ঢাকার যানজটের জন্য মাত্রাতিরিক্ত প্রাইভেটকারকে দায়ী করা হলেও নিয়ন্ত্রণে নেই উদ্যোগ। প্রাইভেটকার কমাতে গণপরিবহন শক্তিশালীর কথা বলা হলেও তা কথামালাতেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, দিনে গড়ে ৭২টি প্রাইভেট গাড়ি রাজধানীর সড়কে নামায় আরও বাড়ছে যানজট। এমন বাস্তবতায় আজ বৃহস্পতিবার পালিত হবে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস।

এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য 'জ্বালানি ব্যবহার ও যানজট নিয়ন্ত্রণ করি, ব্যক্তিগত গাড়ি সীমিত রাখি'। সরকারি সংস্থা ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আয়োজনে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণে শোভাযাত্রা, সভা-সেমিনারের মতো সচেতনতামূলক কর্মসূচি থাকলেও শক্ত পদক্ষেপ নেই। সরকারি আরেক সংস্থা সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যানে তা পরিস্কার। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে রাজধানীতে চলাচলের জন্য ১০ হাজার ৮২৫টি প্রাইভেট গাড়ি নিবন্ধন নিয়েছে। গড়ে দিনে ৪৫টি প্রাইভেটকার যোগ হচ্ছে রাজধানীর সড়কে। চলতি বছরে জিপগাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে ৬ হাজার ৬৪৮টি। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৯২৭। আর গত বছর প্রাইভেটকার নিবন্ধিত হয়েছিল ১৪ হাজার ৩২১টি। পরিসংখ্যান বলছে, আগের বছরের তুলনায় চলতি বছর প্রাইভেটকার ও জিপের মতো ব্যক্তিগত গাড়ি বেড়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক হাদীউজ্জামান সমকালকে বলেছেন, রাস্তা যত বাড়বে, প্রশস্ত হবে, গাড়িও তত বাড়বে। সড়ক বৃদ্ধি যানজটের সমাধান নয়। যানজট কমাতে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। আর এটি গণপরিবহন উন্নত হলেই সম্ভব হবে। সুশৃঙ্খল ও উন্নত গণপরিবহন না থাকলে প্রাইভেটকারের যাত্রীরা কখনও বাসে উঠবেন না। মেট্রোরেলেও উঠবেন না। প্রাইভেটকার বাড়তেই থাকবে।

২০১৯ সালে কার্যকর সড়ক পরিবহন আইনের ২৩ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার, সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা, কোনো ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান বা কোনো এলাকার জন্য মোটরযান রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বা সীমা নির্ধারণ করতে পারবে। প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিকবার বলেছেন, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যায় নিয়ন্ত্রণ আনা হবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক ২০১৭ সালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের দুটি সড়ক প্রাইভেটকারমুক্ত ঘোষণা করেছিলেন। বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলাম প্রাইভেটকারমুক্ত সড়কের ঘোষণা দিয়েও পূর্বসূরির মতোই কার্যকর করতে পারেননি।

গতকাল বুধবার নগর ভবনে ডিটিসিএর সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঢাকায় ৮০ শতাংশ ট্রিপ হয় ৫ কিলোমিটারের মধ্যে। এর অর্ধেক ট্রিপ হয় ২ কিলোমিটারের মধ্যে। স্বল্প দূরত্বের ট্রিপে সাইকেলে অথবা হেঁটে চললে প্রাইভেট গাড়ির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব। ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক সাবিহা পারভীন জানিয়েছেন, আজ বৃহস্পতিবার মোহাম্মদপুর হাউজিং এলাকায় গাড়িমুক্ত সড়ক উদ্বোধন করা হবে।

ডিটিসিএ হেঁটে বা সাইকেলে ভ্রমণ উৎসাহিত করার কথা বললেও তিন বছরে চূড়ান্ত করতে পারেনি পথচারী নিরাপত্তা প্রবিধানমালা। ফুটপাত দখলমুক্ত ও হাঁটার উপযোগী রাখতে এ প্রবিধানমালা করার কথা। তিন বছরেও চূড়ান্ত হয়নি পার্কিং নীতিমালার খসড়া। গণপরিবহনের উন্নতিতে বাস রুট রেশনালাইজেশন (বিআরআর) সাত বছর পরও পরীক্ষামূলক পর্যায়েই রয়ে গেছে। গত মার্চে ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত একটি রুটে বিআরআরের অধীনে ঢাকা নগর পরিবহনের বাস চালু হয়েছে। বাকি রুটে বাস চালু করা যাচ্ছে না, নানা সংকটে।

বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী, রাজধানীতে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার। ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছিল, গতি ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটার। বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী, দিনে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় যানজটে। বছরে ক্ষতি ৩৭ হাজার কোটি টাকা। ২০২৭ সালে ঢাকায় গাড়ির গতি হবে এক কিলোমিটার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের ফেলোদের গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ঢাকার সড়কের ৭৬ ভাগ প্রাইভেটকারের দখলে। কিন্তু প্রাইভেটকারে যাত্রী মাত্র ৬ শতাংশ। বুয়েটের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাইভেটকার এবং এতে যাত্রী বাড়ছে। ২০১৫ সালে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ যাত্রী প্রাইভেটকার ব্যবহার করতেন। ২০২৫ সাল নাগাদ তা দাঁড়াবে ১১ দশমিক ১২ শতাংশে।

প্রাইভেটকার বৃদ্ধির জন্য ভ্রান্ত নীতিকে দায়ী করেন গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামছুল হক। তিনি বলেন, বাসের গতি বাড়াতে উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মাণে সুবিধা হয়েছে প্রাইভেটকারের। সাধারণ মানুষ প্রাইভেটকারে ঝুঁকেছেন।