ঢাকা শনিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২৩

একদা সোভিয়েত ইউনিয়নে

একদা সোভিয়েত ইউনিয়নে

.

হাসনাত আবদুল হাই

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৩ | ২২:৩৪

পর্ব ৯

আমার প্রত্যাশা সমাজতন্ত্রের মূল কথা এবং আদর্শ ও লক্ষ্য বলে যা মনে করি, সবার মৌলিক চাহিদা মেটায় এবং বিনোদন ও সৃজনশীল কাজের জন্য অবসর নিশ্চিত করে, এমন আর্থসামাজিক ব্যবস্থা। এই সমাজ যদি শ্রেণিহীন না হয় এবং এখানে মেধার ভিত্তিতে একটা এলিট শ্রেণি গড়ে উঠে থাকে, তাতে আমার আপত্তি নেই। শ্রেণিহীন সমাজ, প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্র, এসব আদর্শ বা লক্ষ্য সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য অপরিহার্য বলে মনে করি না। মার্ক্সের সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় তার দ্বিতীয় স্তর কমিউনিজমে, যা লেনিন আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, উত্তরণের জন্য হয়তো এর ভূমিকা আছে কিন্তু তার আগেই যদি সমাজতন্ত্রের মূল আদর্শ ও লক্ষ্য, আয়ের ন্যায়সম্মত বণ্টন এবং জীবন যাপনের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয়, তাহলে আপৎকালীন পর্ব অতিক্রম করে পরবর্তী স্তরে (কমিউনিজমে) পৌঁছানোর অনিশ্চিত এবং কঠিন প্রয়াসে সময় ও কর্মশক্তি ব্যয় তত্ত্বের জন্যই তত্ত্বের সন্ধানের বেশি কিছু মনে হয় না। প্রশ্ন হলো, সমাজতন্ত্রের দ্বিতীয় এবং অন্তিম স্তর, কমিউনিজম (শ্রেণিহীন সমাজ ও সর্বহারাদের একনায়কতন্ত্র), অর্জিত না হলে প্রথম স্তরের অর্জন (যাকে মূল লক্ষ্য বলছি) তা রক্ষা করা যাবে কি? সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের প্রথম স্তর চলেছে ১৯১৭-এর নভেম্বর (অক্টোবর?) থেকে এই ১৯৭৮ সালের আগস্ট, প্রায় ষাট বছর। এই ষাট বছরে সোভিয়েত রাশিয়ার অভিজ্ঞতা ও অর্জন থেকে উপসংহারে আসা যাবে, আসা উচিত এবং সম্ভব, ওপরে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে কিনা, সেই সম্পর্কে। আমার এই ৯ দিনের সফরে আমি সেটাই জানতে চাইব, যা দেখব এবং শুনব তার ভিত্তিতে। অনুসন্ধানের বিষয়ের তুলনায় আমার দেখাটা পাখির চোখে দেখার বেশি কিছু বলে দাবি করা যাবে না, সে কথা সবিনয়ে নিবেদন করে রাখি।
প্লেন রানওয়ে দিয়ে যাবার সময় চোখে পড়ল কনস্ট্রাকশন চলছে, প্রায় বিমানবন্দরে এখন যা কমন দৃশ্য। যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে জোড়াতালি দিয়ে বিদ্যমান ভৌত অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে কোথাও অবশ্য সংগতি আর উপযুক্ত স্থান পাওয়া গেলে নির্মিত হচ্ছে ঝকঝকে নতুন বিমানবন্দর। শেরেমিয়েটোভের সুবিধাদি এখনও তেমন সেকেলে আর অনুপযোগী হয়ে যায়নি বলেই মনে হয়। বিশেষ করে এজন্য যে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরকার যাত্রীদের সামাল দেওয়ার জন্য মস্কোর উপকণ্ঠে রয়েছে আরও দুটি এয়ারপোর্ট, ভানুকোভো এবং দোমোদেদেভো।
টার্মিনাল বিল্ডিংয়ের ভেতর প্রবেশের পর একপাশে দেখা গেল ইমিগ্রেশন কাউন্টার। আমরা সেদিকে এগিয়ে যাবার সময় দেখলাম যাদু মিয়া বিপন্নের মতো ট্রানজিটে যাওয়ার দিক খুঁজছে আর আমাদের দিকে বিপন্নের মতো তাকাচ্ছে। তাকে হাতের ইশারা দিয়ে সেখানে যাবার পথ দেখিয়ে দিলাম। সেদিকে অন্য ট্রানজিট যাত্রীরাও যাচ্ছে, যাদের মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু বাংলাদেশি এবং ভারতীয়। অবাক হলাম দেখে যে তাদের সাহায্য করার জন্য এরোফ্লোটের কেউ নেই অথচ তাদের পরবর্তী যাত্রা এরোফ্লোট দিয়েই।
ইমিগ্রেশন একসঙ্গে জোড়া দেওয়া আমার দুটো পাসপোর্ট কেন– জানতে চাইল গম্ভীর মুখে। আমি যত বলি প্রথমটা এক্সপায়ার করে গেছে কিন্তু সেখানে সব তথ্য লেখা আছে, সেই ব্যাখ্যায় কর্ণপাত না করে সে একই প্রশ্ন করে যাচ্ছে। হাতে ‘সেন্ট্রোসিউজ’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে যে তিরিশোর্ধ্ব ব্যক্তি অদূরে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে অন্য হাত তুলে নাড়ছিল। সে এগিয়ে এসে ইমিগ্রেশনের জেরা শুনে আইডি বের করে গম্ভীর স্বরে বলল, সেন্ট্রোসিউজ। স্টেট ডেলিগেশন।সঙ্গে সঙ্গে ইমিগ্রেশনের চেহারা বদলে গেল। সে দ্বিরুক্তি না করে পাসপোর্টে সিল মেরে দিয়ে দিল আমাকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হোসেন সাহেবকে স্বর নামিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি অভিজ্ঞের মতো বললেন, সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ। সমবায় মন্ত্রণালয়। গ্রামে সব দোকানপাটের মালিক এরা। গ্রামের মানুষের জন্য সবকিছু বিক্রয় আর বিতরণের দায়িত্ব এই বিভাগের। সব নাগরিকের কাছে এদের গুরুত্ব অপরিসীম। ইমিগ্রেশন তাই সমীহ করে তাড়াতাড়ি আমাদের যেতে দিল। নচেৎ দেখতেন এই সামান্য ব্যাপারটার সুরাহা করতে সারাদিন কেটে যেত। কপাল খারাপ হলে আপনাকে তাদের ঘরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করত অনির্দিষ্টকাল। বলেছি না, এরা প্যারানয়ায় ভোগে। একটু খুঁত বা অস্বাভাবিক কিছু দেখলেই জেরা শুরু করে দেয়। মনে হয় জেরা করাটা এদের মজ্জাগত, বিশেষ করে বিদেশিদের। তারা সবাই তাদের কাছে গিলটি আনলেস প্রুভড আদার ওয়াইজ। আবারও বলি, এর জন্য বাইরের দুশমন যারা অনুক্ষণ ষড়যন্ত্র করে চলেছে তার ক্ষতি এবং পতনের জন্য তাদের দোষই বেশি। অনেকক্ষণ কথা বলে যান হোসেন যন্ত্রের মতো।
ততক্ষণে সেন্ট্রোসিউজের যে লোকটি প্ল্যাকার্ড হাতে ইমিগ্রেশনের সঙ্গে কথা বলছিল সে প্ল্যাকার্ড নামিয়ে আমাদের কাছে এসে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে ব্যারিটোন স্বরে বলল, মাই নেম ইজ ইউরি। আই এম ফ্রম সেন্ট্রোসিউজ। ইওর হোস্ট অর্গানাইজেশন। তারপর হেসে বলল, ওয়েলকাম টু মস্কো। এখন যাওয়া যাক কাস্টমস ক্লিয়ার করে এখান থেকে বের হওয়ার জন্য।
আমরা যেতে যেতে দেখলাম দুজন স্টাফ যাদু মিয়াকে মাঝখানে রেখে এদিকে আসছে। তারা কড়া দৃষ্টিতে তাকে দেখছে আর নিজেদের মধ্যে কী যেন বলছে। হোসেন সাহেব বললেন, মিয়া এদের নজর এড়াতে পারেনি। এত বললাম, তবু লেবাসটা একটু বদলায়নি।
আমি বললাম, বেচারার জন্য কিছু করতে হয়। ইউরিকে বলে দেখা যায়।
হোসেন সাহেব ইউরিকে বলল, ওই বাঙালি প্যাসেঞ্জার ট্রানজিটে এরোফ্লোটে লন্ডনে যাচ্ছে। ইংরেজি ভালো বলতে পারে না। মনে হচ্ছে ঝামেলায় পড়েছে। কিছু করা যায়?
ইউরি বলল, ইউ নো হিম?
আমরা দুজন একসঙ্গে বললাম, হ্যাঁ। আমরা এক ফ্লাইটেই এসেছি ঢাকা থেকে। আলাপ হয়েছে। নিরীহ মানুষ, শ্রমিকের কাজ করতে যাচ্ছে ইংল্যান্ডে।
শুনে ইউরি যাদু মিয়াকে যারা প্রায় চ্যাংদোলা করে নিয়ে আসছিল তাদের কাছে গিয়ে কিছু বলল। কথার ফাঁকে আমাদের দিকে হাত তুলে দেখাল কয়েকবার। একটু পর যাদু মিয়া ইমিগ্রেশনের সাঁড়াশি খপ্পর থেকে মুক্তি পেয়ে বিগলিত হয়ে আমাদের দিকে হাত তুলে তার কৃতজ্ঞতা জানাল। আমরা তার দিকে হাত তুলে বিদায় জানিয়ে কাস্টমসের দিকে এগিয়ে গেলাম। সেখানে ইউরি চিচিংফাঁকের মতো ‘সেন্ট্রোসিউজ’ বলতেই কাস্টমস বন্ধ সুটকেসে সাদা চকের দাগ লাগিয়ে ছাড়পত্র দিয়ে দিল। তাদের অবশ্য জিজ্ঞাস্য, সঙ্গে কত হার্ড কারেন্সি আছে, সেই প্রশ্ন করল না।
বাইরে আমাদের জন্য কালো মস্ত বড় গাড়ি অপেক্ষা করছিল। সাদা ইউনিফর্ম পরিহিত ড্রাইভার এসে আমাদের লাগেজ গাড়ির বুটে রেখে সিটে গিয়ে বসল। ইউরি বসল তার পাশে। আমরা তিনজন বসলাম পেছনে। একটু পর গাড়ি যেতে শুরু করলে হোসেন সাহেব নিচু স্বরে বললেন, রাশিয়ান চাইকা গাড়ি। এদের মার্সিডিজ বেঞ্জ। এখানকার ভিআইপিরা চড়ে।
ইউরি বেশ অমায়িক আর সপ্রতিভ। পেছন ফিরে বলল, তোমাদের যাত্রা কমফোর্টেবল ছিল আশা করি।
হোসেন সাহেব বললেন, বেশ আরামে এসেছি। এরোফ্লোটের আতিথেয়তা চমৎকার।
ইউরি বলল, আজকাল সকালে প্রায়ই কুয়াশা থাকে, যার জন্য ফ্লাইট নামতে দেরি হয়। মাঝে মাঝে তো অন্য এয়ারপোর্টে ডাইভার্ট করে দেয় প্লেন। ভাগ্যি ভালো আজ দেয়নি। তাহলে সেখানে গিয়ে তোমাদের রিসিভ করতে বেশ দেরি হতো। তোমাদের অপেক্ষা করতে হতো। হয়তো কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়তে কাউকে না দেখে। ভাগ্যি ভালো, কয়েক চক্কর দিয়ে শেরেমিয়েটোভোতেই প্লেন নেমেছে। তারপর বলল, আমরা যাচ্ছি হোটেল ইউক্রেইনায়। মস্কোভা রিভারের তীরে, কুটুকুভোস্কি প্রসপেক্টে। ওয়ান অব দ্য সেভেন সিস্টার্স।
আমি বললাম, সেভেন সিস্টার্স, তার মানে?
[ক্রমশ]

আরও পড়ুন