জীবন সংগ্রাম

জীবনযুদ্ধে হাল ছাড়েননি সিলেটের বদরুল

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০১৭      

ফয়সল আহমদ বাবলু, সিলেট ব্যুরো

নিজের পানের দোকানে বদরুল ইসলাম— সমকাল

সিড়ির নীচে ছোট একটি দোকান। পাশেই একটি পানের বাক্স। বৃষ্টি হলে অনেক সময় পানি গড়িয়ে পড়ে তার মাথায়। অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে মাথার ওপর ছাদ টানিয়ে রেখেছেন। তারপরও তিনি ঠায় বসে থাকেন দোকানে। শুধুমাত্র খাবার সময় হলেই দোকানে তালা দিয়ে যান। মধ্য রাত পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। আর ওই ছোট দোকানের বিক্রি দিয়েই চলে তার সাত সদস্যের সংসার। টানাটানির সংসারে এখনো সংগ্রাম করে চলেছেন তিনি। ছোট পানের দোকানের আয়ে পাঁচ সন্তানের সকলেই লেখাপড়া করছে।

জীবনযুদ্ধে সংগ্রামী এই মানুষটির নাম বদরুল ইসলাম। বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার কাজলসার ইউনিয়নের রায়গ্রামে। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরেই আছেন নগরীর জিন্দাবাজার নেহার মার্কেটের নীচতলায়। রাতে থাকেন ওই মার্কেটেরই একটি রুমে। সবার কাছে তিনি 'বদরুল ভাই' নামেই পরিচিত।

বদরুল ইসলাম জানান, ১৯৮৯ সালে তিনি সিলেট নগরীতে আসেন। এরপর থেকেই চলছে তার সংগ্রাম। এর আগে মা-বাবা তাকে বিয়ে দিয়ে দেন একই এলাকার নাদিয়া বেগমের সঙ্গে। তখন সংসারের প্রতি দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। সামান্য পুঁজি দিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। বিয়ের এক বছরের মাথায় জন্ম নেয় ছেলে। নাম রাখেন বাবর আহমদ। এভাবে বদরুল-নাদিয়ার সংসারে আসে পাঁচ সন্তান। তারা এখন সবাই বড়। কেউ কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে মাস্টার্সে ভর্তির অপেক্ষায়। আবার কেউ এখনও পড়ছে স্কুলে।

বদরুল ইসলামের বড় ছেলে বাবর আহমদ বিএ পরীক্ষা দিয়ে ফল প্রত্যাশী। বড় মেয়ে রুমানা জান্নাত এবছর বিএ পরীক্ষার্থী। তৃতীয় সন্তান ছেলে বাহার উদ্দিন নবম শ্রেণিতে, চতুর্থ সন্তান মেয়ে মিলি বেগম দাখিল পরীক্ষার্থী। আর ছোট ছেলে মাজেদ আহমদ পড়ছে ষষ্ঠ শ্রেণিতে।

সন্তানদের বৃত্তান্ত বলার পর বদরুলে চোখে-মুখে যেন তৃপ্তির ছাপ। জানালেন, জীবনে যা আয় করেছেন সবই ব্যয় করেছেন সন্তানদের লেখাপড়ার পেছনে। এখনও তার ছোট ওই পানের বাক্স ঘিরে শুধু স্বপ্ন। তার সন্তানরা অনেক বড় হবে। লেখাপড়া করে মানুষের মত মানুষ হবে।

বদরুল ইসলাম বলেন, তিনি যে মার্কেটে ব্যবসা করেন সেটি সিলেটের একটি প্রতিষ্ঠিত স্বর্ণের মার্কেট। ওই মার্কেটে তিনি দেখেছেন অনেক ব্যবসায়ীর উত্থান-পতন। নিজের লোভ সামলে এখনও আগের মতই চালিয়ে যাচ্ছেন জীবন-সংগ্রাম। আগে পানের বাক্সের সঙ্গে চা বিক্রি করতেন। এখন বয়স বেড়ে যাওয়ায় লোকজনকে সময়মতো সেবা দিতে পারেন না। তাই চা বিক্রি বন্ধ করে শুধু পান বিক্রি চালু রেখেছেন। 

তিনি বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছরের জীবনে অনেকবার মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। তার দোকানের সামনেই মিছিল-মিটিং হয়েছে, ককটেল-গোলাগুলি হয়েছে। একবার মৃত্যুর মুখ থেকে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন। বছর পাঁচেক আগে রাতে একদল ডাকাত এসে হানা দেয় নেহার মার্কেটে। ডাকাতরা গুলি করতে করতে মার্কেটে ঢুকে পড়ে। বাধা দেওয়ায় নৈশ প্রহরীকে তারা খুন করে। ওই সময় তিনি একটু সময়ের জন্য মার্কেটের ভেতরে ঢুকেছিলেন। কিছুক্ষণ পর দেখেন একটি লাশ পড়ে আছে। এভাবেই অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে চলছে তার জীবন। 

বদরুল আরো জানান, অভাবের তাড়নায় অনেকবার সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়ার জন্য অনেকেই বলেছেন। কিন্তু তিনি তাদের কথায় কান দেননি।

তার কথায়— জীবন যতক্ষণ আছে ততক্ষণই চলবে সংগ্রাম।

নিজের কথামতো মাথা নত না করে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন নেহার মার্কেটের সবার প্রিয় 'বদরুল ভাই'।

বিষয় : জীবন সংগ্রাম

সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি
তারিখ সেহরি ইফতার
২৪ মে '১৯ ৩:৪২ ৬:৪২
২৫ মে '১৯ ৩:৪২ ৬:৪২
*ঢাকা ও আশেপাশের এলাকার জন্য প্রযোজ্য
সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ