সাক্ষাৎকারে করোনাজয়ী ডা. আলীম

উপসর্গ দেখা দেওয়া মাত্রই ব্যবস্থা নিতে হবে

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০   

সোহেল রানা

এসএম আবদুল আলীম

এসএম আবদুল আলীম

রাজধানীর রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত চিকিৎসক এসএম আবদুল আলীম সম্প্রতি সুস্থ হয়ে নতুন উদ্যোমে কাজে ফিরেছেন। কখন, কীভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন, কোন বিষয়গুলো মেনে চলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠলেন, করোনার বিরুদ্ধে লড়াইটা কতটা কঠিন ছিল- এসব নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সমকাল-এর সঙ্গে। গত মঙ্গলবার রাতে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি উপসর্গ দেখা দেওয়া মাত্রই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

পুলিশ হাসপাতালের এনেসথেসিয়া, এনালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার বিভাগের প্রধান ডা. আলীম হাসপাতালটির করোনা প্রতিরোধ কমিটির অন্যতম প্রধান সদস্য। তিনি এই হাসপাতালের কোভিড-১৯ আক্রান্ত প্রথম চিকিৎসক ও প্রথম রোগী ছিলেন।

যত দ্রুত সম্ভব উপসর্গ দমন

চিকিৎসক আলীম বলেন, উপসর্গ দেখা দিলে অনেকেই অবহেলা করে সময় পার করেন, যেটি মোটেই ঠিক না। কারণ এ রকম বিরতিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। আর পরিস্থিতি বেশি জটিল হলে সেই রোগীকে বাঁচানো কঠিন। তাই করোনার কোনো উপসর্গ দেখা দিলেই পদক্ষেপ নিতে হবে। ঘরোয়া চিকিৎসা পদ্ধতির পাশাপাশি লক্ষণ বুঝে প্রচলিত ওষুধ সেবন করতে হবে। এতে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব।

সবার আগে ফুসফুসের পরীক্ষা

করোনার অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে শ্বাসকষ্টটা সবচেয়ে মারাত্মক বলে জানান চিকিৎসক আলীম। তিনি বলেন, শ্বাসকষ্ট হলে অতি জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। করোনার কোনো উপসর্গ দেখা দিলে কিংবা শনাক্ত হলে শুরুতেই ফুসফুসের এক্স-রে করা প্রয়োজন। কারণ ভাইরাসটি প্রথমেই ফুসফুসে আক্রমণ করে। ফুসফুস আক্রান্ত হওয়ার কারণেই শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ দ্রুতই মাত্রাতিরিক্ত কমতে থাকে। অক্সিজেন কমে যাওয়ায় হৃদযন্ত্রসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অকেজো হয়ে যায়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই ফুসফুস কতটা আক্রান্ত সেটা জেনে চিকিৎসা দিতে পারলে রোগীকে দ্রুত সুস্থ করা সম্ভব। 

তিনি আরও বলেন, আমরা প্রায়ই দেখি, কয়েকদিন জ্বর, সর্দি, গলাব্যথা, কাশি কিংবা শ্বাসকষ্টে ভোগার পর অনেকে মারা যাচ্ছেন। এসব উপসর্গের কারণে মানুষ শুরুতে শারীরিকভাবে খুব একটা কষ্ট পায় না। তাই গুরুত্বও দেয় না। এভাবে মূলত ফুসফুসটাই মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ পায়। 

কোডিভ-১৯ জয়ে তিন মন্ত্র 

করোনা সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে কোন পদক্ষেপগুলোতে গুরুত্ব বেশি দেওয়া দরকার, এমন প্রশ্নে ডা. আলীম বলেন, অ্যান্টিবডি টেস্ট করতে হবে গণহারে। উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত পরীক্ষা ও দমন করতে হবে। এছাড়া সামাজিক দূরত্বসহ স্বাস্থ্যবিধিগুলো কঠোরভাবে মানতে হবে। আর আক্রান্ত হলে মানসিক শক্তি হারানো যাবে না।

সচেতনতার অভাবে সর্বনাশ

ডা. আলীম জানান, তার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল ২৩ মার্চ। কয়েকদিন ধরেই ঠাণ্ডা, কাশি, জ্বর, গলা ও শরীর ব্যথায় ভুগছিলেন তিনি। এ অবস্থায় ছুটি নিয়ে বাসায় ছিলেন। দিন যত গড়াচ্ছিল লক্ষণগুলো ততই তীব্র হচ্ছিল। ৪ এপ্রিল নমুনা পরীক্ষার পর দুঃসংবাদটি জানা যায়। দু’দিন পর আবারও পরীক্ষা করা হয়। সেই পরীক্ষায়ও করোনা পজিটিভ আসে।

করোনাজয়ী এই চিকিৎসক বলেন, পুলিশ হাসপাতালে ৬০-৭০ শতাংশ রোগীর কোনো লক্ষণ ছিল না। সচেতনতাও খুব একটা ছিল না। আমরা চিকিৎসকরা যথাযথ সুরক্ষা ছাড়াই উপসর্গ থাকা রোগীর কাছে গেছি। অনেকে আবার লক্ষণ লুকিয়েছেন। দায়িত্ব পালনকালেই কারোর মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছি বলে মনে হয়। 

দরকার প্রচলিত ওষুধ আর ঘরোয়া চিকিৎসাসেবা

পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হতে পারেন, এমন আশঙ্কায় আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রথমে গোপন রেখেছিলেন চিকিৎসক আলীম। তিনি বলেন, করোনার কিছু উপসর্গ থাকার কথা জানিয়ে সবাই নিজ নিজ কক্ষে সেল্ফ আইসোলেশনে থেকেছি। সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা আইসোলেশনে ছিলাম। এই সময় নিয়মিত আদা, লবঙ্গ, লেবু দিয়ে চা পান করেছি। কালোজিরা, মধু, রসুন খেয়েছি। গরম ভাপ নিয়েছি। বারবার হাত ধুয়েছি। কুসুম গরম পানিতে প্রতিদিন পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাবান দিয়ে ফেনা তুলে ৫-১০ মিনিট গোসল করেছি। প্রতিবার গোসলের পর অনেক ফ্রেশ মনে হয়েছে। ঘরোয়া চিকিৎসা পদ্ধতিতে অনেক উপকার পেয়েছি। লক্ষণ বিশেষে কিছু ওষুধও খেয়েছি। প্রতিদিন বাসা জীবাণুনাশক দিয়ে স্প্রে করেছি।

পরিবারের কার্যকরী ভূমিকা

চিকিৎসক আলীমের করোনা জয় নিয়ে তার স্ত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক দিল আফরোজা খাতুন ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, করণীয় আর বর্জনীয় বিষয়গুলো সাজিয়ে নিয়েছিলাম। আর তাতেই সফলতা এসেছে। তবে বর্তমান এই পরিস্থিতিতে সুস্থ থাকাটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ বলে তিনি মনে করেন। দিল আফরোজা লেখেন, বলে বোঝানো যাবেনা কী বিভীষিকাময় এক সময় পার করছি! জানিনা কীভাবে মনোবল শক্ত রেখে সবাইকে সুস্থ রাখার যুদ্ধটা চালিয়ে যাবো! জানি না এই ধোয়াধায়ি আর আইসোলোটেড জীবন কতদিন চলবে! 

অনুপ্রেরণা আর সাহস পাচ্ছেন এখন অন্যরাও

সুস্থ হওয়ার পর ১০ মে পুনরায় কাজে যোগ দেন ডা. আলীম। তিনি সাহসের সঙ্গে যেই রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিও রয়েছেন। চিকিৎসক আলীম বলেন, চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের অনেককে হতাশ, আতঙ্কগ্রস্ত দেখি। কিন্তু আতঙ্ক-ভয়-দুশ্চিন্তা নয়, মনে সাহস রাখতে হবে। তাদের বলি, আমিও আক্রান্ত হয়েছিলাম, এখন সুস্থ। আপনারাও সুস্থ হবেন। এতে তারা সাহস ও অনুপ্রেরণা পান।

তবে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কথা জানালেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, এখন সময়টা খুবই গরমের। ফলে এই পিপিই কিংবা অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী দীর্ঘসময় পরে চিকিৎসা দেওয়া খুবই কঠিন কাজ। তবে করোনা থেকে রক্ষা পেতে হলে সবাইকে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কাজ করতে হবে।