কারণ বা অকারণে মন যখন খুব অশান্ত হয়, যখন সবকিছু অসহ্য লাগে, মনে হয় আমাকে ঘিরে আছে সব চতুর, প্রতারক, মিথ্যাবাদী, রুচিহীন মানুষের দল, তখন সবকিছু থেকে মুক্তি পেতে আমি জীবনানন্দের শহর বরিশাল চলে যাই। না, বরিশালে আমার আত্মীয়-পরিজন বা পরিচিত কেউ থাকে না, শুধু অপরাজিতার পাপড়ির মতো বেদনানাশক গভীর নীল আকাশ থাকে, নদীর হুহু হাওয়া থাকে, সেটাও নীল, সেটাও সব যন্ত্রণা মুছে দেবার মতো কোমল।
ঢাকা শহরের একঘেয়ে বিষাদাক্রান্ত সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে সদরঘাটে গিয়ে যে কোনো একটা জাহাজে উঠে পড়ি, আন্দোলিত জলের শব্দ শুনি, ঢেউ গুনি, জাহাজের মৃদু-মন্দ দোলানিতে মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে, এক সময় অস্থিরতা কেটে যায়। ভোরবেলা জাহাজ ঘাটে এসে লাগে, শান্ত ঘুমন্ত শহরে আমি নেমে পড়ি। ঘাটে আনমনে ঘুরে বেড়ানো কয়েকটা সাদা-কালো রামছাগল লম্বা পায়ে এগিয়ে এসে আমার গন্ধ শোঁকে। তাদের শক্ত বাঁকানো শিং দিয়ে আস্তে করে আদর মাখা ধাক্কা দেয়।
আমি ঘাটের ফলের দোকানদারদের সাথে গল্প জুড়ে দেই।
'ভাই এইসব আপেল, নাশপাতি, আঙ্গুর কোথা থেকে আনেন?'
'কোথা হইতে আবার? বাদামতলী, ফলের আড়ত গোনে ...'
দোকানি ব্যস্ত ভঙ্গিতে একটা আপেলের ওপর আরেকটা আপেল সাজিয়ে রাখতে রাখতে সংক্ষেপে জবাব দেয়। আমি এরপর রাস্তার পাশে সদর আলীর দোকানে বসে তেলে চপচপে গরম পরোটা দিয়ে ডাল ভাজি খাই। ঘন দুধের গরম চায়ের কাপে আয়েশ করে চুমুক দিই। রাস্তায় মানুষের চলাচল দেখি। গাছের হলুদ পাতা ঝরে পড়লে মিহিকার নতমুখ মনে পড়ে। মিহিকার অন্য জানালায় ঝুঁকে পড়ার কথা ভেবে মনটা বিতৃষ্ণায় ছেয়ে যায়। অথচ এসব মনে হওয়া থেকে মুক্তি পেতেই এখানে এসেছি আমি। এলোমেলো হাঁটি কিছুক্ষণ। একটা রিকশা ভাড়া করে সারা শহর ঘুরে বেড়াই। সদর রোড, কালীবাড়ি রোড ... দোকানে ঝুলানো সাইনবোর্ড পড়ি, সোহেল বেডিং স্টোর, ডায়মন্ড ফ্যাশন, সাহা স্টিল, সনি কসমেটিকস .., মিহিকা খুব কসমেটিকস পছন্দ করে, সাজগোজকে আর্টের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে ও। সব সময় টিপটপ, পরিপাটি, ঠোঁটে লিপস্টিক, চোখে কাজল ... এমনিতেই সে দেখতে সুন্দর, সাজলে তাকে স্বর্গের অপ্সরার মতো লাগে। আমি কখনও অপ্সরা দেখি নাই, কিন্তু কল্পনা করি তারা দেখতে হয়তো মিহিকার মতোই হবে। ওর মতো মায়াবী সুন্দর। ওফ্‌ মিহিকাকে ভুলতে চাই আমি। গায়ে পড়ে মাঝবয়সী রিকশাচালকের সাথে আলাপ জমাই। তার নাম আবদুল মজিদ। বাড়ি ঝালকাঠি। তিন ছেলেমেয়ের বাপ ইত্যাদি সাধারণ তথ্য জানা যায়।
দুপুর পর্যন্ত উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি শেষে শরীর-মন দুটোই ক্লান্ত-শ্রান্ত ও শান্ত হয়ে এলে ঘাটে ফিরে ঢাকা যাবার গ্রিন লাইন ওয়াটার বাসে উঠে বসি। জীবনানন্দের ভাষাতেই ভাবি- 'সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার ...।'
নাহ, মুখোমুখি বসিবার কেউ নেই আমার। শুধু অন্ধকারই প্রকাণ্ড মুখ হাঁ করে বসে আছে আমাকে গিলে খাবার জন্য। ভেঁপু বাজিয়ে জলযান ছেড়ে দিয়েছে, পানি কেটে এগিয়ে যাচ্ছে তরতর করে। পাশের যাত্রী এক টাক মাথা ভদ্রলোক লঞ্চ ছাড়তেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে বসে ছিলাম। মিহিকা জানে, মন খারাপ হলে আমি কোথায় যাই। কী করি, সবকিছুই জানে সে আমার। এমনকি আমার ফেসবুকের পাসওয়ার্ড, আমার প্রিয় খাবার, অভ্যাস, বদভ্যাস ... কী নয়? নিজেকে এভাবে সবকিছু ভুলে সমর্পণ করা একদম ঠিক হয়নি আমার। নিজেকে উজাড় করে দিয়ে এখন শূন্য হয়ে বসে আছি।
'এই, এই; এই যে,'
কচি কণ্ঠের ডাক শুনে তাকিয়ে দেখি আমার সামনের সিট থেকে মাথা উঁচু করে একটা বাচ্চা মেয়ে আমাকে ডাকছে। কত আর বয়স হবে তার, চার কি পাঁচ! বাহ্‌ কি ফুটফুটে সুন্দর মেয়েটা! মাথাভর্তি কালো চুল দুই পাশে ঝুঁটি করে বাঁধা, বড় বড় মায়াভরা চোখ, খুব মিষ্টি স্নিগ্ধ একটা চেহারা। জানালা থেকে চোখ সরিয়ে ওর দিকে তাকালাম আমি। বোঝা যাচ্ছে, সামনের সিটের ওপর দাঁড়িয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে সে। শিশুদের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে মন ভালো করে দেওয়ার। ওকে দেখে আমার মুখটাও নিজের অজান্তে হাসি হাসি হয়ে উঠল।
'বলো বাবু, কেন ডাকছো?'
'তোমার নাম কী?' শিশুটি বড়দের মতো মুখ করে জানতে চাইল। ওর কথায় স্পষ্ট বরিশালি টান।
'আমার নাম রাজিব, তোমার নাম কী?'
শিশুটি এ কথার উত্তর দেয়া দরকার মনে করল না। টুপ করে সামনের সিটে বসে পড়ল। ওকে আর দেখতে পেলাম না আমি। মিহিকাও হয়তো আমার জীবন থেকে এভাবেই হঠাৎ হারিয়ে যাবে। যাবে কি, গেছেই তো! দু'দিন আগে সাফায়াত নিজ চোখে দেখেছে একটা অপরিচিত ছেলের সাথে গুলশানের একটা কফিশপে মিহিকাকে বসে থাকতে।
'তুই ঠিক দেখেছিস তো? ভুলে অন্য কাউকে মিহিকা ভাবিস নাই তো!'
বারবার জিজ্ঞেস করেছি ওকে। কিরা-কসম কেটে সাফায়াত বলেছে, ঘটনা সত্যি, ওটা মিহিকাই ছিল। ছেলেটার মুখ অবশ্য ও স্পষ্ট করে দেখেনি। কিন্তু আমাদের পরিচিত কেউ যে নয় এটা সে নিশ্চিত। হতেই পারে মিহিকার কোনো বন্ধু, ভাই বা ক্লাসমেট ছিল ওটা। এই পর্যন্ত মেনে নেবার মতো উদারতা আছে আমার। কিন্তু দু'দিন ধরে ফোন বন্ধ করে রাখা কী ধরনের আচরণ? একটা মেসেজ পাঠিয়েছে শুধু, 'একটা সমস্যায় আছি, পরে কথা বলব।'
কী সমস্যা? কার সমস্যা? আমি কোনো সাহায্য করতে পারি কিনা? এই রকম কয়েকটা পাল্টা মেসেজ পাঠালাম আমি। কিন্তু উত্তর নেই।
'এই রাজিব, এই, তুমিও কি ঢাকা যাবা?'
শিশুটি আবার তার অপার কৌতুহল নিয়ে উদিত হয়েছে। মাথা নাড়লাম আমি। হ্যাঁ, ঢাকা যাব।
'আমরাও ঢাকা যাই। আমার নানার অসুখ তো, হাসপাতালে নেছে। তাই নানারে দেখতে যাই। নানা বলছে, অসুখ সারলে আমারে শিশু পার্কে নিয়া যাবে। তুমি কুনোদিন গেছো শিশু পার্কে? জানো, ওইখানে এত্ত বড় ঘোড়া আছে, হাতি আছে। ওইগুলা হইল কাঠের, আর চিড়িয়াখানা আছে না, সেইখানে আসল হাতি আছে, বান্দরও আছে ... বাঘ ... সিংগ তারপরে হরিণ আছে তারপরে উটপাখি ... কিন্তু উড়তে পারে না।'
সে শ্রোতার মনোযোগ বা আগ্রহের তোয়াক্কা না করে আপনমনে কথা বলেই যায়। শিশুটির বাবা-মা বসেছেন সামনের আসনে, তাঁদের মাঝখানের জায়গাটিতে আমার দিকে মুখ করে, পেছন ফিরে দাঁড়িয়েছে সে। আর চোখ, মুখ, হাত নাড়িয়ে নদীর স্রোতের মতো কল কল করে অবিরাম কথা বলে যাচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে রূপকথার মতো মমতামাখা শিশুটিকে দেখছি আমি। একটা কবিতা আছে না, 'পার হয়ে কত নদী কত সে সাগর, এই পারে এলি তুই শিশু যাদুকর।' যাদুকরীই সে বটে, তার ঘাড় নাড়ালে যাদু, চোখে যাদু, ঠোঁট নড়লেও যাদুর ঝিলিক।
'রাজিব, ও রাজিব, তোমার গেদা-গেদি নাই?'
দুই হাত দিয়ে ছোট বাচ্চার আকৃতি তৈরি করে দেখায় ও। এত সুন্দর করে বলে যে, খুব মজা পাই আমি। হেসে উঠি হো হো করে।
'নাহ্‌, নাই। বিয়া করি নাই তো। গেদা-গেদি কোথা থেকে আসবে?'
'ও-অ।' খুব বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ে সে। তারপর একটু থেমে ঘাড়টা কাত করে বলে,
'বিয়া করো।'
'হু?'
'মিহিকা-কে।'
'কী!'
এবার সত্যি চমকে যাই আমি। এই নাম সে কোথায় পেল! হতবাক ভাবটা কাটিয়ে প্রশ্ন করতে যাবো, কিন্তু সেই সুযোগ না দিয়েই আবার সামনের সিটের পেছনে ডুব দিল সে। যেন একটা রঙিন চঞ্চল প্রজাপতি ফুলের ওপর এসে বসেছিল, আর এখনই, মুহূর্তের মধ্যে ডানা মেলে উড়ে চলে গেছে। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারি না। উঠে দাঁড়াই, আর উঁকি দিয়ে সামনের সিটে মিষ্টি রাজকন্যাটিকে খুঁজি। দেখি মেয়েটির বাবা-মা (আসলেই কি বাবা-মা? দু'জনই তো দেখি মাঝবয়সী, হতে পারে এটি তাদের সবচে ছোট সন্তান, কিংবা বেশি বয়সে বাচ্চা নিয়েছে) চাপা গলায় নিজেদের মধ্যে সমানে ঝগড়া করে চলেছে।
'আমি আগেই কইছিলাম, ওইহানে যামু না। তুমি শোনছো মোর কথা? অহন কইলেই অইলো? আমারে বোঝাবা কী, এ্যাঁ? বোঝানের কিছু নাই। চুপ থাহো। মেজাজটা খারাপ কইর‌্যা দিও না।'
স্ত্রীর মুখনিঃসৃত মেশিনগানের গুলির সামনে স্বামীটি আমতা আমতা করছে। আমাকে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখে চোখ পাকিয়ে তাকালো দুই জনেই। যার খোঁজে এদের এই দাম্পত্য কলহের ভেতরে আমি ঢুকে পড়েছি সেই তাকে কিন্তু কোথাও দেখলাম না। গেল কই, পিচ্চিটা? সিটের নিচে গিয়ে ঢুকলো? যে বাচ্চা সিটের ওপরে উঠে, সে তো সিটের নিচেও যেতে পারে। নিজের নামটাও তো মেয়েটা বলে নাই আমাকে। আর কেমন বাবা মা ওরা? বাচ্চার খবর নেই, ওদিকে নিজেরা ঝগড়া করেই যাচ্ছে। আচ্ছা, বাচ্চাটা কি সত্যি মিহিকার নাম উচ্চারণ করেছে? নাকি আমার মন ওই নামটা শুনতে চায় বলে কান কারসাজি করে ওর মুখ থেকে ওটাই আমাকে শুনিয়েছে। হতে পারে তাই। মানুষের মন বড় বিচিত্র। তা না হলে কোনোভাবেই মিহিকার নামটা ওই বাচ্চাটার জানার কথা না। নিজেকে খুব বোকা বোকা মনে হলো। সবাই কেন আমাকেই বেকুব বানায়? মিহিকাও আমাকে বোকাই ভাবছে। ভাবছে আমি ওর খেলার পুতুল। আমাকে ইচ্ছামতো নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে। ভালোবাসার প্রতিদান কি এরকমই হয়? সবকিছু ওর ইচ্ছায় চলবে? ওর খেয়ালখুশি মতো? কাচের জানালা দিয়ে বাঁ পাশে তাকালাম আমি। পশ্চিমাকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। নদীতেও আকাশের লাল আভা। আমাদের সম্পর্কের সূর্যও অস্ত গেছে ভেবে মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠল আমার।
'রাজিব, ও রাজিব, তোমার মন খারাপ?'
কাচের চুড়ির মতো রিনঝিন শব্দ তুলে সিটের ওপাশ থেকে আবার উদয় হলেন তিনি। এবার ঝুঁটি দুটো খোলা, মুখটা ঘিরে আছে একরাশ চুল।
'হ্যাঁ, একটু তো খারাপই,
'মন ভালো হয়ে যাবে, মিহিকা ফোন করবে। ও খুব ভালো।'
চোখ নিচু করে নিজের দুই হাতের আঙুলগুলো নিয়ে খেলা করতে করতে বলল বাচ্চা মেয়েটা। এবার স্পষ্টই শুনেছি, মিহিকাই বলেছে ও। তাই আর সময়ক্ষেপণ করলাম না। সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলাম,
'তুমি কীভাবে জানো? তুমি কি মিহিকাকে চেন? দেখেছো কোনোদিন? কীভাবে ওর নাম বললে? কোথায় শুনেছো?'
এতসব প্রশ্নের উত্তরে কিছুই বলল না ও। শুধু মাথা নিচু করে লাজুক শিশুর মতো মিটিমিটি হাসতে থাকল।
'তোমার নামটাও তো বলো নাই আমাকে, কী নাম তোমার? বলো, লক্ষ্মী মেয়ে।'
প্রায় অনুনয় করে জানতে চাই আমি। এবার বোধহয় সামান্য দয়া হয় তার। মাথাটা একটু সামনে এগিয়ে ঝুঁকে আসে আমার দিকে। ঠোঁট চেপে ফিস ফিস করে বলে,
'আমি জলি। জলের ওপরে হাঁটি।'
'জলি? তোমার নাম?'
এবার গলার স্বর আরও একধাপ নিচে নামিয়ে আনে সে। আমিই গলা বাড়িয়ে কান পেতে দিই ওর কথা শোনার জন্য।
'শোনো, তোমারে বলি, কাউকে বইলো না, আমি হইলাম লঞ্চ ডুবাইন্যা পেত্নি, ওই যে দেখো না নদীর মধ্যে ছোট ছোট লঞ্চ, সবগুলি আমি ডুবায়া দিতে পারি। হি হি হি ... '
তার চাপা হাসির শব্দে কী যেন একটা ছিল, আমার সারা গা হঠাৎ ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠল। শিশুদের হাসি এত ভয়ানক নিষ্ঠুর হতে পারে, নিজের কানে না শুনলে বিশ্বাস হতো না আমার। কিন্তু এটা কী বলল ও? পরক্ষণেই মনে হলো শিশুরা কল্পনাপ্রবণ, কত অদ্ভুত কল্পনা করে ওরা! একটু সম্বিত ফিরে পেতেই দেখলাম জলি নেই। ডেকের দিকে ছুটে যাওয়া একটা লাল ফ্রকের হালকা ঝলক দেখলাম শুধু, সম্মোহিতের মতো সেই লাল ঝলকানিরই পিছু নিলাম।
যেন আমার অপেক্ষাতেই একদম ডেকের কিনারে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটি, বাতাসে হুহু করে তার ফ্রক উড়ছে, ঝুঁটিবিহীন খোলা চুল উড়ছে ...। বুকটা কেঁপে উঠল আমার।
'জলি, সরে এসো, পড়ে যাবে।'

জলি আমার কথায় আবারও হাসল। দেখতে পেলাম তার ছোট্ট মুখের ভেতরে কালো কুচকুচে ছোট ছোট দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। তারপর যা ঘটল তার জন্য একটুও প্রস্তুত ছিলাম না আমি। আমার চোখের সামনে হালকা চালে নদীর দিকে ঘুরে একটা ছোট্ট লাফ দিল জলি, ঝপাং করে মৃদু একটা শব্দ হলো। আমার বুক চিরে একটা চিৎকার বেরিয়ে এলে আমি দৌড়ে রেলিংয়ের পাশে এসে অন্ধকার নদীর দিকে ঝুঁকে পড়ি। আবছা অন্ধকারে দেখতে পাই জলের ওপর সারস পাখির মতো লম্বা পা ফেলে তরতর করে হেঁটে যাচ্ছে জলি। ডেকের ওপর জটলা করে থাকা মানুষগুলো খানিকটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকায়। যেন তাদের কারও চোখেই কিছু পড়েনি, কেউ-ই এতক্ষণ ধরে কিছুই দেখেনি।
'কী হইছে ভাই? নদীতে কিছু পড়ছে আপনের? মোবাইল ফোন পইড়া গেছে?'
এক বাদামওয়ালা একটু কাছে এসে জিজ্ঞেস করে। পাশেই বুড়োমতো একজন লোক গল্প জুড়ে দেয়, কবে সেলফি তুলতে গিয়ে কোনো ইয়াং ছেলের হাত ফসকে ফোন নদীতে পড়ে গিয়েছিল।
'আইজকালের পোলাপান সেলফি তুলতে গিয়াই মরবো।' সবশেষে মন্তব্য করে সে।
বাচ্চাটার মা-বাবার কথা মনে পড়ে আমার। ডেক থেকে প্রায় ছুটে ভেতরে ঢুকি আমি। আমার সামনের সিটে বসে থাকা দম্পতির সামনে গিয়ে রীতিমতো হাঁপাতে থাকি,
'আপনাদের মেয়ে-এ-জলি-ই-ই ...'
মহিলাটি প্রথমে চেহারা কালো করে ধমক দিতে গিয়েও থমকে যায়, কেমন হতবিহ্বলের মতো তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। পুরুষটি তোতলায়, 'কি, কি, কি, বলেন ...'
'হ্যাঁ, এই তো কিছুক্ষণ আগেও আপনাদের মেয়ে জলি সিট থেকে পেছন ফিরে আমার সঙ্গে কথা বলেছে অনেকক্ষণ ধরে।'
মহিলাটি এবার মুখে কাপড় চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। ভদ্রলোক মানে শিশুটির বাবা এবার উঠে দাঁড়ায়। আমাকে হাত ধরে টেনে পেছনে নিয়ে যায়।
'জলি আমাদের মেয়ের নাম, ঠিকাছে, কিন্তু অয় তো সাড়ে চার বছর আগে লঞ্চ দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তারে আপনে দেখবেন কেমনে, ভাই?'
'মারা গেছে?'
'হ্যাঁ, লাশ খুঁজে পাই নাই। ২১৬ জন ওই একসিডেন্টে মারা গেছিল। ওর অসুস্থ নানারে দেখতে আমরা ঢাকা যাইতেছিলাম। পথে আরেক লঞ্চের লগে ধাক্কা খাইছিল আমাগো লঞ্চ। জলি আমার কোলেই ছিল, কিন্তু তারে ধইরা রাখতে পারি নাই ...।'
ভদ্রলোকের গলা কান্নায় বুজে আসে।