পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হ্যাটট্রিক জয়কে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বিশ্নেষকরা। বিশেষ করে এবারের রাজ্যসভা নির্বাচনকে ঘিরে বিজেপি যেভাবে সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, তার বিপরীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জোর দিয়েছিলেন 'বাঙালিত্ব' আর অসাম্প্রদায়িকতার ওপর। মমতার এ জয় তাই এ অঞ্চলজুড়ে সাম্প্রদায়িক উস্কানির বিস্তৃতি রোধ করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা আশঙ্কা করছেন, গেরুয়া শিবির এ রাজ্যে শক্ত আসন গড়ায় সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারের আশঙ্কা থেকেই গেল।

এদিকে তিস্তা চুক্তি নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার রয়েছে বিপরীত অবস্থান। ফলে মমতার জয়ে  বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত চুক্তির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্নেষকরা।

কূটনৈতিক, আঞ্চলিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্নেষকরা সমকালকে আরও বলছেন, এবারের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস জিতলেও আগামী নির্বাচনে বিজেপির জয়ের বড় সম্ভাবনা থেকে গেল। কারণ নির্বাচনের ফলে বিজেপি জিততে না পারলেও শক্ত বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকছে। আর বিজেপির সেখানে সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদী আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেখানে হিন্দুত্ববাদকে মোকাবিলা করার মতো কোনো আদর্শিক অবস্থান নেই তৃণমূলের। বরং সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে দাঁড়ানোর কথা ছিল বামফ্রন্টের। কিন্তু তৃণমূল এর আগের দফায় ক্ষমতায় এসে বামদের ওপর চরম নির্যাতন চালায়। তার ফলে বামরা বরং অনেক ক্ষেত্রে তৃণমূলের মারের হাত থেকে বাঁচতে বিজেপির কাছেই আশ্রয় নিয়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পশ্চিমবঙ্গে আগামী নির্বাচনে বিজেপির হিন্দুত্ববাদের বিজয়ের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

মূলত, এবারের নির্বাচনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে বিজয়কে মরণপণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। এ কারণে নরেন্দ্র মোদি রাজ্যসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে ১৯ বার সফরে এসেছেন এবং নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন। এটা ভারতের নির্বাচনের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। বিজেপির সাবেক সভাপতি ও ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নির্বাচনের প্রায় পুরো সময় ধরেই পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করেন। নির্বাচনী প্রচারে তার উগ্র সাম্প্রদায়িক বক্তব্যও লক্ষণীয়। নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য একসময় বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মিঠুন চক্রবর্তীর মতো ভারতের খ্যাতিমান তারকাকেও দলে ভেড়ায় বিজেপি।

মমতার এক দশক আগের 'ডান হাত' শুভেন্দু অধিকারীকে দলে ভিড়িয়ে তার সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে নামিয়ে দেয়। এর বিপরীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার দীর্ঘ অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা স্মরণ দিয়ে আবহমান 'বাঙালিত্ব'কে পুঁজি করে বিজেপির হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন। নির্বাচনের ফলাফলে তৃণমূলের বিপুল বিজয় অবশেষে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে বাঙালিত্বের জয়কেই নিশ্চিত করল।

কিন্তু নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস জিতলেও বিজেপি এবার ৭০টির বেশি আসন নিয়ে বিরোধী দলে থাকছে। গতবারের নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যা ছিল মাত্র তিনটি। আর এবারে সেই আসন সংখ্যা ৭০ ছাড়িয়ে গেল। এর মাধ্যমে আগামীতে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনাই জাগিয়ে তুলেছে বিজেপি। এর আগে মমতা দু'বার জয় পেলেও সুশাসন নিশ্চিত করতে খুব বেশি সফল হননি; বরং তার শাসনামলে তার নিকটজনদের দুর্নীতি ও নানা অভিযোগ উঠেছে। এখন রাজ্যসভায় বিরোধী দলে শক্ত অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার ফলে বিজেপি আরও কঠোর ভাষায় তৃণমূলের শাসনের ব্যর্থতা ও ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে। রাজনীতির মাঠে সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদকে ছড়িয়ে দিয়ে বিজেপির বড় জনসমর্থন তৈরির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনে বামরা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ফলে বিজেপির বিরুদ্ধে শক্ত আদর্শিক শক্তি নিয়ে দাঁড়ানোর মতো রাজনৈতিক শক্তিও থাকছে না। তৃণমূল প্রথমবার নির্বাচনে বিজয়ের পর বামদের ওপর যেভাবে চড়াও হয়েছে, তার ফলে এই দুই শক্তির মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনাও খুবই কম। ফলে আগামী নির্বাচনে আবহমান বাঙালিত্বের বিপরীতে বিজেপির সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদের জয় দেখা গেলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

নির্বাচনের এই ফলাফল নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান সমকালকে বলেন, প্রথমত বলব, এটা একটা বড় বিজয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য। এবারের নির্বাচনে মমতার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার ছিল। এত কিছুর পরও তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়, অবশ্যই একটি বড় এবং অসাধারণ বিজয়।

তিনি বলেন, এত প্রচারের পর মোদির দল হারল কেন, তার কারণ ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, বিজেপি নির্বাচনের আগে তৃণমূল থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নেতাকে তাদের দলে ভিড়িয়ে তাদের প্রার্থী করে একটা ভুল করেছে। কারণ যারা দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি করেছে, দলকে রাজনৈতিকভাবে ধারণ করেছে তারা এই হঠাৎ করে সাবেক তৃণমূল নেতাদের ভোটে মনোনয়ন দেওয়াটাকে ভালোভাবে নেননি। এরপর বিজেপি যেভাবে হিন্দু ভোটের একটা বড় অংশ আশা করেছিল, সেটাও পায়নি। বরং ৫০ শতাংশের বেশি হিন্দু ভোট তৃণমূলই পেয়েছে। বিশেষ করে প্রায় দেড় কোটি মতুয়া সম্প্রদায়ের যে ভোট বিজেপি আশা করেছিল, সেই ভোট তারা পায়নি। মতুয়াদের ভোট আদায়ের জন্য বিজেপির যে প্যাকেজ কৌশল ছিল সেটা ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, তৃণমূল ভেবেছিল মুসলিমদের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভোট পাবে। সেখানে তারা আসলে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। এ কারণে তৃণমূল এত বড় জয় পেয়েছে আর বিজেপি হেরেছে। এ ছাড়া বিজেপি এবারের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী ছিল। এটাও তাদের পরাজয়ের একটা বড় কারণ।

তিনি আরও বলেন, তার বিবেচনায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যসভার নির্বাচন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাবিত করবে না। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনেক বড় বিষয়। বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি হবে কিনা সেটা এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। এটা একটা চলমান কূটনৈতি প্রক্রিয়া। এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আছে সেটা চলবে, এটাই স্বাভাবিক।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্নেষক হুমায়ুন কবীর আরও বলেন, আসলে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এবার দুটি স্লোগান প্রধান হয়ে উঠেছিল। একটা হচ্ছে বিজেপির 'হিন্দুত্ববাদ' আর এর বিপরীতে তৃণমূল কংগ্রেসের 'বাঙালিত্ব'। মোটা দাগে তৃণমূলের বিপুল বিজয়ে বাঙালিত্বের জয় হয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, 'বাঙালিত্ব' তৃণমূলের একটা স্লোগান, আদর্শিক অবস্থান নয়। বিজেপির বিরুদ্ধে শক্ত আদর্শিক অবস্থান নিয়ে দাঁড়াতে পারত বামরা। কিন্তু বামদের সঙ্গে তৃণমূলের দ্বন্দ্ব এবং দূরত্ব এত বেশি যে, বামরা গত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বরং বিজেপিকেই সমর্থন দিয়েছে, এমনটাই দেখা গেছে। ফলে আগামী নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদকে সামনে রেখে বিজেপি বড় বিজয় পেলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, বিজেপি নির্বাচনী প্রচারে যেভাবে হিন্দুত্ববাদকে সামনে এনেছিল, সেটাই ছিল আশঙ্কার। কারণ পশ্চিমবঙ্গে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িতার বিকাশ ঘটলে তার একটা প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো উস্কানি ছড়ানোর সুযোগ পেতে পারে। বিশেষ করে অমিত শাহ নির্বাচনী প্রচারে যেভাবে ভুল তথ্য দিয়ে বাংলাদেশকে দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে ভারতে বাংলাদেশিদের অনুপ্রেবেশের বিষয়টি সামনে এনেছিলেন, সেটাই ছিল সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। তৃণমূলের বিজয়ের পর সেই আশঙ্কা আপাতত দূর হলো, এটা বলা যায়। এটাই আমাদের জন্য স্বস্তির, এ অঞ্চলে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির যে দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে, তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকল।

তিনি আরও বলেন, তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা ভূমিকা আছে বলে বলা হয়। তবে এ ইস্যুটি শুধু কেন্দ্রীয় কিংবা শুধু রাজ্য সরকারের ওপর নির্ভর করে না। দু'দিকেরই সমর্থনের প্রয়োজন। তাই তিস্তা চুক্তির ইস্যুকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভার নির্বাচনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কিছু নেই।

আরেক কূটনৈতিক বিশ্নেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এবারের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি যেভাবে মমতাকে 'দিদি, ও দিদি' বলে রসিকতা করেছেন, সেটা পশ্চিমবঙ্গের নারীরাও ভালোভাবে নেননি। ফলে নারীদের বড় সমর্থন মমতাই পেয়েছেন। অন্যদিকে, ওড়াকান্দির মন্দিরে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি মতুয়াদের ভোট আদায়ের যে চেষ্টা করেছিলেন, তাও ব্যর্থ হয়েছে। মতুয়ারা আদর্শিকভাবে যে বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক নীতিতে বিশ্বাস করেন, সেখান থেকে বিজেপি তাদের সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদের দিকে টানতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে এ নির্বাচনে পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত কয়েকটি এলাকা যেমন আলীপুর দুয়ার, জলপাইগুড়িতে বিজেপি ভালো করেছে।

তিনি বলেন, এটা সব সময়ই দেখা যায়, সংকীর্ণ মতাদর্শের রাজনৈতিক নেতারা কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নানা আশা দিয়ে দলে টানেন। যেমন যুক্তরাষ্ট্রেও ডোনাল্ড ট্রাম্প পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ভোট প্রথম দফায় টানতে পেড়েছিলেন। কিন্তু পরে সে সমর্থন ধরে রাখতে পারেননি। সেই অভিজ্ঞতায় বলা যায়, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ওপর বিজেপির প্রভাব দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে নাও পারে। তবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অবস্থান নির্ভর করবে আগামী দিনে তৃণমূলের নীতি, আচরণ ও পদক্ষেপের ওপরও।

মন্তব্য করুন