদাসীন্যের কারণেই- একদিকে যখন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা চলছে; তখন অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক শক্তিও একের পর এক অঘটন ঘটিয়ে চলছে। সর্বশেষ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা আমাদের যেন 'হতবুদ্ধি' করে দিল!
কুমিল্লায় মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের পর দিনই সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছিল যে, এসব ঘটনার পেছনে যারাই জড়িত থাকুক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তারপরও সাম্প্রদায়িক হামলা ও সহিংসতা থেমে নেই কেন? শুধু একটি এলাকায় নয়। কুমিল্লার পর চাঁদপুর, তারপর নোয়াখালী, সর্বশেষ রংপুরে বড় ধরনের সহিংসতা হয়েছে। এসব স্থানে হত্যা, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। দেশের আরও নানা এলাকায় অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার হামলা ও সহিংসতা ঘটেছে। আমার প্রশ্ন, একটি ঘটনাও ঘটবে কেন? একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, উৎসব ও স্থাপনা ঢিল ছোড়ার মতো ঘটনারও শিকার হবে কেন?
সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যেই জানা যাচ্ছে, হামলাকারীরা 'চিহ্নিত গোষ্ঠী'। সেটাই যদি হয়, তাদের আটক করা হচ্ছে না কেন? আরও বড় প্রশ্ন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে কেন?
শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নয়; আমরা যারা উদার, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে বিশ্বাস করি, তাদের কারও কাছেই বর্তমান পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করার কথা রাজনৈতিক দলগুলোর। কিন্তু ক্ষমতাসীন ও বিরোধী- উভয় পক্ষই পারস্পরিক দোষারোপ করে দায় এড়িয়ে চলছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, নাগরিকদের একটি অংশের জীবন, মর্যাদা ও সম্পদ যেন তাদের রাজনৈতিক খেলার বিষয়।
আমি বিশেষভাবে বলতে চাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কথা। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে এখন তারা প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টাও দেখছি না।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী চলছে। এ প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ তুলে ধরছি। আমার মা কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর প্রথম পরিচয় হয়েছিল কলকাতায়। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার পর ত্রাণশিবিরে কাজ করতে গিয়ে। বঙ্গবন্ধু তখন ছাত্রনেতা। সেই বয়েসেই তিনি দাঙ্গাকবলিত এলাকাগুলোতে ছুটে বেরিয়েছেন। আজকে যারা তার আদর্শের অনুসারী বলে নিজেদের পরিচয় দেয়, তাদের তো কোথাও আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
একটি সম্প্রদায়ের নাগরিকের ওপর এই যে নির্বিচার হামলা ও সহিংসতা চলছে, সেটা নিয়ে দায়িত্বশীল পদের ব্যক্তিদের দুঃখও প্রকাশ করতে দেখছি না! একমাত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখলাম, প্রাণহানির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু হামলার জন্য এবং তা ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্য তো দুঃখ প্রকাশ করলেন না!
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য ও ভঙ্গি দেখে প্রতিভাত হয়নি যে, তারা এই ঘটনার ব্যাপ্তি, গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন। এসব সহিংসতা কীভাবে একটি জনগোষ্ঠীর মনে আঘাত করছে, সে ব্যাপারে তাদের সংবেদনশীল বলে মনে হয়নি।
সরকারে যারা আছেন, বা নাগরিক সমাজে যারা আছি- সবারই এখন আত্মসমীক্ষা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি বলে নিজেদের যারা দাবি করি, বড় দায়িত্ব হচ্ছে তাকিয়ে দেখা- মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়া যায়নি কেন? কোথায় আমাদের ভুল হয়েছে? কোন কোন বিশেষ দিক গত ৫০ বছর ধরে আমাদের নজর এড়িয়ে গেছে? যার কারণে আজকে আমরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়েছি।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে আমাদের। তা না হলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। তবে সব কিছুর আগে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। যাতে করে আর একটি স্থাপনাতেও হামলা না হয়। আর একজন নাগরিকও নিজের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এই দেশে বিপন্ন বোধ না করে।