শত্রুকে পাকড়াও করিয়া হাত দুইটি শক্ত দড়ি দিয়া বাঁধিয়া সেই দড়িখানি স্কুলের বেঞ্চের নড়বড়ে পায়ার সহিত বাঁধা হইয়াছে। কিন্তু এই শত্রু গল্পের নায়ক নহে; কথকই এই গল্পের মূল চরিত্র। পাকিস্তানি সৈনিকটি কি পালাইয়া যাইবার চেষ্টা করিতে পারিত না? গ্রামের মানুষজন যখন তাহাকে ঘিরিয়া ফেলিয়া মোটা দড়ি লইয়া তাহার দিকে অগ্রসর হইল তখন সে তাহার রাইফেলটি এক পাশে রাখিয়া দুই হাত বাড়াইয়া দিয়াছিল। দড়িতে বাঁধিয়া তাহাকে স্কুলের বারান্দায় আনিয়া ফেলা হইল। প্রশ্ন হইল কীভাবে তাহাকে হত্যা করা হইবে। গ্রামের মানুষজন তাহাকে পিটাইয়া মারিয়া ফেলিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে শেষ পর্যন্ত তাহারা মুক্তিবাহিনীর জন্য কাজটি রাখিয়া দেয়। পরের দিন সকালেই মুক্তিবাহিনীর দুই জওয়ান ছেলে রাইফেল কাঁধে আসিয়া উপস্থিত হয়। একজন এই গল্পের কথক, তাহার সঙ্গীর নাম খলিল। কিন্তু কীভাবে ধৃত শত্রুকে হত্যা করা হইবে? গুলি খরচ করিবার প্রয়োজন আছে কি? গুলিতে আওয়াজ বহুদূর অবধি ছড়াইয়া পড়ে; পাকিস্তানি সৈন্যদের ঘাঁটিতে পৌঁছিলে পাল্টা আঘাত আসিতে পারে। উত্তেজনা বা উন্মাদনার বশে ছুরি চালাইয়া বা কোপাইয়া হত্যা করা যাইত বটে কিন্তু উপস্থিত সেই পরিবেশ নাই। শত্রুকে শেষ করিলেই চলিবে না তাহার লাশ নিশ্চিহ্নভাবে নদীতে ভাসাইয়া দিতে হইবে যাহাতে এই গ্রামেই তাহাকে হত্যা করা হইয়াছে সেই প্রমাণ না থাকে। খলিল বলিল, লোকটিকে এইখানে রাখা যাইবে না, আবার গুলি করিয়াও মারা যাইবে না। সেই কথা মতো লোকটিকে নৌকায় উঠানো হইয়াছে। কী পদ্ধতিতে কাজটি সারা যায় তাহা লইয়া কথা হইল। গল্পের কথক একখানা বুলেট খরচ করিয়া ঝামেলা চুকাইয়া ফেলিবার কথা ভাবে। নৌকা চালাইতে চালাইতে খলিল দ্বিমত পোষণ করিয়া গলা টিপিয়া হত্যা করিবার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়। তাহার কথাই চূড়ান্ত।
কিন্তু কথক কী করিয়া কোনো কারণ ব্যতিরেকেই দড়িতে বাঁধিয়া রাখা এই নিরীহ শত্রুসৈন্যটির গলা টিপিয়া ধরিতে পারে? এই মুহূর্তে তাহার মনে কোনো রাগ নাই, ক্রোধ নাই, উন্মাদনা নাই। ইহা ঠিক যে চোখ বন্ধ করিলে অহরহ সে দেখিতে পায় পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে নিহত তাহার পিতার লাশ শকুনে কুকুরে কামড়াকামড়ি করিয়া খাইতেছে। চোখ বন্ধ করিলেই সে দেখিতে পায় বোনের ছিন্নভিন্ন যোনি কিংবা ভাইয়ের টকটকে লাল হূৎপিণ্ড। কিন্তু এই মুহূর্তে শরীরে কোনো রাগ নাই। কোনো উত্তেজনা নাই। অথচ দড়িতে বাঁধা লোকটিকে গলা টিপিয়া ধরিয়া তাহার প্রাণবায়ু বাহির করিয়া দিতে হইবে। ইহার যথার্থ্য নিরূপণের জন্য কথক বলে, 'শুয়োরের বাচ্চা তুই নিজে কি করেছিস? বল তুই, আমি জানতে চাই।'
গল্পের কথক রাইফেলে গুলি করিতে অভ্যস্ত। পাথরের দেয়ালের চাঁদমারি আর পাকিস্তানি সৈনিকের মধ্যে কোনো তফাত আছে কিনা এই চিন্তা তাহাকে কখনও দ্বিধাগ্রস্ত করে নাই। তবে এইক্ষণে তাহার মনে হত্যার যথার্থ্য লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। শত্রুপক্ষের ধৃত সৈন্যটি নিরীহ। সে পালাইয়া যাইতে চেষ্টা করে নাই। পা বাঁধিতে গেলে সে বরং পা বাড়াইয়া দিয়া সহায়তা করে। কথকের মনে হয়, শত্রুসৈন্যটি যদি আক্রমণ করিত, একটিমাত্র বুলেট খরচ করিবার অজুহাত মিলিয়া যাইত অথবা হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উহাকে এক ধাক্কায় নদীর পানিতে ফেলিয়া দিয়া আপদ চুকানো যাইত।
একটি ছোটগল্প যেইরূপ হওয়া উচিত এই গল্পটি তদ্রূপ। ইহার পরিসর স্বল্প, সময় এইখানে স্থির হইয়া আছে। ইহাতে কথক কিংবা খলিলের শৈশবের কোনো গল্প নাই, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নাই, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্যায় অত্যাচারের বিশদ বর্ণনা নাই। ধৃত শত্রুকে কীভাবে নিকাশ করা হইবে এই প্রশ্ন গল্পের ভিতর সটান উত্তেজনা সৃষ্টি করিয়াছে। কথকের নামটি পর্যন্ত উল্লেখ করিবার অবকাশ নাই। ইহা তাহার জীবনকাহিনি নহে; জীবননামীয় নাটিকার সংক্ষিপ্ত একটি দৃশ্যপট মাত্র। ধৃত শত্রুকে হত্যা না করিয়া উপায় নাই। সময় সংক্ষিপ্ত। অথচ হত্যাকারী দ্বিধাদ্বন্দ্বে আড়ষ্ট হইয়া পড়িয়াছে। লেখকের দৃষ্টি মূলত এই সিদ্ধান্তবিন্দুতে উপনীত। শেষ পর্যন্ত কী ঘটিবে রহস্যময় প্রশ্নটি পাঠককে শ্বাসরুদ্ধ করিয়া ফেলে। নদীতে চলন্ত নৌকার কয়েক মুহূর্তের ঘটনাই হাসান আজিজুল হকের লক্ষ্যবিন্দু। এই গল্প কার্যত একজন মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক শত্রুসেনাকে হত্যার সামান্য বিবরণ নহে। হত্যার মুহূর্তেই হন্তারকের মনে যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঘনাইয়া উঠিতে পারে সেই বিষয়টির প্রতি তিনি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে আগ্রহী। ধৃত শত্রুকে হত্যার সিদ্ধান্ত এবং করণকৌশল নিরূপণ লইয়াই এই গল্পের শিরদাঁড়া গঠিত।
কথক শেষ পর্যন্ত শত্রুকে গলা টিপিয়া হত্যা করিতে পারিল কিনা তাহার বিবরণ উহ্য রাখিয়াই হাসান আজিজুল হক গল্পটি সমাপ্ত করিতে পারিতেন- তাহাতে দোষ হইত না : ছোটগল্প কতভাবেই না সমাপ্ত হইয়া থাকে! কিন্তু ছোটগল্প সচরাচর একটি সমস্যার অবয়ব লইয়া বা একটি ধূমায়মান প্রশ্নের চৌহদ্দিতে আবর্তিত হয়; সমস্যার সমাধান না দিলেও চলে। এই জন্য চলে যে বিশ্বসংসারে মানুষ অভিন্ন সমস্যার বিচিত্র সমাধান দেখিতে অভিজ্ঞ। উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরও আবশ্যকীয় নহে। এই জন্য আবশ্যকীয় নহে যে পরমেশ্বরের এই পৃথিবীতে একই প্রশ্নের বিভিন্ন উত্তর রহিয়াছে। ছোটগল্পের জন্য যাহা আবশ্যকীয় তাহা হইল লেখকের মনে উদীত প্রশ্নটি ন্যায্য কিনা; যে সমস্যাটির রূপ প্রকটিত করিতে লেখক উদ্যত হইয়াছেন তাহা সত্যই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় কিনা।
শত্রুপক্ষের একজন বিচ্ছিন্ন সৈন্য ধরা পড়িয়াছে। তাহাকে শক্ত করিয়া বাঁধিয়া ফেলা হইয়াছে। তাহাকে নির্বিঘ্নে হত্যার উদ্দেশ্যে নৌকায় উঠানো হইয়াছে। তাহাকে হত্যার দায়িত্ব কথককে দেওয়া হইয়াছে। অথচ তাহার জানা নাই এই সৈন্যটি বাস্তবে নিরীহ নাকি পাপিষ্ট; যেন পাপিষ্ট হইলে সে সহজেই হত্যাযোগ্য। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর জানা নাই। তাই তাহাকে গলা টিপিয়া মারিয়া ফেলিবার সহজ কাজটি কথকের জন্য সহসা কঠিন হইয়া ওঠে।
'শত্রু' নামীয় এই গল্পটি একটি আদর্শস্থানীয় ছোটগল্পের সকল চিহ্ন বহন করিতেছে। গত দুই শত বৎসরে পৃথিবীব্যাপী নানা লেখক নানা ধরনের গল্প উপহার দিয়া জগতের সাহিত্যভাণ্ডার ঋদ্ধ করিয়াছেন। কিন্তু 'শত্রু'র মতো গল্পই 'ছোটগল্পের' সংজ্ঞার্থ নির্মাণ করিয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হয় না। তুর্গেনিভ বা রবীন্দ্রনাথ এই রূপ ছোটগল্প লিখিতে ভালোবাসিতেন। শেখভের 'এক কেরানীর মৃত্যু' এবং মুরাকামীর 'বিড়ালের শহর' গল্প দুইটির কথাও এই সূত্রে মনে পড়িতেছে। ইহাই লেখকদের পছন্দের রূপবন্ধ।
২.
হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্পের সূচনাতেই তাহার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু স্পষ্ট হইয়া ওঠে। 'মাটির তলার মাটি' গল্পের প্রথম অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করিতেছি : 'মানুষটা রগচটা। চিবুকের নিচে ধানের নাড়ার মতো ঘন কর্কশ একগুচ্ছ দাড়ি। ক্ষুদে ক্ষুদে কটা চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। বয়সে ষাটের কাছাকাছি; কিন্তু দেহের বাঁধন এখনও মজবুত। শরীরে রস বলতে কিচ্ছু নেই, পেশিগুলো দড়ির মতো পাকানো। চুল ছোট করে ছাঁটা।' পাঠক অবিলম্বে বুঝিতে পারেন তবে ইহা বর্ণিত রগচটা মানুষটিকে লইয়া কোনো গল্প হইবে।
'পাতালে হাসপাতালে' দীর্ঘ গল্প; ইহার সূচনাংশ এই রকম : 'এমারজেন্সির লোকটি মুখ নিচু করে টেবিলে কিছু একটা দেখছিল। অন্যমনস্কভাবে চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো তার থেকে মাত্র হাত দুয়েক দূরে দুজন আধবয়েসি আর এক বুড়ো একটা লোককে কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুড়োর পাতলা লম্বা নাকটা এক দিকে বাঁকা। কাঁচাপাকা খুদে খুদে দাড়ি বেয়ে ঘাম ঝরছে। যাকে কাঁধে নিয়ে তারা দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখ দেখা যায় না; তার একটা পা ঝুলছে আর একটা পা আঁকশির মতো বুড়োর কাঁধে আটকানো। লোকটার শরীরের বাকি অংশ আধবয়েসি দুজনের ঘাড়ে কুকুরকুণ্ডলি হয়ে আছে। তিনজন একসাথে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো।' গল্পের শিরোনাম 'পাতালে হাসপাতালে' না রাখিলেও প্রথম অনুচ্ছেদেই ইহা স্পষ্ট হইয়াছে যে লেখক হাসপাতালের কাহিনি শুনাইবেন। হাসপাতাল হইল ডাক্তার, রোগী, নার্সদের জগৎ; রক্ত, পুঁজ, ব্যান্ডেজ, ব্যথা ও যন্ত্রণার এক অন্যরকমের পৃথিবী। হাসান আজিজুল হক এই জগতের কাহিনি শুনাইবেন। হাসপাতালের কাহিনির ঝাঁপি খুলিয়া তিনি সাত কাহন ফাঁদিয়া বসিবেন না। তাহার দৃষ্টি একাগ্র। একাগ্র দৃষ্টির অভিজ্ঞতাই তিনি তাড়াইয়া তাড়াইয়া বর্ণনা করিবেন। এই বর্ণনায় কোনো আলস্য থাকিবে না, কোনো কার্পণ্য থাকিবে না। তাহার বর্ণনা হইতে কিছু বাদ পড়িবে এই রূপ আশঙ্কার সংগত কোনো কারণ নাই।
তিনি খুব ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুটি গুটি অক্ষরে লিখিবেন : 'ইতিমধ্যে পুরোনো পৃথিবী আরও পুরোনো হতে থাকে। মাটি পাথর হয়ে যাচ্ছে, দিঘি বুজে যাচ্ছে, বাতাস শুকিয়ে আসছে, আকাশ বৃষ্টি পাঠিয়ে আবার তুলে নিচ্ছে, গাছগুলো বুড়িয়ে হাত-পা গুটিয়ে নুলো হয়ে পড়ছে, শিশু শিশু হয়ে স্থির হতে না হতে কিশোর, কিশোর থেকে যুবক আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বুড়োটে মেরে যাচ্ছে। পৃথিবীকে দুইয়ে আর কিছু পাওয়া যায় না।'
সময়ের প্রবহমানতাকে এইভাবে অক্ষরে অক্ষরে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন হাসান আজিজুল হক। তাহার বর্ণনা নিখুঁত। যে অনুপুঙ্খতার সহিত তিনি একজন মানুষকে বর্ণনা করিয়াছেন অবিকল একই ধীরলয়ে সময়ের বর্ণনা দিয়াছেন। মানুষের বর্ণনায় দৈহিক গঠন ও রূপ ফুটিয়া উঠিয়াছে; তৎসঙ্গে তাহার স্বভাব প্রকৃতিও পরিস্টম্ফুট হইয়াছে। সময়ের গঠন নাই, অবয়ব নাই, রূপ নাই। তাহাতে কী? হাসান আজিজুল হক সময়কে ধরিয়াছেন প্রকৃতি ও মানুষে সময়ানুক্রমিক পরিবর্তনের অনিবার্যতা দিয়া। সময়ের এই রূপ 'পার্সেনিফিকেশন' পৃথিবীর সাহিত্যে আর চোখে পড়ে নাই। হাসান আজিজুল হকের দৃষ্টিই কেবল তীক্ষষ্ট তাহা নহে, তাহার পর্যবেক্ষণ নিশ্ছিদ্র, তাহার উপলব্ধি অতলান্তিক ও সম্পূর্ণ।
তাহার বর্ণনায় নাটকীয়তা রহিয়াছে। এই নাটকীয়তা কোনোরূপ আকস্মিকতা হইতে উদ্ভূত নহে। এই নাটকীয়তা তাহার ভাষা হইতে উৎসারিত। এই ভাষা তাহারই হাতে নির্মিত। এই বিষয়ে তাহার কোনো অগ্রজ নাই। ইহা অননুকরণীয় একটি বর্ণনাশৈলী। বাঙ্গালী পাঠক ইতোপূর্বে পাঠ করে নাই : 'নদী সমুদ্রের কাছে আসিয়া আনন্দে গদ গদ হইয়া চিতাইয়া যায়'। বাংলা সাহিত্যে কোনো প্রোটাগনিস্ট এইভাবে বলে নাই : 'চোখ বন্ধ করলে আমি দেখতে পাই নির্জন জ্যোৎস্নারাতের স্তব্ধতার মধ্যে কান্নায় কান্নায় ভেতর থেকে ভরে উঠেছে ধলেশ্বরী মধুমতি- নিস্কলুষ রুপোর পাতের মতো ডিমে-ভরা ইলিশের ঝাঁক সমুদ্র থেকে ছুটে আসছে স্রোতের উজান বেয়ে- ডিম ছাড়তে পারার আগেই জালে আটকে তারা আছড়ে পড়ছে জেলেদের ডিঙি নৌকায়। ঝিকিয়ে উঠছে আবছা তরল অন্ধকারের মধ্যে। তাদের পুচ্ছ তাড়নার শব্দ উঠছে ছপছপ; তাদের কানকো ফেটে গলগল করে কালচে রক্ত বেরিয়ে এসে ধুয়ে দিচ্ছে রুপোলি শরীর।' এইরূপ বর্ণনা তো এই প্রথম : 'কাঠগোলার ভিতরের অন্ধকারে চোখ ফেলিলে প্রথমে কিছুই দেখা যায় না। তাহার পর চোখ একটু সহিয়া আসিলে মনে হয় একটি কালো ঢেঁকি পড়িয়া রহিয়াছে। আবার বাবলা গাছের গুঁড়ি বলিয়াও ভ্রম হয়।' কিংবা 'শীতের সন্ধ্যায় স্ট্রিট-লাইটগুলি কুয়াশার জালে আটকা পড়িয়া যায়।'
অন্যত্র হাসান তাহার বর্ণনাকে ধ্বনিময় করিয়া তোলেন : 'মঞ্চের ওপর বক্তৃতা শুরু হলে নিস্তব্ধতা খানখান হইয়া ভাঙিয়া পড়িতে লাগে, বক্তৃতার টুকরা-টাকরা লইয়া বাতাস গাঁ-গাঁ শব্দে ছোটাছুটি শুরু করিয়া দেয়, ফেব্রুয়ারি মাসের বিকাল বেলার স্নানরোদে সাত তলা বাড়িটা র্থি‌ র্থি‌ করিয়া কাঁপতে কাঁপতে থাকে, আরও কিছুক্ষণ অতিবাহিত হইলে অন্ধকার নামিয়া আসে, পাশের পার্কের ঝোপগুলিতে সন্ধ্যার অন্ধকার গুঁড়ি মারিয়া ঢুকিয়া পড়ে।'
হাসান আজিজুল হক নানা কিসিমের গল্প লিখিয়াছেন। লিখিয়াছেন 'শত্রু'র মতো ধ্রপদি কাঠামোর গল্প যাহার কেন্দ্রে নায়ক কিংবা কেন্দ্রীয় চরিত্র কোনো বিশেষ ঘটনায় নিপতিত; কিংবা কোনো সমস্যার ষড়যন্ত্রে ফাঁসিয়া গিয়াছে এবং কীভাবে ত্রাণ লাভ হইবে ভাবিয়া চিন্তিত। ইহার বিপরীত চিত্রও কম নহে। ওই সব গল্পে না আছে প্রোটাগনিস্টের নির্দিষ্ট কোনো প্রশ্ন, না আছে কোনো কেন্দ্রীয় সমস্যা, না আছে পরিত্রাণ লইয়া কোনো চিন্তা কিংবা পরিকল্পনা। নিয়তির চালে ইতোমধ্যে সবই সংঘটিত হইয়া গিয়াছে আর লেখকের একটিমাত্র দায় হইল দেখিয়া দেখিয়া তাহা বর্ণনা করা। নানা ঘটনা একটি আদি-মধ্য-অন্ত নিপাট কাহিনির আকার লাভ করে নাই। তাহাতে কি! ঘটনা আছে, মানুষ আছে, প্রকৃতি আছে। শব্দে শব্দে এই সবের বর্ণনাই পাঠকের মনে ভাব সৃষ্টি করিবার জন্য যথেষ্ট : ইহাতেই আনন্দ ও বিস্বাদ, ইহাতেই চিন্তার বীজ।
এতমরূপ দাবি করিবার সুযোগ নাই যে, গল্প লিখিবার যে আদর্শ হাসান আজিজুল হক শুরুতে অবলম্বন করিয়াছিলেন শেষাবধি তিনি তাহার প্রতি বিশ্বস্ত থাকিয়াছেন। বস্তুত কখনও কখনও তিনি নিরীক্ষাপ্রবণ হইয়া পড়িয়াছেন। তথাপি তাহার বিচিত্রতা ছাপাইয়া একটি বিশিষ্টতা লঘিষ্ঠ সাধারণ গুণীতকের মতো পরিস্টম্ফুট হইয়া ওঠে। 'শকুন' হইতে শুরু করিয়া 'বিধবাদের কথা' অবধি তাহার গল্পের কাঠামো ও রচনাশৈলী নিজগুণে সুচিহ্নিত। যাহারা তাহার দশখানি গল্প পাঠ করিয়াছেন, একাদশতমের শীর্ষে লেখকের নাম না থাকিলেও যায় আসিবে না। এইরূপ করিয়া আর কেহ গল্প লেখে নাই- এমন করিয়া আর কেহ গল্প বলে না। তাহার তীব্র উপলব্ধি ও তীক্ষষ্ট ভাষায় উদ্দীষ্ট ঘটনা পাঠকের চোখে জীবন্ত হইয়া ওঠে।
মানুষের চেতনায় বিস্মিত হইবার যে আকাঙ্ক্ষা সদা বিরাজমান থাকে তাহার সমানুপাতে আহত বোধ করিবার গুঢ়ৈষাও সক্রিয় রহিয়াছে। ইহা সত্য যে মানুষ আনন্দ লাভ করিতে ভালোবাসে- অন্যদিকে ইহাও বাস্তব যে দুঃখ-কষ্টের ব্যাপারে তাহার নিরাসক্তি নাই। 'আত্মজা ও একটি করবী গাছ'-এর শুরুতে আছে : 'এখন নির্দয় শীতকাল। ঠাণ্ডা নামছে হিম। চাঁদ ফুটে আছে নারকেল গাছের মাথায়। অল্প বাতাসে একটা বড় কলার পাতা একবার বুক দেখায়। একবার পিঠ দেখায়।' - ইহা মানুষেরই জীবনের নিয়তিসূত্র। তাহাকে জীবনের আনন্দ ও করুণ উভয় রসের ধারায় অনিবার্যভাবে সদা ম্লান করিতে হয়। সুখানুভূতির প্রতিপৃষ্ঠে ঘাপটি মারিয়া বসিয়া থাকে যন্ত্রণার দহন। তবে হাসান আজিজুল হক জীবনের অন্ধকার, শীতার্ত, রূঢ় পৃষ্ঠের ব্যাপারেই আগ্রহী। এই বিষয়ে তাহার সুস্পষ্ট পক্ষপাত রহিয়াছে। জীবনের অভিজ্ঞতার যন্ত্রণাবাহী অংশই তাহার নিকট সচরাচর প্রশ্রয় লাভ করিয়াছে। তিনি জীবনের এই ইস্পাতশীতল, ক্রুদ্ধ এবং বিবমিষা উদ্রেককারী স্বরূপের কথা পাঠকের মস্তিস্কে নিস্কম্প হস্তে প্রবিষ্ট করিয়া দেন। পাঠকের পক্ষে কখনও বিস্মৃত হওয়া সম্ভব নয় :
'বিকট চিৎকার চালায় সে, কোথায়? চা দাও শিগগির। মহিলা বেরিয়ে এলেন। নির্বোধ মুখে বিস্ময় সেঁটে আছে, ভোরবেলায় উঠে কোথায় গিয়েছিলে? উত্তরে ব্যক্তিটি অপরাধীর শঙ্কিত চোখে তাঁর দিকে চেয়ে।
চা-মুড়ি এসে গেছে। বারান্দায় বসে মুড়ি চিবুচ্ছে লোকটা। দাড়ি কাটবে কিনা ভাবছে। লম্বা নখগুলো লক্ষ্য করছে। টায়ারের স্যান্ডেলের দিকে চেয়ে আছে। বাড়ির উল্টোদিকে রোদ কাঁপছে, পাতা নড়ছে। ছেলেমেয়েগুলো গগনবিদারী চিৎকার করছে। ছোট ছেলেটা সরু নষ্ট ঠ্যাং ঘষটাতে ঘষটাতে ওদের পেছনে পেছনে যাবার চেষ্টা করছে।
ভিজে মোটা প্যান্ট টেনে নামাতে নামাতে বেখেয়াল মেজো ছেলের পায়ের ধাক্কায় খোঁড়া ছেলেটা গড়িয়ে বারান্দার নিচে পড়ছে দেখছে লোকটা। তার করুণ বিপন্ন মুখ এক ঝলক দেখল সে। উলঙ্গ নিম্নাঙ্গ এবং শীর্ণ পা ওপরের দিকে তুলে ছেলেটা যখন ভবিষ্যতের কাছে আত্মসমর্পণ করছে, লোকটি মুখ ফস্কে চেঁচিয়ে ওঠে, পড়ে গেছি, পড়ে গেচি। স্ত্রী দৌড়ে আসছেন এখন- শাড়ির মানুষটা চা-মুড়ি রেখে ঠোঁট চাটতে চাটতে, আমি নই, বাদশা, বাদশা পড়ে গেছে, চেঙ্গিস তাকে ফেলে দিয়েছে। বন্দুকের গুলিতে নিহত পাখির মতো পড়ে থাকা বাদশাকে তুলতে রক্ত দেখা গেল। অনেক রক্ত এবং জামায় দুর্গন্ধ।'
৩.
বিংশ শতাব্দী এমন একটি সময় যখন কেবল লেখক ও তাহাদের বর্ণনাভঙ্গি পরিবর্তিত হয় নাই, নানা অভাবনীয় তত্ত্বের প্রভাবে পাঠকের পঠন-প্রক্রিয়াও যথেষ্ট পরিমাণে পরিবর্তিত হইয়াছে। বলিলে অত্যুক্তি হইবে না আধুনিক মানুষের পঠন প্রক্রিয়া বৈজ্ঞানিকের কর্মপদ্ধতির মতো জটিল হইয়া উঠিয়াছে। পাঠকের সন্তুষ্ট হইবার ও তৃপ্ত হইবার অসংখ্য সুড়ঙ্গপথ জন্মগ্রহণ করিয়াছে। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে কাফকা শত-সহস্র মানুষের প্রিয় লেখক। এই রকম পরিবর্তনের কারণেই আধুনিক পাঠক হাসান আজিজুল হকের উপমাঘন ও প্রতীকতাসমৃদ্ধ বর্ণনাভঙ্গিকে আস্বাদন করিতে সক্ষম। যে মানুষ লইয়া হাসান আজিজুল হকের কারবার তাহাদের জীবনে সরসতা নাই, উল্লাস নাই, কোনো রূপালী সীমান্ত নাই। অথচ আধুনিক পাঠক এই সব নিরানন্দ ও নিঃসহায় মানুষের বেদনা ও আর্তনাদের গল্পগুলোতে মনোযোগী হইতে পিছুপা নহে। হাসান আজিজুল হক সারাজীবনে এক শতরও কম সংখ্যক ছোটগল্প লিখিয়াছেন। একাদিক্রমে পড়িতে গেলে মনে হয় বারংবার একটি কেন্দ্রবিন্দুতেই তিনি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে চাহিয়াছেন; আর তাহা হইল পৃথিবীর হতভাগ্য ও লাঞ্ছিতদের কথা। তাহার যেন একটাই দাবি; আর উহা হইল পাঠক যেন সমাজের নিয়তি লাঞ্ছিত মানুষের ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের অনুচ্চ ক্রন্দনের শব্দ শুনিতে আগ্রহী হয়।