জাদুকরি এক চুড়ি 'কোয়েল'। উপকূলের অন্তঃসত্ত্বা নারীদের হাতে থাকে এই আধুনিক চুড়ি, তাঁদের অন্য রকম সখী। দুর্গম এলাকার বিচ্ছিন্ন গ্রাম হওয়ায় এখানকার অন্তঃসত্ত্বা নারীরা থাকেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। কীভাবে গর্ভের সন্তানের যত্ন নেবেন- তাঁদের কাছে সেটা অজানা। আর্থিক সংকটে অনেকে যেতে পারেন না চিকিৎসকের কাছে।

ধীরে ধীরে হচ্ছে দিনবদল। গ্রামে গ্রামে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা হয়ে উঠেছেন অনেক সচেতন। তাঁরা আগে থেকেই রেকর্ড করা অডিও স্বাস্থ্যবার্তা পেয়ে যাচ্ছেন কোয়েল (কার্বন মনোক্সাইড এক্সপোজার লিমিটার) চুড়ির মাধ্যমে। আর এই সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছে ইউএসএআইডির অর্থায়নে 'নবযাত্রা' প্রকল্প। ২০১৫ সাল থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ সরকার ও উইনরকের সহায়তায় প্রকল্পটি পৌঁছেছে উপকূলের বাঁকে বাঁকে। প্রকল্পটির মেয়াদ আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ সময় আগের কার্যক্রমের ফলাফল কার্যকর ও টেকসই করার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি খাত ও স্থানীয় জনগণের কাছে হস্তান্তরের কাজ চলছে।

প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, যেসব অন্তঃসত্ত্বা নারীর মোবাইল ফোন নেই, তাঁদের হাতে পরিয়ে দেওয়া হয় 'কোয়েল' চুড়ি। যাঁদের মোবাইল ফোন আছে, তাঁদের মোবাইলে 'মামা' মেসেজ দেওয়া হয়। 'মামা' (মোবাইল অ্যালায়েন্স ফর ম্যাটার্নাল অ্যাকশন) হলো অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী নারী এবং তাঁদের পরিবারের কর্তার কাছে পাঠানো স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক মোবাইল বার্তা। এই যন্ত্র নারীর কাছে হস্তান্তরের আগে ১০ মাসের জন্য চার্জ দেওয়া হয়। এটি পানিতেও নষ্ট হয় না।

অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সুস্বাস্থ্য বার্তা পাঠানোর জন্য গ্রামীণ ইনটেল নিয়ে এসেছে এই চুড়ি। 'কোয়েলে' সংযুক্ত স্পিকারে প্রায় ৮০টি বার্তা শোনা যায়। এই বার্তাগুলো বাংলা ভাষায় আগে থেকেই রেকর্ড করা থাকে। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে উঠান বৈঠকে নারীদের দেওয়া হয় নানা পরামর্শ।

মৌলাদি-দয়ানি নদীঘেরা খুলনার দাকোপের পানখালী ইউনিয়নের লক্ষ্মীখোলা গ্রাম। ওই গ্রামজুড়ে লবণাক্ততার আগ্রাসন। এতে বেশি ভুগছেন নারীরা। লক্ষ্মীখোলা গ্রাম থেকে হাসপাতালে যেতে সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা। ওই গ্রামের আম্বিয়া বেগম জানান, প্রতি সপ্তাহের রোববার 'কোয়েল' তাঁকে স্বাস্থ্যবার্তা দিত। সেই বার্তা অনুসরণ করেই তিনি চলতেন। একসময় এ 'কোয়েল'ই হয়ে ওঠে আম্বিয়ার চিকিৎসক। বার্তা মেনেই সুস্থ ও স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করেছেন আম্বিয়া। আট মাস অন্তঃসত্ত্বা থাকাকালীন প্রতি মাসে ২ হাজার ২৪০ টাকা পেতেন তিনি।

নারীদের জন্য একই রকম স্বাস্থ্যসেবা এখন দিয়ে যাচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। দাকোপ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য পরিদর্শক মো. এনায়েত আলী বলেন, নবযাত্রা প্রকল্পটি মানুষের টেকসই জীবনমান উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রাখছে।

দাকোপ ছাড়াও 'নবযাত্রা' প্রকল্প কাজ করছে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ, শ্যামনগর ও কয়রায়। এ চার উপজেলার ৪০ ইউনিয়নে ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৮৯ হাজার ১৮৬ নারী কৃষকের উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক সম্পদ আয়, জীবিকা ও আর্থিক সেবায় সহযোগিতা বেড়েছে। ৩০ হাজার ৮৬৭ জন কৃষক জলবায়ু সহনশীল কৃষিকাজ ও উন্নত উৎপাদনশীল প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। ৫৪ হাজার ৯৪৮ জন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে নারী ও পুরুষের সমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা, নিরাপদ পয়ঃনিস্কাশন, শিশু ও নারীর স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং দুর্যোগ সহনশীলতার উন্নতি।

সরকারি ও বেসরকারি খাতের মূল পদ্ধতি ও অংশীদারদের শক্তিশালী করা হয়েছে। ছোট, মাঝারি ও বড় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে চাহিদা তৈরি ও সেবার বিধান সহজ করা হয়েছে। নিশ্চিত করা হয়েছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। দেওয়া হয়েছে গণনা, সঞ্চয়, ঋণ ও ব্যবসা উদ্যোগবিষয়ক 'উদ্যোক্তা সাক্ষরতা' প্রশিক্ষণ। অতিদরিদ্রদের জন্য প্রশিক্ষণকালীন মাসিক ভাতা, আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রমের ওপর প্রশিক্ষণ, নগদ অনুদান এবং সঞ্চয়ী দল গঠন করা হয়েছে।
ইউএসএআইডির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অনিরুদ্ধ হোম রায় বলেন, প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে যদি স্থানীয় সরকার কাজ করে, তাহলে এই অগ্রগতি ধরে রাখা সম্ভব।