তাদের কি কোনো দায়িত্ব নেই?

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২০     আপডেট: ০৫ জুন ২০২০   

ফকির আলমগীর

আজম খান [জন্ম :২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫০-মৃত্যু :৫ জুন, ২০১১]

আজম খান [জন্ম :২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫০-মৃত্যু :৫ জুন, ২০১১]

বিশ শতকের বাংলা গানের ইতিহাস যারা লিখবেন, ১৯৭৩-৭৪ সালের একটা ঘটনার কথা তারা কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারবেন না। বিশেষ করে একজন গায়কের কথা। তার নাম আজম খান। সেই অবিস্মরণীয় গায়ক আজম খানের নমব ত্যুবার্ষিকী আজ। কিংবদন্তিসম এ শিল্পী যোদ্ধার প্রয়াণে সেদিন কেঁদেছিল সারাদেশের মানুষ। কেঁদেছিলাম আমি নিজেও বন্ধু হারানোর বেদনায়। 

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পাশ্চাত্য সুরের সঙ্গে দেশজ সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাংলা গানে এক নতুন ধারার সূচনা করি তাকে সামনে রেখেই। তার ও আগের ষাটের দশকের গণআন্দোলনে আমরা দুই বন্ধু 'ক্রান্তি' শিল্পীগোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য হিসেবে সারাদেশে গণসঙ্গীত গেয়ে বেড়িয়েছি। তারপর অংশগ্রহণ করেছি মহান মুক্তিযুদ্ধে। একই বয়সের আজম খান আর আমি একই রাজনৈতিক আদর্শের সৈনিক ছিলাম। আজম খান থাকতেন কমলাপুরের জসীমউদ্দীন সড়কে আর আমি খিলগাঁওয়ে। তবে মতিঝিলের পাম্পের আড্ডায় রেলস্টেশন, মনোমিতা হোটেল, চিটাগাং হোটেল কিংবা টাওয়ার হোটেলের আড্ডায় আমাদের একত্রে অনেক বছর কেটেছে। কফি হাউসের সেই আনন্দ আড্ডার মতোই আমাদের সেই সময় মুখরিত হয়েছে। আজ সেসব স্মৃতি রয়েছে, নেই কেবল আজম খান, তার বন্ধু মেজবাউদ্দিন সাবু আর ফোয়াদসহ অনেকে।

আজম খান শুধু একজন শিল্পী বা একটি নামই মাত্র নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে, বাংলা গানের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে 'আজম খান' একটি ঘটনা, একটি অধ্যায়। যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। আজ তিনি নেই। তার কর্ম, তার চেতনা থাকবে নতুনত্বের পথে আলোর মশাল হয়ে। যোদ্ধা, শিল্পী, বন্ধু_ সর্বোপরি একজন মানবিক মানুষ আজম খানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই আমার এ লেখা।

আজম খান ২১ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীন হয়। সদ্য স্বাধীন দেশে প্রজন্মের নানা সংকট, আশা-নিরাশা, হতাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোলাচল। এর মধ্যে নিজেদের স্বপ্ন-সাধ-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে দেখার দৃঢ় ইচ্ছা ও সংকল্প দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের। তখন গানই হয়ে ওঠে আজম খানের নিজের একই সঙ্গে তার সময়ের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা-ভালোবাসা-বিদ্রোহকে প্রকাশের হাতিয়ার। পারিবারিকভাবে সাঙ্গীতিক আবহে বেড়ে ওঠার সুবাদে গান ছিল তার মজ্জাতেই। তবে গানের ক্ষেত্রেও খুব চেনা পথে হাঁটেননি। ওরে সালেকা-মালেকা, রেল লাইনের ঐ বস্তিতে, হাইকোর্টের মাজারে, আসি আসি বলে তুমি, আলাল-দুলাল, জ্বালা জ্বালা, এত সুন্দর দুনিয়ায়_ এমন সব ভিন্নধারার গান গেয়ে বাংলা গানের শ্রোতাদের প্রচণ্ড শক্তিতে ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন আজম খান। তার গাওয়া ভিন্ন এ সুরের ধারায় নতুন প্রজন্মের সঙ্গীতপ্রেমী শ্রোতারা পেয়েছিল অন্যরকম এক স্পন্দন। সেই সত্তর দশকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুরের সমন্বয়ে এ দেশে পপসঙ্গীতের সূচনা করেন আজম খান। পপ গানে উজ্জীবিত শ্রোতাকুল তাকে বরণ করে নিয়েছিল পপসম্রাট হিসেবে। সে সময় তার হাতে বাংলা ব্যান্ড দল 'উচ্চারণ'-এর জন্মও বাংলা ব্যান্ডসঙ্গীতের ধারায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সেই সঙ্গে উচ্চারণের নীলু, ইশতিয়াক, বাবু, বাবুল, ল্যারী, মুসাসহ অনেকে আজ ইতিহাসের অংশ।

সঙ্গীতের এ নতুন ধারার সঙ্গে যুক্ত হই আমি, ফেরদৌস ওয়াহিদ, ফিরোজ সাঁই, পিলু মমতাজ এবং নাজমা জামান। আর তারই ধারাবাহিকতায় আজকের ব্যান্ডসঙ্গীত। আজকের জনপ্রিয় ব্যান্ডসঙ্গীতের অগ্রযাত্রায় আমাদের পপসঙ্গীতের রয়েছে বলিষ্ঠ ভূমিকা। যে ধারা থেকে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন আজকের অনেক খ্যাতিমান শিল্পী।

তার গাওয়া অসংখ্য জনপ্রিয় গানে খুব সরল-সহজভাবে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের কথা। কথা-সুর-গায়কীর কোথাও কোনো চালাকি বা ফাঁকি নেই তার গানে। গান তার কাছে শুধু আনন্দ-বিনোদনের বিষয় ছিল না, বরং এসব গান ছিল একজন যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধার অন্যরকম যুদ্ধের হাতিয়ার। তিনি যে ভিন্ন কথা, ভিন্ন সুর, ভিন্ন গায়কীর আশ্রয় নিয়েছিলেন সেটাও সময়ের প্রয়োজনেই। অর্থাৎ ওই সময় তারুণ্যের অন্তর্গত চেতনা, বক্তব্য গতি ও অদম্য ক্ষিপ্রতাকে প্রকাশের জন্যই তাকে ভিন্ন ধারার প্রকাশভঙ্গিতে যেতে হয়েছে। 

তবু অদ্ভুত ব্যাপার, দেখতে দেখতে দেশের তরুণ সমাজকে এই গান মাতিয়ে তুললো। হাজার হাজার উন্মাতাল তরুণ-তরুণী জড়ো হতে লাগল তার কনসার্ট, উদ্দীপনা, আনন্দ, চিৎকার আর করতালিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুললো ভক্ত-শ্রোতারা। নতুন এ গানের ঝাঁজ আর উত্তেজনার জ্বলন্ত উন্মাদনা যেন ঝাঁকি দিয়ে জাগিয়ে দিল আমাদের যুগ-যুগান্তের উপেক্ষিত ও অবদমিত তারুণ্যের উদ্যাম ঝাঁজালো প্রাণবন্যা। গানগুলো ফিরতে লাগল তাদের মুখে মুখে। আজও তেমনি মানুষের মুখে মুখে তার গান। তার গড়া পপ গানের আধুনিক বাদ্যযন্ত্রে তরুণদের কণ্ঠে মুখরিত হয় কত অনুষ্ঠান। দেশ-বিদেশে কত ব্যান্ডদল আজও আজম খানের গায়কী অনুকরণ-অনুস্মরণে মাতিয়ে তোলে কত কনসার্ট। সব আছে, শুধু নেই সেই প্রিয় মুখ আজম খান। 

আমার প্রশ্ন, কেন নীরবে চলে যাবে এই পপ গুরুর মৃত্যুবার্ষিকী। সরকার আছে, দেশব্যাপী তার ভক্ত-অনুরাগী আছে, আছে ব্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন 'বামবা'। তাদের কি কোনো দায়িত্ব নেই। আজ দেশে অসংখ্য মিডিয়া, তারাও পারে, পপ গুরুর মৃত্যুবার্ষিকীতে বর্তমান প্রজন্মের কাছে আজম খানকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে।