যেন ডেঙ্গুকে ভুলে না যাই

করোনা মোকাবিলা

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন

চোখে দেখা যায় না, এ ধরনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণু, ভয়ানক ছোঁয়াছে করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) আক্রমণে বর্তমানে সমগ্র বিশ্ব স্তম্ভিত, উদ্বিগ্ন, বিচ্ছিন্ন ও স্থবির। করোনার সর্বগ্রাসী বিস্তার, সংক্রমণ এবং শক্তি মানুষ-সৃষ্ট যে কোনো মারণাস্ত্রকে হার মানিয়ে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ, জাতি, জনপদ ও মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাভাইরাস মিউটেশনে রূপ বদলায় এবং পরিবেশ পেলে বিধ্বংসী হয়। এতে রূপান্তরিত জিনের অংশ থাকায় সুপ্তপ্রোটিন সতেজ করতে হলে ভাইরাসকে শরীরে ঢুকতে হয়। ফিউরিন নামক এনজাইম সুপ্তপ্রোটিনকে সতেজ করে। ভাইরাস ফিউরিনকে আক্রমণ করে প্রোটিনকে সতেজ করে। এই ক্রিয়া-প্রক্রিয়ায় ভাইরাস ও মানবকোষের সংমিশ্রণ ঘটে এবং রোগের বিস্তার করে। রোগটি যে কত বিধ্বংসী তা বিশ্বব্যাপী মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সংখ্যা ও মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। রোগী পরীক্ষার জন্য শুধু একটি কেন্দ্রে ২৫ থেকে ৩০ জন রোগী পরীক্ষা করে যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তা অসম্পূর্ণ ও নির্ভরশীল নয়। যে বিশাল জনগোষ্ঠী এই পরীক্ষার বাইরে তাদের মধ্যে কতজন সংক্রমিত রোগী আর কতজন মারা যাচ্ছে সে হিসাব কেউ দিতে পারবে না। আরও দুশ্চিন্তার বিষয় এই যে, বিদেশফেরত ব্যক্তি ছাড়াও বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস নেই এ ধরনের ব্যক্তি ভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছেন। ২২ মার্চ সরকারের দেওয়া হিসাব মোতাবেক যে ২৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন তার মধ্যে ১০ জন বিদেশফেরত, বাকি ১৩ জন বিদেশফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন। অবশিষ্ট ৪ জন সম্পর্কে তখনও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অতএব, বিধ্বংসী করোনাভাইরাস যে সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে তা পরিস্কার। ২৬ মার্চ সর্বশেষ আইইডিসিআর অর্থাৎ সরকারি তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে সর্বমোট ৩৯ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুবরণ করেছেন মোট ৫ জন, আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন ৭ জন। যদিও সরকারি এই তথ্য সম্পর্কে বিভিন্ন মহলে সন্দেহ রয়েছে, যেহেতু বাংলাদেশে আইইডিসিআর ছাড়া করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার দ্বিতীয় কোনো স্থান নেই।
চীন, হংকং, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া করোনাভাইরাস সংক্রমণকে মোটামুটি সামাল দিতে পেরেছে, অবরুদ্ধ বা লকডাউন করা এবং দ্রুত পরীক্ষা পরিচালনার মাধ্যমে। বর্তমানে আক্রান্ত পশ্চিমা দেশগুলো একই পথে হাঁটছে। গত ২৪ মার্চ ১৩৮ কোটি মানুষের দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২১ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন। বর্তমানে ইতালিতে করোনাভাইরাসের তাণ্ডব চলছে। বিশেষজ্ঞরা করোনা সম্পর্কে ইতালির দীর্ঘ নীরবতা, উদাসীনতা ও অবজ্ঞা করাকে দায়ী করেছেন। ইতালিসহ বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়, করোনাভাইরাসের পিছে নয়, সামনে ছুটতে হবে। যারা এই উপলব্ধিতে পিছে পড়েছে তারাই তার খেসারত দিচ্ছে।
বাংলাদেশে অপ্রতুল টেস্ট (পরীক্ষা) ব্যবস্থার মধ্যেও যারা রোগী হিসাবে শনাক্ত হচ্ছেন বা ভবিষ্যতে হবেন তাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল এখনও প্রস্তুত হয়নি। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী বা পিপিই পর্যাপ্ত পরিমাণ আমদানি করা হয়নি। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী চিকিৎসার সময় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংক্রমিত হওয়ায় অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। চীনের উহান শহরে প্রথম যে চিকিৎসক করোনাভাইরাস শনাক্ত করেছিলেন, সেই চিকিৎসক আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াও ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং ভেন্টিলেশন মেশিন অপ্রতুল। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে এসব সুবিধা নেই, সুবিধা সৃষ্টির কোনো পদক্ষেপও নেই।
করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সারাবিশ্বসহ বাংলাদেশ যখন বন্ধ হয়ে গেছে এবং তার মোকাবিলায় সারা জাতি যখন যুদ্ধে লিপ্ত, তখন বাংলাদেশে আরেকটি প্রাণঘাতী ব্যাধি 'ডেঙ্গু' দরজায় কড়া নাড়ছে। সাধারণত মে-জুন মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়। বৃষ্টির মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশার জন্মের প্রক্রিয়া শুরু হয়। যে সব এলাকায় ডেঙ্গু বাহক এডিস মশা একবার বিস্তার লাভ করে, সে এলাকায় পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এডিস মশার ডিম শুকনো পরিবেশে ৯ মাস পর্যন্ত নষ্ট হয় না। যখনই বৃষ্টির পানির সংস্পর্শে যাবে, তখন তা লার্ভায় পরিণত হয় এবং পরিপূর্ণ মশার জন্ম হয়। উদ্বেগের বিষয় এই যে, গত বছর সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল লক্ষাধিক মানুষ এবং মৃত্যুবরণ করেছিল ২৪৮ জন। পত্র-পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী প্রকৃত ভর্তির ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। ১৯৯৬ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ার পর ২০১৯ সালে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের ও মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ। ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ। গত বছরে ডেঙ্গু ছড়িয়েছে সারাদেশে। এমতাবস্থায় গত বছরের ডেঙ্গু প্রকোপের ভয়াবহতা (মহামারি) থেকেই এ বছরের সতর্ক বার্তা বিদ্যমান। গত বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা ও ব্যর্থতার কারণে ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করেছিল। ডেঙ্গুকে প্রতিরোধ করতে হলে এডিস মশাকে নিধন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তাই মার্চ-এপ্রিল মাসেই (বৃষ্টি শুরু হওয়ার পূর্বে) দুই সিটি করপোরেশন এবং সারাদেশে পৌরসভাগুলোতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ও কার্যকর ওষুধ ছিটিয়ে এডিস মশার ডিম ধ্বংস করার এখনই সময়। তা না হলে এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের চেয়ে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
গত বছরে ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া নির্মূলে সংশ্নিষ্টদের ব্যর্থতার কারণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার জন্য বিগত ২২ নভেম্বর, ২০১৯ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ ঢাকা জেলা জজের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। কমিটিকে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে সুপারিশমালা তৈরি করতে বলা হয়েছিল। এই কমিটিকে ১৫ জানুয়ারি, ২০২০ তারিখের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত তারিখে প্রতিবেদন দাখিলে ব্যর্থ হলে তাদেরকে আরও ২ মাস সময় বৃদ্ধি করা হয়। অর্থাৎ ১৫ মার্চের মধ্যে প্রতিবেদন পেলেও তাদের সুপারিশ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের আর সময় অবশিষ্ট থাকবে না। ইতোমধ্যে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৪১ জন। গত বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল মাত্র ৫৬ জন। বিগত বছরের তুলনায় এ বছরে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪ গুণেরও বেশি। অর্থাৎ এ বছর ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ গত বছরের চেয়ে আরও ভয়াবহ হতে পারে। এমতাবস্থায়, ডেঙ্গু প্রকোপের এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে এখনই সারাদেশে ডেঙ্গু মশার সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে।
উদ্ভূত এই কঠিন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিলম্বে হলেও সরকারকে তাদের দম্ভ, অহংকার ও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করা জরুরি। জাতীয় দুর্যোগ বিবেচনা করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জনগণকে আস্থায় নিয়ে করোনাভাইরাসের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানানো উচিত। অন্যান্য দেশের মতো এই অদৃশ্য শক্তির মোকাবিলায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দৃঢ়তা ও সাহসের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সারাদেশে সর্বাত্মকভাবে ভাইরাস পরীক্ষা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রস্তুত করাসহ যাবতীয় কার্যক্রম সমন্বিতভাবে জোরদার করতে হবে।
ডেঙ্গুর সম্ভাব্য ভয়াবহ প্রকোপ থেকে দেশের জনগণকে রক্ষা করতে একই সঙ্গে এখনই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস এবং ডেঙ্গু রোগ চিহ্নিত করার পর্যাপ্ত পরীক্ষার কিট আমদানি করা অত্যাবশ্যক। ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পৃথক ইউনিট প্রস্তুত করার আগাম কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিধ্বংসী করোনাভাইরাস ও সম্ভাব্য ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে জনগণকে সুরক্ষা করা সহজ হবে না। আগাম প্রস্তুতি ও দৃঢ় পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সফলতা লাভ করার কোনো বিকল্প নেই। পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা আমাদের সহায় হবেন।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী; সদস্য, জাতীয় স্থায়ী
কমিটি-বিএনপি

বিষয় : করোনা