আমাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

রণেশ মৈত্র

১৯৭১-এর সারাটি বছর ধরেই বাঙালি একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক, বাঙালি জাতীয়তাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা করে ওই বছরের মধ্য-ডিসেম্বরে এসে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। গোটা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে বাঙালি সেদিন যে বিজয় অর্জন করেছিল তার তাৎপর্য ছিল অসীম। ভাষা আন্দোলন ১৯৪৮-এ শুরু হলেও এবং সে আন্দোলনের আগুন ধীরে ধীরে জ্বলতে থাকলেও ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ বুকের রক্ত ঢাকার রাজপথে ঢেলে দিয়ে তাদের প্রাণের দাবির অনুকূলে প্রথম বিজয় ছিনিয়ে আনলেন বাঙালিরা। এভাবে বিজয় অর্জনের শুরু। তারপর আন্দোলন থেমে না থেকে ধারাবাহিকতার সঙ্গেই তা একের পর এক চলতে থাকে, অর্জিত হতে থাকে একের পর এক বিজয়। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে এক মহাবিস্ম্ফোরণ ঘটিয়ে বাঙালি জাতিকে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস খ্যাত ছয় দফার ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-আদিবাসী-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ব্যাপকতম এবং ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে। এ ঐক্যের কারণেই ১৯৭০-এর নির্বাচনী রায় সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়। একই ঐক্য আবার ১৯৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনে নিশ্চয়তা এনে দেয়। আর সেই ঐক্যই মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে গোটা বিশ্ববাসীকে সমবেত করতে নিয়ামক ভূমিকা রাখে। বঙ্গবন্ধু যথার্থই জাতির পিতায় পরিণত হন।

বাহাত্তরের ৪ নভেম্বর আমরা যে শ্রেষ্ঠ সংবিধানটি পাই তাতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের চার মৌলনীতি ছিল- গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র। এই অর্জন শত্রুদের করে দিল দুর্বল। কারণ ওই সংবিধানে না ছিল জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোর বৈধতার সামান্যতম স্বীকৃতি, না ছিল রাষ্ট্রধর্ম। ধর্ম ব্যবসায়ীরা ঘোঁট পাকাল এবং রাষ্ট্রের ও তার মৌলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতে বিরামহীন অপচেষ্টা চালাতে থাকল। ফলে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নির্মমভাবে নিহত হলেন। এলেন জিয়াউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার। বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম বেনিফিশিয়ারি। কোদাল হাতে মাটি কেটে খাল বানালেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সবক শোনালেন। উন্নয়নের বয়ান গাইলেন। সঙ্গে সঙ্গে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার ছেদ ঘটালেন। পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে ফিরিয়ে এনে নাগরিকত্ব দিলেন। জামায়াতে ইসলামী ও ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোকে বৈধতা দিলেন। জিয়াউর রহমান নিহত হন চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে সেখানকার সার্কিট হাউসে। তারপর অল্প কিছুদিন থাকলেন বিচারপতি সাত্তার। তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিও হলেন। তাকে হটিয়ে এলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি সংবিধান বদলের ষোলকলা পূর্ণ করে তাতে বসিয়ে দিলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। বেআইনি পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা প্রথম দখল করেন জিয়াউর রহমান। অতঃপর এরশাদ। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত হলো সাধারণ নির্বাচন। জিতল বিএনপি। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জামায়াতের নির্বাচিত ক'জনকে সঙ্গে নিয়ে গরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতাসীন হলেন খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো। তিনি এরশাদের সংশোধনী বজায় রাখলেন সংবিধানে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। দাবি ছিল- বাহাত্তরের মূল সংবিধান ফিরিয়ে দাও। অতঃপর ১৯৯৬-তে দীর্ঘকাল পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করল। কিন্তু সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা না থাকায় তখন সংবিধান সংশোধন সম্ভব ছিল না বলে সে দাবি তখন তোলাও হয়নি। আবারও ক্ষমতায় এলেন ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে। এবারে গরিষ্ঠতা থাকলেও পূর্বতন সরকার সৃষ্ট সমস্যাবলির জট খুলতেই সময় লেগে যায়।

বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল ছিল মাত্র সাড়ে তিন বছর। ওই সময়কালে মাত্র ১০ মাসেই বঙ্গবন্ধু বাহাত্তরের সংবিধান উপহার দিলেন, যা ছিল সর্বসম্মত এবং দেশ-বিদেশে প্রশংসিত। একই আমলে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বিধ্বস্ত হওয়া সেতুগুলো পুনর্নির্মাণ, সমুদ্র-নিরাপত্তা উদ্ধার, মাইন মুক্ত করে চট্টগ্রাম বন্দরকে জাহাজ চলাচল উপযোগী করা, দেশি-বিদেশি চক্রান্তে সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ (১৯৭৪) প্রতিরোধ করা ইত্যাদি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় প্রথম আসেন ১৯৯৬ সালে। তখন ক্ষমতা গুছানো থেকে অতীতের জঞ্জাল সরানো, বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচারের লক্ষ্যে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল প্রভৃতি কাজের সঙ্গে সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে অবকাঠামোগত দিকে বেশি নজর দেন। দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। যদিও অত্যধিক ব্যয়বহুল পথে এই উৎপাদন কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে; স্বল্প ব্যয়েও করা যেত এবং করা উচিতও ছিল। তা না করে বিদ্যুৎও হয়ে দাঁড়িয়েছে ধনিক গোষ্ঠীর চাহিদা মেটানোর উপাদানে। দারিদ্র্যপীড়িত অধিকাংশ জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হচ্ছে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে। নিজস্ব ব্যয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া সর্বাধিক সাহসী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ, যার জন্য শেখ হাসিনা ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সর্বাধিক সাহসী পদক্ষেপ হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং বিচারের রায় দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর। তবে ইদানীং বা মাস ছয়েক হলো ওই বিচার কার্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে ধীরগতি। মোটা দাগে উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তির দিক এগুলোই। তবে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টা সরকারের আরেকটি বড় কাজ। এ ক্ষেত্রে এখনও অনেক কিছু বাকি থাকলেও যেটুকু এ পর্যন্ত হয়েছে তাও কম কিছু নয়। মোটা দাগে প্রাপ্তির দিকগুলো উল্লেখ করলাম। সেগুলোকে কোনোক্রমেই খাটো করে দেখা যাবে না।



তবে অপ্রাপ্তিও রয়েছে। এক, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত বাহাত্তরের সংবিধানে যে চার মৌলনীতি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল তার মধ্যেই বিবৃত ছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির ২৩ বছরব্যাপী নিয়মতান্ত্রিক ও সশস্ত্র সংগ্রামের সীমাহীন তাৎপর্য। ওই মূলনীতিগুলোই বুঝিয়ে দেয় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যেকার মৌলিক পার্থক্য, যে পার্থক্য বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানিরা কখনও আপন বলে ভাবেনি। দুই, ১৯৭৫-এর মধ্য আগস্টে সপরিবারে বর্বরোচিত নিষ্ঠুরতায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতা দখল করলেন অবৈধভাবে জিয়াউর রহমান। ততোধিক অবৈধভাবে বাহাত্তরের সংবিধানটিতে প্রতিক্রিয়াশীল সংশোধনী এনে দেশটাকে পাকিস্তানমুখী করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সামরিক আইনের মাধ্যমে। অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতাকেন্দ্রিক ওই সংবিধানে 'বিসমিল্লাহ' সংযোজন, যুদ্ধাপরাধী দেশদ্রোহী পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনে অবৈধভাবে তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান, নিষিদ্ধ ঘোষিত সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ প্রভৃতি উগ্র সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলকে বৈধতা প্রদান করে জাতির মৌলিক অর্জনকে ধর্মের নামে বিতর্কিত করে তোলেন জিয়াউর রহমান। গণতন্ত্রের বিনষ্ট প্রক্রিয়া শুরু করেন। প্রবর্তন করেন পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার জাতীয়করণকৃত কলকারখানাগুলো পূর্বতন মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। তিন, এরপর এলেন এরশাদ। পরিপূর্ণ অবৈধ পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী এই স্বৈরশাসক বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ অগ্রসর হয়ে সংবিধানে লিখে দিলেন 'রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম', যা পৃথিবীর অপর কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের সংবিধানেও নেই। উদ্দেশ্য ছিল, রাষ্ট্রক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল ও ওয়ার্কার্স পার্টি নেতৃত্বাধীন পাঁচ দলের যৌথ ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ১৯৯০ সালে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। চার, আট ও পাঁচ দলের দাবি ছিল, বাহাত্তরের মূল সংবিধান পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যে বিসমিল্লাহ, ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোর (জামায়াতে ইসলামীসহ) বৈধতা ও রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা। নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণ ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আর্থিক নীতি প্রণয়ন ও ধনী-গরিবের মধ্যকার বিরাজমান বৈষম্যের অবসান ঘটানো। পাঁচ, সব স্বৈরশাসনের অবসান দৃশ্যত ঘটানো সম্ভব হলেও মৌলিক অঙ্গীকারগুলো পূরণ না করে জিয়া-এরশাদ প্রবর্তিত যেসব আদর্শিক জঞ্জাল এখনও রয়েছে সেগুলো বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এসব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, বাহাত্তরের সংবিধান পরিপন্থি। ছয়, সংবিধানের উপরোক্ত রূপ সাম্প্রদায়িকীকরণ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের আদর্শিক অনুকূলতার সৃষ্টি করেছে, যা সমাজে ও শিক্ষাঙ্গনে বিস্তৃতি লাভ করে চলেছে। সাত, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যা উন্নয়ন ঘটেছে এর বেশিরভাগই ভোগ করছে ধনিক সমাজ। দরিদ্ররা এখনও অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত। অর্থাৎ বৈষম্য জিইয়ে আছে। এসবের নিরসন না করা গেলে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়া যাবে না।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতিক
[email protected]