ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনে জাতীয় পার্টির এমপি ফখরুল ইমামের বিরুদ্ধে সরকারি ৬০ শতক জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, সেই জমিতে সরকারি অর্থে তিনি নিজ নামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ভবন করছেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তবে প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ-ই ফখরুল ইমামের বিরুদ্ধে কিছু বলতে সাহস করছেন না।

অভিযোগের বিষয়ে ফখরুল ইমাম বলেছেন, খাস জমি দখল করে সরকারি অর্থে বিদ্যালয় করার অভিযোগ সঠিক নয়। বিদ্যালয়ের জমি চেয়ে আবেদন করে বরাদ্দ পেয়েছি। তবে এখনও বরাদ্দের চিঠি হাতে পাইনি। স্থাপনা থাকলে দ্রুত অনুমতি মেলে বলে ভবন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়েই সব কিছু করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিয়ম হলো- জমি বরাদ্দের পর সেখানে ভবন করব। তারপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠাব। কিন্তু আবেদনের পর কর্মকর্তারা স্কুল ভবন করে একসঙ্গে প্রস্তাব পাঠাতে বলেন। এ জন্য নিজের পকেটের ১২-১৪ লাখ টাকায় মাটি ভরাট করেছি। সব প্রক্রিয়া শেষে সরকার মূল্য নির্ধারণ করে দিলে তা পরিশোধ করে দেব।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, সরকারি সম্পত্তি কারও নামে বরাদ্দ দেওয়ার আগ পর্যন্ত দখলের সুযোগ নেই। এমপির নামে কোনো জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। খোঁজ নিয়ে বিষয়টির সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়রা জানান, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কের পাশে মাইজবাগ ইউনিয়নের হারুয়া এলাকায় প্রায় ২৩০ শতাংশ খাস জমি রয়েছে। এর থেকে নিজের নামে বিদ্যালয় করার জন্য ৬০ শতক জমি দখল করেছেন এমপি ফখরুল ইমাম, যার মূল্য অন্তত ৩ কোটি টাকা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, 'ফখরুল ইমাম উচ্চ বিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠার জন্য জমি লিজ চেয়ে ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন এমপি। এতে বলা হয়, মাইজবাগ ইউনিয়নের ১ নং খাস খতিয়ানের আওতায় ৯৪১ দাগে কুমড়াশাসন মৌজায় ৬০ শতক জমি বরাদ্দ নিয়ে সেখানে এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি পূরণে 'ফখরুল ইমাম উচ্চ বিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যুক্তি হিসেবে স্থানটির আশপাশে ৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। যদিও ওই এলাকার দুই কিলোমিটারের মধ্যে মল্লীকপুর লক্ষ্মীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় এবং চার কিলোমিটারের মধ্যে জাটিয়া উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা জানান, ৫ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন বিদ্যালয় করতে হলে অনাপত্তি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এমপি আমাদের থেকে কিছুই নেননি।

এমপির আবেদন সংযুক্ত করে ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর আব্দুল্লাহ আল বাকিউল বারী উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সরেজমিন তদন্ত করে আইন ও নীতিমালার আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেন। আবেদন নিয়ে কাজ করা তৎকালীন সার্ভেয়ার কবীর হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের নামে খালি জমি বরাদ্দের সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠান হয়ে গেলে দেওয়া যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকায় আমাদের দপ্তর থেকে লিজের কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি।

মূলত এর পরই মরিয়া হয়ে ওঠেন ফখরুল ইমাম। প্রভাব খাটিয়ে দখলে নেন সরকারি জমি। একই দাগে হারুয়া বাজারের জন্য ভরাট করা জমিতে জেলা পরিষদের অর্থায়নে ৩ লাখ টাকায় আধা-পাকা ভবন নির্মাণ করান তিনি। ভবনে স্থাপিত শিলালিপিতে স্পষ্ট রয়েছে, ফখরুল ইমাম উচ্চ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের জন্য এই বরাদ্দ। এরই মধ্যে গত জুনে এমপির এডিপির বিশেষ বরাদ্দ থেকেও ৩ লাখ টাকা বিদ্যালয়ের জন্য দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) তৌহিদ আহমেদ।

বাজারের জন্য ভরাট করা জমির একাংশে ফখরুল ইমাম উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মাইজবাগ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার পারভেজ।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহবুবুর রহমান বলেন, এমপির বিদ্যালয়ের জন্য জমি বরাদ্দের আবেদনটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে আমার দপ্তরে এলেও কোনো প্রস্তাব যায়নি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজা জেসমিন বলেন, আমার যোগদানের আগেই বিদ্যালয় ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। জমি বরাদ্দ না পেয়ে কাজ করা সমীচীন হচ্ছে না বলে এমপিকে আমি জানিয়েছিলাম। তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়টির অনুমোদন নেই। এ জন্য এডিবির যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা পরিবর্তন করতে বলা হয়েছে।

ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান বলেন, বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ চাওয়ায় সেখানে আমরা আংশিক কাজ করে দিয়েছি, মূল কাজ নয়। জমি নিয়ে কেউ এখনও অভিযোগ দেননি। দিলে বিবেচনা করা হবে।