বাড়ির আশপাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছিলেন খুলনার পাইকগাছার গদাইপুর গ্রামের দিলীপ বিশ্বাস। বেশিই ছিল শিরিষ গাছ। কিন্তু কিছুদিন আগে প্রায় অর্ধশত শিরিষ গাছের ডালপালা শুকিয়ে যায়। শুরুতে গাছের পাতা ঝরে যাওয়ায় ভেবেছিলেন, লবণাক্ততার কারণে এমন হচ্ছে। পরে কাণ্ডসহ ডালপালা শুকিয়ে যাওয়ায় তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তড়িঘড়ি করে কম দামে গাছগুলো বিক্রি করে দেন।

শুধু দিলীপ বিশ্বাসেরই নয়; পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলার সর্বত্র শিরিষ গাছে মড়ক দেখা দিয়েছে। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে ঘেরের আইল ও সড়কের পাশে লাগানো গাছ মরতে শুরু করেছে। তবে অন্য প্রজাতির গাছ মরেনি। দিলীপ বিশ্বাস বলেন, গাছ কাটার সময় খেয়াল করেন, ডালে এক ধরনের পোকা বাসা বেঁধেছে। বিষয়টি স্থানীয় কৃষি বিভাগকে জানালে তারা দেখে বলেছে, পোকার আক্রমণে গাছ মরে যাচ্ছে।

পাইকগাছার মটবাড়ি গ্রামের ইউনুছ আলী জানান, তাঁর বাগানে প্রায় ২০০টি শিরিষ গাছ রয়েছে। অর্ধেকেরও বেশি গাছ শুকিয়ে মারা গেছে। গাছের গোড়া এবং ডালে প্রথমে সাদা রঙের দাগ দেখা যায়। পরে সেখানে পোকা জন্মে। এর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ডালপালা শুকাতে শুরু করে। এক সময় গোটা গাছ আক্রান্ত হয়ে মরে যায়।

কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আলম বলেন, আগে লবণাক্ততায় বাড়ির ফলদ গাছ মরে গেছে। বেঁচে ছিল কিছু শিরিষ। সেগুলোও মরতে শুরু করেছে। এক সপ্তাহে তাঁর বাগানের প্রায় ২০টি গাছ ডালপালা শুকিয়ে মরেছে। আশপাশের গ্রামেও একই অবস্থা।

সামাজিক বন বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলায় প্রায় দেড় লাখ শিরিষ গাছ রয়েছে। এর মধ্যে পাইকগাছাতেই লক্ষাধিক। এক মাসে পাইকগাছায় ৮০ হাজারের বেশি শিরিষ গাছ মরে গেছে। অন্যদিকে কয়রায় কয়েক দিন ধরে গাছ মরতে শুরু করেছে। সড়কের পাশে এবং দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে অন্তত এক হাজার গাছ আক্রান্ত হয়ে মরে গেছে।

এদিকে শিরিষ গাছের ডালে লেগে থাকা ছত্রাক জাতীয় আঠালো পদার্থ সংগ্রহ করে তা প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি করছে স্থানীয়রা। পাইকগাছার কপিলমুনি বাজারের ৩-৪টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ আঠা বেচাকেনা চলছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাইকারি কিনে নিচ্ছে রাজশাহী, বগুড়া ও পাবনার ক্রেতারা।
কপিলমুনি বাজারের হাসিনা বেগম বলেন, মাসখানেক আগে জানতে পারেন, শিরিষ গাছের পোকায় আক্রান্ত আঠালো অংশ কেনাবেচা চলছে। তখন থেকেই তিনি এ ব্যবসায় জড়িত। তাঁর কাছ থেকে আঠা কিনছেন বগুড়ার অরিন্দম, হাসান ও আলম শেখ। তাঁদের কাছে জেনেছেন, এ আঠা সোনার গহনা, কাঁসার থালাবাসন ও ফার্নিচার পলিশের কাজে ব্যবহার হয়।

আরেক ব্যবসায়ী শেখ হাফিজুর রহমান লাচ্চু বলেন, প্রথমদিকে ব্যবসা ভালো হলেও এখন কমে গেছে। চাহিদা অনুযায়ী আঠা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ক্রেতার অভাব নেই। আগে প্রতিদিন পাঁচ-সাত মণ কেনাবেচা হতো। এখন দুই থেকে তিন মণ বিক্রি হয়। প্রতি কেজি তিনি বিক্রি করেন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়।
পাইকগাছা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার ইকবাল মন্টু বলেন, স্থানীয় মানুষ মরে যাওয়া শিরিষ গাছের ডাল থেকে আঠা সংগ্রহ করে বিক্রি করছে বলে খবর পেয়েছেন। গাছ মরে যাওয়ায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পাইকগাছার সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তা প্রেমানন্দ রায় বলেন, গাছগুলো পোকায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। পোকা ও আঠার নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে। ফলাফল জানা গেলে করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগ খুলনার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হারুন অর রশীদ বলেন, হঠাৎ পোকার আক্রমণে হাজার হাজার গাছ মরে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের।

সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এসএম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, লবণাক্ততার কারণে শিরিষ গাছ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। সেগুলোয় হয়তো পোকার আক্রমণ হচ্ছে।