গ্রেটা থুনবার্গ: ২০১৯ সালের অদ্বয় আইকন

 পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২০     আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

শহিদুল ইসলাম

২০১৮ সালেও পৃথিবীর কেউ তার নাম জানত না। তার নিজ দেশেও ক'জন তাকে চিনত? সে তো কোনো বড় রাজনীতিবিদ নয়, নামকরা অভিনেতা নয় কিংবা ক্রিকেট, ফুটবল তারকা নয়। কিন্তু মাত্র এক বছরের মধ্যে তার নাম পৃথিবীর আনাচে-কানাচে পৌঁছে গেছে। ২০১৯ সালে তার উত্থান যেমন নাটকীয়, তেমনি অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক। হ্যাঁ, আমি সুইডেনের নবম-দশম শ্রেণির ছাত্রী গ্রেটা থুনবার্গের কথা বলছি। ২০১৮ সালে কেউ তাকে চিনত না; কিন্তু ২০১৯ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে নাম বিবেচিত হয়েছিল এবং মাত্র এক বছরের মধ্যে বিশ্বের নামিদামি পুরস্কারে সে ভূষিত হয়েছে। যেমন 'গ্ল্যামার অ্যাওয়ার্ড ফর টাইম', 'দি রেভল্যুশনারি'। ব্রিটেনের বিখ্যাত পত্রিকা তার পূর্ণ পৃষ্ঠা ছবিসহ তাকে 'বছরের সেরা ব্যক্তি'র সম্মান দিয়েছে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বের ২২৪ জন বুদ্ধিজীবী তার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন বিশ্ববাসীর উদ্দেশে। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল আন্টারিও গুতেরেস গ্রেটার পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন সমর্থন করে বলেন, 'আমাদের প্রজন্ম জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। এ বিপদ সম্পর্কে শিশুরা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। তাই তারা রাগান্বিত- এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।' একই বছর নিউজিল্যান্ডে এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, 'ধরিত্রী বাঁচাতে তাদের সংগ্রাম যৌক্তিক।' আজ পৃথিবীর প্রায় সব দেশে কোটি কোটি মানুষ প্রতি সপ্তাহে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে ব্যর্থতা ও পরিবেশ রক্ষার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে মিছিল করছে। কেবল অর্থনৈতিক লোভের জন্য মানুষ আজ যেভাবে প্রকৃতি ধ্বংস করছে, তা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

দুই

গ্রেটা থুনবার্গ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায় ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট। তার বয়স তখন মাত্র ১৫; নবম শ্রেণির ছাত্রী। স্কুল থেকে বের হয়ে এসে সে একা সুইডেনের সংসদ ভবনের সামনে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে অনশনে বসেছিল। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- 'স্কুল স্ট্রাইক ফর দ্য ক্লাইমেট'। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছোট-বড় শহরের স্কুল ছেড়ে শিক্ষার্থীরা প্রতি সপ্তাহে মিছিল করে আসছে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার পর আন্দোলন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বিগত ৩০ বছর এ বিষয়ে বিজ্ঞানীরা সাবধানবাণী উচ্চারণ করে আসছেন। কিন্তু বিশ্বনেতারা সে কথায় কর্ণপাত না করায় তারা রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে আসছেন। প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তারা সব রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি জোর আহ্বান জানান। বাতাসে ঈঙ২ গ্যাস যেন ছড়িয়ে না পড়ে। তাই গ্রেটা বিমান ভ্রমণ ও মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে গ্রেটা ইংল্যান্ডের প্লে-মাউথ থেকে নিউইয়র্কে গিয়েছিল সূর্যরশ্মিচালিত ৬০ ফুট লম্বা একটি নৌকায়। গ্রেটার আন্দোলন যেমন জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, তেমনি তার শক্তিশালী শত্রুও তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প, পুতিনসহ বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রপ্রধানরা তাকে নেহাতই 'বালিকা' বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু যদি বলা হয় যে, ২০১৯ সাল 'গ্রেটার বছর', তাহলে ভুল বলা হবে না। লন্ডন টাইমস পত্রিকা তাকে পরবর্তী প্রজন্মের নেত্রী বলে আখ্যায়িত করেছে। 'মেইক দ্য ওয়ার্ল্ড  গ্রেটা অ্যাগেইন' নামে একটি ডকুমেন্টারি নির্মিত হয়েছে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সামিটে গ্রেটা বক্তৃতা করে। সেই ছোট্ট বক্তৃতায় সে বিশ্বনেতাদের ব্যর্থতার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে চারবার উচ্চারণ করে- তোমাদের কত সাহস? গ্রেটা বলে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানব প্রজাতি আজ অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। ১৯৭০ সালের পর মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবীর ৬০ শতাংশ প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এর জন্য সে বড়দের দায়ী করে। বিজ্ঞানীদের সাবধানবাণী শোনার জন্য সে বিশ্বনেতাদের আহ্বান জানায়। সে বলে, প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী ঈঙ২ গ্যাস ১.৫০ঈ কমানোই আজ যথেষ্ট নয়- ২০২০ সালের মধ্যে তা আরও দ্রুত কমাতে হবে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউরোপীয় ইকোনমিকস অ্যান্ড সোশ্যাল কমিটির সম্মেলনে গ্রেটা বলে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে ঈঙ২ গ্যাস উৎসারণের পরিমাণ অবশ্যই ৮০ শতাংশ কমাতে হবে। প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী তা ছিল ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ আজ দ্বিগুণ গতিতে ঈঙ২ গ্যাস নিঃসরণ কমাতে হবে। আমাদের হাতে সময় আর বেশি নেই।

তিন

গ্রেটা থুনবার্গের বিরোধিতাকারীরা পৃথিবীর শক্তিশালী শাসকবৃন্দ। যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার পুতিন, ফ্রান্সের মাক্রন, অস্ট্রেলিয়ার মরিসন, জার্মানির মরকেল, ইতালির গুয়েম্পে, ওপেক ও অন্যান্য মিডিয়া। ব্যক্তিগতভাবে থুনবার্গকে আক্রমণ করে তারা বলেন, তার বক্তব্য হালকা ও ফাঁকা।

২০১৯ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের জলবায়ু অ্যাকশন সামিটে গ্রেটা বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলে, 'তোমাদের কত বড় সাহস? ফাঁকা বুলি আওড়িয়ে তোমরা আমাদের স্বপ্ন, আমাদের শৈশব চুরি করেছ। তবুও আমি সৌভাগ্যবতী। মানুষের কষ্ট বেড়েছে, মানুষ মরছে। সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম ধ্বংসের মুখে পড়েছে। আমরা নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথ কাটছি। তোমরা কেবল সম্পদের কথা বলো আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের কল্পিত কাহিনি শোনাও। কত সাহস তোমাদের?' বক্তৃতার শেষে গ্রেটা বলে, 'তোমরা ব্যর্থ। কিন্তু শিশুরা তোমাদের বিশ্বাসঘাতকতা বুঝতে শুরু করেছে। সমস্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের দিকে চেয়ে আছে। তোমরা যদি আমাদের কথা না শোনার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাক তাহলে আমি বলব, আমরা তোমাদের কখনও ক্ষমা করব না।'

পৃথিবী ইতোমধ্যে এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উত্তপ্ত হয়েছে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনের আন্তঃসরকারীয় প্যানেল গত বছর একটি অ্যাটম বোমা নিক্ষেপ করেছে। ২০১৮ সালে তার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে বলে যে, ১.৫০ঈ এবং ২০ঈ-এর পার্থক্য খুব কম এখন। পৃথিবী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার সম্মুখীন। রিপোর্টে বলা হয় যে, ২০৩০ সালের মধ্যে ঈঙ২ গ্যাস নিঃসরণ অবশ্যই ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে শূন্যতে। প্রতিবেদন বলছে, আমাদের হাতে মাত্র ১২ বছর সময় আছে। জলবায়ু-সংক্রান্ত ভয়াবহতা নিয়ে যখন সারাবিশ্ব শঙ্কিত, মানুষ সোচ্চার, তখন বিশ্বের বড় বড় শিল্প এ বিষয়ে সামান্যই মাথা ঘামাচ্ছে। ২০১৮ সালে ঈঙ২ গ্যাস উদ্‌গিরণ সব মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ২০১৯ সালে প্রথমে তা সামান্য কমলেও আবার বাড়তির পথে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ধ্বংসাত্মক বিপদের সম্মুখীন। যেমন মোজাম্বিকের ইদাহ সাইক্লোন, জাপানের হাগিরিজ, রেকর্ড ভঙ্গকারী তাপমাত্রায় সমগ্র ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়া জ্বলছে। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ভেনিস ভাসছে। আমাজনের কথা সবাই জানেন। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে তার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। গত ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ সমকালে প্রকাশিত সারোয়ার সুমনের প্রতিবেদন 'লাখো নিচতলার দুঃখ' তারই প্রমাণ। চট্টগ্রামের বিশাল অংশের বাড়িগুলোতে নিচতলায় কেউ থাকতে পারছে না। নিজেদের বাড়ি ছেড়ে তারা অন্যত্র ভাড়া বাড়িতে বাস করছে। কোনো ভাড়াটিয়াও পাওয়া যাচ্ছে না। সহস্রাধিক দোকান ইতোমধ্যে অকেজো হয়ে পড়েছে। একই দিনে সমকাল জানায়, একিউআই রেটিংয়ে বাংলাদেশ প্রায়ই বায়ুদূষণে প্রথম স্থানে আছে। একই অবস্থা ইন্দোনেশিয়ায়। জাকার্তার ২০ শতাংশে আজ আর মানুষ বাস করতে পারছে না। একাংশ পানির নিচে। তাই ইন্দোনেশিয়া সরকার রাজধানী সুমাত্রায় সরিয়ে নিচ্ছে আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে। এতে কি রক্ষা পাবে?

চার

ইতোপূর্বে প্রকৃতিই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী ছিল। মানুষের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। কিন্তু আজ প্রাকৃতিক কারণের পেছনে মানুষের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বড় ভূমিকা পালন করছে। অতীতে মানুষ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করেই বেঁচে ছিল। কারণ অর্থনীতি আজ জলবায়ু পরিবর্তন রোধে উন্নত, শিল্পপ্রধান দেশগুলো নারাজ কেন? কেন ট্রাম্প প্যারিস চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে মিলেন? কেন বড় বড় শিল্প গ্রেটার আন্দোলনকে মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছে না? কারণ অর্থনীতি। পুঁজিবাদী অর্থনীতির উন্নয়নের স্বার্থে তারা পৃথিবী ও প্রকৃতির যে কোনো ক্ষতিসাধন করতে পিছপা হবে না। তাদের কাছে গ্রেটার কথামতে, অর্থ বা সম্পদই প্রধান। পুঁজিবাদী উন্নয়নের পথ থেকে কোনো কিছুই তাদের সরিয়ে আনতে পারবে না। পরিণতি অবধারিত মৃত্যু। বিষয়টি যদি কেবল প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে সব মানুষ লড়াই করে জয়ী হতে পারত। কিন্তু আজকের সমস্যা মানুষের লোভ-লালসা, ভোগবিলাস। মাত্র শতকরা এক শতাংশ মানুষের চাহিদা, যার কোনো শেষ নেই, মেটাতে ৯৯ ভাগ মানুষসহ আজ বিশ্বপ্রকৃতি বিপদগ্রস্ত।

সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়