চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে বসবাসরত সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিমদের ওপর শি জিনপিং সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের ফলে মানবাধিকার পরিস্থিতির সবচেয়ে অবনতি হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

জোরপূর্বক শ্রমের উপর উদ্বেগ প্রকাশ করে বুধবার যুক্তরাষ্ট্র জিনজিয়াং থেকে সমস্ত তুলার পণ্য এবং টমেটো আমদানি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে  এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। খবর রেডিও ফ্রি এশিয়ার

চীনের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সবচেয়ে বড় প্রদেশ জিনজিয়াং। কাগজে কলমে এটি স্বায়ত্তশাসিত হলেও, চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।  

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৭ সালের প্রথম থেকেই জিনজিয়াংয়ে প্রায় ১৮ লাখ উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনকে ক্যাম্পে আটক রেখে চীন সরকার নির্যাতন চালাচ্ছে। সম্প্রতি দেশটি হংকংয়ের ওপরে তাদের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এছাড়া চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে চীন কোনো তথ্য বিশ্বকে দেয়নি। ফলে পরবর্তীতে এটি মহামারিতে রূপ নেয়। চীনের এ সমস্ত আচরণের কারণে বেইজিংয়ের অধিকার রেকর্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহল একত্রিত হয়েছে। 

বিভিন্ন সময় জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, ‘শিক্ষা শিবির’ নামক ক্যাম্পে উইঘুরদের আটকে রেখে তাদের চীনা ম্যান্ডারিন ভাষা শেখানো হচ্ছে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রশংসার কথা বলা এবং তাদের সঠিক আচরণ পরিচালনার নিয়মগুলো কঠোরভাবে মনে রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদের নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা করতে অথবা সেই ধর্ম পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ অভ্যাসগুলোর অংশ হিসেবে চীন সরকার সাংঘর্ষিকভাবে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর সংস্কৃতি ও জাতিগত সত্তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উইঘুর এবং অন্যান্য মুসলমানদের ‘পরিচয় মুছে ফেলার’ জন্য চীন সরকারের প্রচেষ্টা ২০২০ সালেও অব্যাহত রয়েছে। জিনজিয়াংয়ে উইঘুরদের ১০০-এর বেশি কবরস্থান ধ্বংস করা হয়েছে। তাদের সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার জন্য যা যা করা দরকার সব চেষ্টাই করে যাচ্ছে চীন সরকার। 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের পর থেকে জিনজিাংয়ে ২৬০টিরও বেশি বন্দিশালা নির্মাণ করা হয়েছে। 

তবে বেইজিং জানায়, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ এবং ‘সন্ত্রাসবাদের’ বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সংখ্যালঘুদের এসব ক্যাম্পে রেখে ‘বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ’ দেওয়া হচ্ছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মহলের চাপের মুখে বেইজিং এখন এই বন্দিশালাগুলোকে ‘বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ’ কেন্দ্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। এসব বন্দিশালা থেকে অনেককে এখন কারখানায় কাজের জন্য পাঠানো হচ্ছে। যদিও অভিযোগ রয়েছে, তারা শ্রমিকদের দিয়ে জোর করে পরিশ্রম করাচ্ছে। 

চীনে নিযুক্ত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরিচালক সোফি রিচার্ডসন বলেছেন, চীন সরকার বুঝতে পেরেছে যে, বেইজিংয়ের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বৈশ্বিক পরিণতি রয়েছে। 

তিনি বলেন, বিশ্ব নেতাদের জিনজিয়াংয়ে স্বাধীন তদন্তের পক্ষে সমর্থন করা উচিত। চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের উপর নজরদারি করার জন্য জাতিসংঘের একটি নতুন আদেশ দেওয়া দিতে হবে। সেইসঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য চীন সরকারের দায়মুক্তির অবসান হওয়া উচিত। 

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ান একটি থিংক ট্যাঙ্ক ৮২টি বিশ্বব্যাপী পণ্যের ব্র্যান্ডের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এসব কোম্পানিতে চীন থেকে পণ্য আমদানি করা হতো এবং জোর করে শ্রমিকদের দিয়ে এসব পণ্য বানানো হতো। 

হোমল্যান্ড সিকিউরিটির উপ-সচিব কেনেথ কুকিনেল্লি বলেছেন, জোরপূর্বক শ্রম আধুনিক দাসত্বের একটি রূপ। 

তিনি বলেন, ‘মেড ইন চায়না’ লেখা কেবল উৎসের দেশ নির্দেশ করে না, এটি আমাদের সতর্কও করে। 

মন্তব্য করুন