ভেজানো রোদের পথে সাতরঙা দিন
চলে গেছে সেই কবে সুদূর রঙিন
জলখেলা স্মৃতিমাঠ বাল্যের ঘোর
মনে ভাসে আজও সবই নিত্য অঘোর
চোখের নদীতে বাজে জলের নূপুর
জীবনে চলার পথে যতটুকু সুর
সবই তার জলছবি অবাক দুপুর

মুহূর্তের কণাগুলো ফুরিয়ে যেতে যেতে আমাদের জীবন গতি এগিয়ে চলে নিঃশেষের দিকে। যতই এগোই ততই পিছনের সুতায় পড়ে টান। আমরা পিছু ফিরি। খুঁজে ফিরি সময়ের কণায় সুপ্ত হয়ে থাকা লাল নীল শতরঙা জলছবি। যার চিত্রলে আঁকা আছে আমাদের হাজারো দুরন্তপনার বহুবর্ণিল আর বহুরৈখিক দিনের যাপিত ক্ষণ। সে ক্ষণ, সে শৈশব আমাকে হাতছানি দেয়, ডাকে আয় আয়।
আজ এ পর্যায়ে শৈশবের সেসব ক্ষণ আমার চলমান জীবনের বিনিয়োগ হয়ে ওঠে। আমি সুদে-আসলে শোধ করি তার মধুচক্র ঋণ। বাড়ির দক্ষিণে দূরের মাঠের একপায়ে দাঁড়ানো তালগাছ কিংবা দীঘির পাড়ের ঘন ঝোপের পাশে বাতাসে দোলানো কাশফুল ঢেউ আমাকে আজও মথিত করে, উন্মন করে। মন হয়ে ওঠে উচাটন। আমি প্রকাশের অস্থিরতায় কবিতার রক্তক্ষরণে ডুবে যাই। মন্থিত হৃদয় খুঁড়ে গড়ে তুলি যে শিল্পসৌধ তা যে আমারই শৈশবের জলজ্যান্ত প্রতিচ্ছবির সুষম জারক রস। এই রসের সাগরে ভাসতে ভাসতে এই শহর, কোলাহলময় রুদ্ধশ্বাস সব অবিরল জলচিত্র হয়ে আমাকে যে নির্জনতার নিঃসঙ্গতায় দাঁড় করায় তা আরাধ্য সংগীতের মতো আমার হৃদয়ে পরশ বুলায় শান্তির, সৌম্যের। মেঘভূমির চূড়ায় বসে আমি যে ত্রিকোণ সংসার আঁকি তাতে নিত্যই জলের স্থাপত্যে ওড়ে জলছবি দিন। স্মৃতির ক্যানভাসে কাঁপে যে অদৃশ্য ছায়াচিত্র তাতে বায়োস্কোপের নন্দিত গতির ঝলকে দেখি আমারই গ্রামের সেই পুকুর, সেই দীঘি। পুকুরের পাড়ের কদম গাছ, জাম আর ডুমুরের গাছ।
আমি জন্মেছি গ্রামে। বেড়েও উঠেছি সেখানে। আজন্ম শৈশব-কৈশোর, এমনকি কৈশোরোত্তীর্ণ কালও আমি গ্রামেই কাটিয়েছি। জন্ম ও বেড়ে ওঠা গ্রামে হওয়াতে আমি মনে করি বিশেষ বৈচিত্র্যময় বাল্যকাল আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ করেছে। যা থেকে সত্যিকারভাবেই বঞ্চিত শহরের নান্দনিক বাল্যকাল।
কুমিল্লা গোমতী নদীর তীরে হলেও আমার গ্রাম রতনপুর থেকে তা বহুদূরে। মেঘনা চাঁদপুরে। হাজীগঞ্জ দিয়ে ডাকাতিয়া নদী বয়ে গেছে। আমার দুর্ভাগ্য, তিনটি নদীর কোনোটিই আমার কাছাকাছি নয়। তবে এটুকুকে সৌভাগ্য মানতে হয়, বাড়ির নিজস্ব পুকুর ছাড়াও গ্রামে রয়েছে মসজিদ সংলগ্ন এক বিশাল এক দীঘি। দীঘিটি এত বড় যে এর এপাড় থেকে ওপাড়ের সীমানা ঝাপসা মনে হতো। গত বছর গ্রামে গিয়ে দেখি দীঘির পাড় অনেকটাই সংকুচিত। পাড় ভরাট করে করে এখন তার প্রায় অর্ধেকই ফসলি জমি। তবু আয়তনে এখনও যা, তাতে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো সম্ভব।
একদিন শ্রাবণের ভরদুপুর। দীঘির ঘাটে একা আমি। তখন থ্রিতে পড়ি কেবল। আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। যে কোনো সময় আকাশ আর চরাচর মাড়িয়ে তুমুল গতিতে বৃষ্টি নামবে। তবু আমি ঠায় ঘাটে বসা। উত্তরপাড়ের ঘাট। দক্ষিণে সুদূর দূর দিগন্ত ঘিরে মেঘের নাচন দেখতে বেশ লাগছিল। বাল্যের সে অনুভূতিতেও কেমন এক কাব্যিক ঘোরলাগা সুর। আমি তন্ময় হয়ে দীঘির জলের স্তব্ধতা দেখি। দেখি জমাট মেঘের স্থবিরতা। এ সময়ে দৃশ্যপটে হাজির আমার এক কাজিন। আমারই সমবয়সী। একই ক্লাসে পড়ি তখন।
কী করিস?
জানতে চাইল।
কিছু না, আকাশ দেখি।
আমার উদাস উত্তর।
বলল-
চল শাপলা তুলি।
দীঘিতে লাল শাপলা। তবে খুব বেশি নয়।
বললাম-
বৃষ্টি নামবে। তীব্র তুমুল বৃষ্টি।
আরে গাধা, এতেই মজা
তার তিরস্কার।
কথা বলতে বলতেই চারদিক অন্ধকার করে ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি এলো। আমরা জলে। জলখেলায় মত্ত। কখনও ডুবসাঁতার। কখনও চিতসাঁতার। কখনও বুকসাঁতার। প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সাঁতার কাটার কী যে আনন্দ, তা অভিজ্ঞজনই কেবল উপলব্ধি করতে পারবেন। চিতসাঁতারে মুখ ঊর্ধ্বমুখী। আর তাতে বৃষ্টির শৈল্পিক আঘাত। এতে শিহরিত আপাদমস্তক। সেদিন শাপলা তুলেছিলাম বেশ। বৃষ্টিভেজা শাপলার লাল ফুলে লেগে ছিল আনন্দের শিহরিত সুর। আর ছিল জলের ঢেউয়ে ভেসে আসা নির্মোহ আর নির্মলতার গুনগুনে নিবিষ্টতার গীত। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে সে গীত একাকার হয়ে আনন্দের যে অনিন্দ্য উৎসার তৈরি করেছিল তা আজও মনকে ভিজিয়ে দেয়। শীতল করে।
আমাদের নিজস্ব যে পুকুর তার পশ্চিম পাড়ে ঘাট। পুব পাড়ে আরও কিছু গাছের সঙ্গে কোণে একটি কদম গাছ আমাকে ভাবাত বেশ। দক্ষিণ পাড়ের জামগাছ ছিল শৈশবের প্রিয় একটি স্থান। গাছটি এমন ছিল যে এর ওপরে উঠে এর শাখায় হেলান দিয়ে আমরা বই পড়তে পারতাম। বিশেষ করে পাঠ্যবই বাদ দিয়ে গল্পের বই পড়ছি। এ কারণে বাসার বকুনি এড়াতে গাছে উঠে বই পড়তাম সকলের অগোচরে। তো সেই গাছ অন্য কাজেও ব্যবহার করতাম বেশ। গাছটি ডালপালা ছড়িয়ে পানির ওপর অনেকখানি বিস্তৃত ছিল। পুকুরে কেবল সাঁতারই কাটতাম না। গাছ থেকে ঝাঁপিয়ে পানিতে পড়াও ছিল নিত্যদিনের কাজ। যত ওপর থেকে ঝাঁপ দেওয়া যেত তত বেশি পানির গভীরে যাওয়া যেত। এর জন্য সাহসের দরকার থাকত বৈকি। জলের অতল ভূমি ছুঁয়ে অন্ধকার মাড়িয়ে উচ্ছ্বাসের হীরক কণা দু'চোখে মাখিয়ে তারপর ভুস করে ভেসে উঠে সব আচ্ছন্ন দেখতাম। রৌদ্রের ঔজ্জ্বল্যে আচ্ছন্নের ঘন স্তর যেন আরও গভীরতা পেত। তারপর ধীরে ধীরে আলো সয়ে নিত চোখ।
পুকুরের চারপাড় ঘিরে আরও বেশ গাছ ছিল। বিশেষভাবে এই ক'টি গাছের কথা বললাম। কারণ, এগুলো থেকে আমরা পুকুরের জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতাম। এ কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতাম ডুমুরের গাছটি। এটি অনেক বেশি জলের ওপর ছড়ানো ছিল। উঠতেও ছিল সহজ। গাছটির বেশ কিছু ডাল পানির ওপর বিছানো ছিল বলে তা ধরে ধরে জলের ওপর ঝুলে থাকতাম। মজা পেতাম বেশ। শরীরের অর্ধেক জলে আর অর্ধেক ওপরে গাছের ডালের সঙ্গে। বেশির ভাগ সময় দলবেঁধে পুকুরের জলে নামতাম। ঝুলে ঝুলে গল্প করারও সুযোগ পেতাম। তারপর হাত ধরে এলে আবারও ঝুপ করে জলে। সাঁতরে সাঁতরে এদিক থেকে সেদিক যাওয়া।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরের জলে থাকা, হাঁসের মতো তিরতির করে এপাড় থেকে ওপাড়ে সাঁতরে যাওয়া, কখনও ডুবসাঁতার, কখনও চিতসাঁতার, আবার কখনও প্রজাপতি সাঁতারে নিজের মুন্সিয়ানা জাহির করে দুরন্তপনায় নিজেকে সঁপে দেওয়া ছিল বলতে গেলে প্রতিদিনের আনন্দ অভ্যাস।
জলক্রীড়া কিংবা জলের খেলা- সে আসলে দারুণ উপভোগ্য আর মনোমুগ্ধকর। সে কারণেই বোধ হয় একবার জল পেলে তা থেকে নিজেকে বিযুক্ত করা দুঃসাধ্য মনে হয়। আজও এত বয়সেও জল দেখলেই মনে হয় নেমে পড়ি। তা সে যেখানেই হোক। মনে হয় সাঁতরে সাঁতরে পার হয়ে যাই জগতের সকল অবরুদ্ধ সীমানা।
জলখেলায় আমাদের আরেক অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল স্লিপিং খেলা। পুকুরের পাড়ের মসৃণ অংশ বেছে নিয়ে তাকে আরও মসৃণ করে স্লিপিং পয়েন্ট বানানো। পাড় থেকে স্লিপ কেটে সোজা জলের গভীরে চলে যাওয়াটাও ছিল বিশেষ মজার এক খেলা। এ খেলায় কে আগে কে পরে যাবে, তা নিয়ে ছিল বেশ তর্কাতর্কির ব্যাপার। স্লিপিং পয়েন্ট তৈরিও ছিল বেশ ঝক্কির কাজ। তবু আনন্দের জন্য যে কোনো কষ্টই নস্যি হয়ে যেত।
এদিকে বিশেষ করে স্কুল ছুটির দিনগুলোতে একবার পুকুরে নামলে কার সাধ্যি টেনে তোলে। দীর্ঘ সময় জলের অন্দর আর বহির্মহল ঘুরে ঘুরে চোখ লাল করে যখন পাড়ে পৌঁছাতাম, আম্মার বকুনি সেদিন ঘাম ছুটিয়ে দিত। আবার কখনও কখনও কানে পানি ঢুকিয়ে অসুখ বাঁধিয়ে বসতাম। তখন আবার আব্বার দৌড়াদৌড়ি ডাক্তার বাড়িতে। প্রসঙ্গত বলতে হয়, আমার শিক্ষক পিতা সন্তানদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল এবং যত্নশীল। শরীরের সামান্য বেসামাল অবস্থাকেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সারিয়ে তোলার যথাযথ ব্যবস্থা নিতেন। কেবল ওষুধে নয়, পথ্য আর সেবা দিয়েও তিনি তৎপর থাকতেন সব সময়। আব্বার কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ল ছোটবেলায় সাঁতার শেখার কথা। তিনি দূর শহরের কর্মস্থল থেকে যখন বাড়ি আসতেন, তখন তাঁর সঙ্গে সাঁতার কাটা ছিল অত্যন্ত আনন্দের এক অভিজ্ঞতা। সাঁতারের যা কিছু হাতেখড়ি তা আব্বার হাত ধরেই। তিনি কিছুদিন হাতে ধরে ধরে পরে কলাগাছ ধরিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থেকে জলের ভয় দূর করেছেন। তখন বয়স কতইবা হবে। চার কি পাঁচ বছর।
গ্রামের প্রতিটি বাচ্চাই কোনো না কোনোভাবে সাঁতারে পারদর্শী হয়ে যায়। সাঁতার তাদের জন্য আনন্দমুখী শৈশব রচনা করে দেয়। যখন অনেকের মুখেই শুনি সাঁতার জানে না, বিশেষ করে শহরে বেড়ে ওঠা লোকজন, তখন একসময়ে খুবই অবাক হতাম। সাঁতার জানে না এ আবার কী। সাঁতার আবার জানতে হয়? তেমন করে নিয়ম মেনে শিখতে হয়? আসলে গ্রামে পুকুর, নদী আর খালবিল থাকায় সাঁতার কাটা বাচ্চাদের কাছে এতই স্বাভাবিক একটি বিষয় যে একে আলাদা করে আর কিছুই মনে হয় না। কিন্তু শহরে তো ভিন্ন পরিস্থিতি। এখানে এখন এক কাঁড়ি টাকা ঢেলে সময়ের সীমাবদ্ধতা মেনে বাচ্চারা সাঁতার শিখতে যায়। কিন্তু এতে কতটুকু অনাবিল আনন্দ প্রাপ্তি তা আমার অজানা।
আগেই বলেছি, আজও জল দেখলে আমার তাতে নেমে পড়তে ইচ্ছে করে। তা সে যখন-তখন যেখানেই হোক। জল বলে কথা। জলখেলা, জলের নাচন মনকে অস্থির করে, আনন্দময় করে।
একবার আমরা কয়েক বন্ধু মিলে মুন্সীগঞ্জ বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেটি ২০১৭ সালের মে মাসে। বন্ধু পাপড়ি রহমান, শেলী নাজ, জ্যাকি কবীর, উম্মে কুলসুম রত্না, সামসুন্নাহার শুভ এবং আমি। মুন্সীগঞ্জের গ্রামের পথ দিয়ে যেতে যেতে এক বাড়ির পাশে আমাদের গাড়ি গেল নষ্ট হয়ে। তখন দুপুর বারোটার কিছু আগে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির পাশের কাঁঠাল গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলাম। অসহ্য গরমে হঁাঁসফাঁস অবস্থা। কিছু পরে বাড়ির ভেতর থেকে ডাক এলো ভেতরে গিয়ে বসার জন্য। আমরা তো মহা-আনন্দিত। গরমে অতিষ্ঠ এই আমরা ঘরের ভেতর ফ্যানের নিচে বসে হাড়হাড্ডি জুড়াতে লাগলাম। বাড়ির গেরস্তের পোলট্র্রি ফার্মের ব্যবসা। তিনি স্কুলপড়ূয়া কন্যাকে নিয়ে থাকেন। তার নাম মালিহা। তার মা মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি নিয়ে আছেন। মালিহা প্রস্তাব দিল, আমরা চাইলে গোসল করতে পারি। টিউবওয়েল কিংবা পুকুর যে কোনোটিই বেছে নেওয়া যায়। সে দুপুরের খাবারের আয়োজন করছে বলেও জানাল। কারণ মালিহা ততক্ষণে জেনে গেছে আমাদের গাড়ি কখন ঠিক হবে বলা মুশকিল। দূরের দোকানে লোক পাঠানো হচ্ছে গাড়ির পার্টস আনার জন্য। সুতরাং সে সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। বুদ্ধিমতী এবং সহৃদয় মেয়েটি কেবল আমাদের গরম জুড়াবার ব্যবস্থাই করল না, খাবার এবং আনন্দ আয়োজনেও তৎপর হলো।
আমরা পুকুরে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম। একটা রোমাঞ্চ অনুভূতি নিয়ে অপেক্ষা করছি পুকুরে নামার। মালিহা আলমারি থেকে তার মায়ের কয়েকটি জামা বের করে বলল-
কাছাকাছি পুকুর আছে। আপনারা সেখানেই যেতে পারেন।
আমাদের টগবগে আনন্দ আর দেখে কে! কাপড় কাঁধে দিয়ে চললাম পুকুরের দিকে। আমি রত্নাসহ ঝাঁপ দিলাম পুকুরে। শেলী কিনারে কিনারে ঘুরল সাঁতরানোর অদম্য আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। সাধ্যে তার কুলাল না। জলে পা ভিজিয়েই তার আনন্দ। অন্যরা ওপর থেকেই আমাদের উৎসাহ দিচ্ছিল। অজানা অচেনা পুকুর। তবু জল দেখেই উত্তেজনার চাপে সমস্ত আশঙ্কা কোথায় উবে গেল কে জানে! অন্তত বছর বিশেক পরে আমি সাঁতার কাটলাম ইচ্ছেমতো। যাকে বলে 'গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার'। আবারও জানলাম, সাঁতার একবার যে শেখে সে কখনই ভোলে না।
আমার স্কুল পয়ালগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পয়ালগাছা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় এবং পয়ালগাছা ডিগ্রি কলেজ- এ তিনটি প্রতিষ্ঠান একই সীমানার ভেতর অবস্থিত। স্কুলের বিশাল মাঠ শেষে দক্ষিণে রয়েছে একটি পুকুর। পুকুর শেষে খোলা প্রান্তর একেবারে দিগন্তবিস্তারী। দৃষ্টিনন্দন ও বিশাল স্কুল ভবনের দোতলায় নাইনের ক্লাসরুম থেকে খোলা প্রান্তর বেশি ভালো দেখা যেত। একদিন তীব্র তুমুল বৃষ্টি। ঘর থেকে বেরোনোই দায়। বলতে গেলে ক্লাস মিস না করা এই আমি স্কুলে যাব না তা যেন কখনই ভাবতেই পারতাম না। বিপুল বর্ষার কারণে সেদিন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা। বিরামহীন বৃষ্টিতে মাঠ, পুকুর প্রান্তর সব একাকার। আমাদের মেজাজি শিক্ষক ধীরেন্দ্রনাথ সিংহকেও সেদিন আচ্ছন্নতায় পেয়ে বসেছিল। ক্লাসে স্যার পড়ানোর চেয়েও গল্পে ডুবেছিলেন বেশি। তিনি বলছিলেন তার শৈশবের কথা। আর আমি বৃষ্টিমুখর মন নিয়ে কেবলই সাঁতরাচ্ছিলাম সেই নদী-প্রান্তর, যেখানে বর্ষার থইথই জল আমাকে কেবলই মথিত করছিল, উন্মূল করছিল সপ্রাণ।
জল নদী মেঘ আজও আমাকে খুবই কাতর করে। তাই এসব নিয়ে ভাবতে কিংবা বলতে গেলে মন আজও অস্থির ও চঞ্চল হয়ে ওঠে। বিনি সুতোর মালার মতো স্মৃতির জট আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধে। মনে পড়ে ছোটবেলার কোনো এক তীব্র তুমুল বর্ষার বিকেলের কথা। টানা ঘোর বৃষ্টিতে পথঘাট ডুবে ফসলি জমি আর পুকুর সব একাকার। সারাদিন অবিরাম বৃষ্টির পর বিকেলে হঠাৎ কনে দেখা মায়াবী আলোর স্রোত। ওই আলোর পথ ধরে আমি কলার ভেলায় চড়ি। বাড়ির সীমানা ছেড়ে চলে যাই দূর থেকে আরও দূরে। জলের খোলা সীমানাহীন রুপালি চত্বর ধরে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। এ যাওয়ার যেন কোনো শেষ নেই। এক ঘোরগ্রস্ত বালিকা যেন বিভ্রমে মজে কোথাও হারিয়ে যেতে চেয়েছিল সীমানাহীন দিগন্তের পাড় ধরে। সন্ধ্যার কুয়াশাচেরা আঁধার তাকে শঙ্কিত করে। সে বাড়ি ফেরে আনন্দের নিঝুম দ্যোতনা নিয়ে।

মেয়েটি বাড়ি ফেরে, ফেরে নাকি?
আহা, মন তার পড়ে থাকে জলের রুপালি চত্বরে
যেখানে আনন্দ-বেদনার অনিত্য ঢেউ খেলা করে
বৃষ্টি, বাতাসের সমুচ্চায়ী স্বর বিদ্ধ করে মন,
সে মন কেন যে পোড়ে ধিকিধিকি
মেয়েটি ফিরে আসে শহরের রুদ্ধশ্বাস আর্তনাদে
জলখেলা ছেড়ে বিদায়ী বার্তায় আঁকে
বিষাদ অথবা বিপন্নতার অমুদ্রিত ঘোর...