রাশেদ খান মেনন। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি মনে করেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে দেশের অনেক অর্জন থাকলেও এখনও গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা পায়নি। এখনও দেশের ২০ ভাগের মতো মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছেন। মানুষের মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়নও ঘটেনি। তবে তার বিশ্বাস, মৃত্যুর আগে তিনি দেখে যেতে পারবেন, বাংলাদেশ একটা সুন্দর দেশ হয়েছে। বর্ষীয়ান এ নেতার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অমরেশ রায়

সমকাল: মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন নিশ্চয়ই কোনো প্রত্যাশা নিয়ে। কী সেই প্রত্যাশা?

রাশেদ খান মেনন: মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রত্যাশাটা ছিল অনেক বড়। সেই প্রত্যাশার মূল দিকটাই ছিল একটি স্বাধীন বাংলাদেশ এবং একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠবে। আমরা যেটাকে বলেছি স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ যেখানে রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সব ক্ষেত্রে জনতার অধিকারই প্রতিষ্ঠিত হবে। এই কারণেই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমাদের স্লোগান ছিল স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা গড়ে তুলতে হবে। যে স্লোগান দেওয়ার জন্য আমার সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডও হয়েছিল।

সমকাল: স্বাধীনতার ৫১ বছর পর প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে?

রাশেদ খান মেনন: দেখুন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেই কিন্তু সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছিল। এই তিনটা বিষয়ই আমাদের চিন্তার কাছাকাছি ছিল। আবার বঙ্গবন্ধুও দেশে ফিরে বলেছিলেন, এটার রূপায়ণে দেশে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা কায়েম হবে। পঞ্চাশ বছর পর এসে আমরা দেখছি, বঙ্গবন্ধু ঘোষিত সেই চার মূলনীতির মধ্যে কোনোটা একেবারেই নেই। কোনোটা হয়তোবা আধা খেঁচড়া অবস্থায় রয়েছে। যেমন গণতন্ত্র আধা খেঁচড়া আছে। আর সমাজতন্ত্র নাই-ই। এটা এখন চলে গেছে একটা ক্ষুদ্র ধনিক গোষ্ঠীর পকেটে। ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারটিও অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবেই দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বিধানটি যুক্ত করা হয়েছে। এসবের ফাঁক দিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তি তাদের অবস্থানটা গড়ে নিয়েছে। বর্তমানে আমাদের চেহারার পাশাপাশি পোশাক ও বেশভূষারও আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। আমাদের মেয়েরা মনে করে, লম্বা কাপড় পরলেই না কি সেটা ইসলামী ড্রেস হয়ে যায়! শাড়ি পরা ভুলেই গেছে তারা। সংস্কৃতিটাও একরকম উচ্ছন্নে চলে গেছে। এই যে লম্বা কাপড়টা পরা হচ্ছে, সেটা তো বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে একেবারেই বেমানান। এটা তো মধ্যপ্রাচ্যের পোশাক। তাহলে কীভাবে বলব, যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণ হয়েছে?

সমকাল: দেশে দুর্নীতি-লুটপাট, ঘুষ ও অনিয়মের বিস্তার হয়েছে। সুশাসন কতটুকু প্রতিষ্ঠা পেয়েছে?

রাশেদ খান মেনন: সুশাসন সেভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি। আর মূল্যবোধের অবক্ষয়টা এত বেশি, এটা সমাজের একেবারে ভেতরে চলে এসেছে। এখন মা তার ছেলেকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে অনৈতিক সম্পর্কের জন্য। বাবা তার ছেলেকে মেরে ফেলছে বা ছেলে তার বাবাকে মেরে ফেলছে। বন্ধু বন্ধুকে মেরে ফেলছে। এটা তো প্রতিদিনকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এটা কেবল প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলার ব্যাপার নয়। এটা আমাদের মানসিকতার ব্যাপারে দাঁড়িয়ে গেছে।

সমকাল: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন আওয়ামী লীগই রয়েছে। তাহলে দেশের এই অবস্থা কেন?

রাশেদ খান মেনন: আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, এটাতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের আসনেও রয়েছে। কিন্তু কেবল নেতৃত্ব দিলেই তো আর নেতৃত্ব থাকে না। এখন পরিস্থিতি যেটা দাঁড়িয়েছে সেটা হচ্ছে, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে। যদিও আমি নিজে ও আমার দল আওয়ামী লীগের জোটের মধ্যেই আছি। এর পরও সেদিন প্রধানমন্ত্রীর সামনেই এই কথাগুলো বলে এসেছি। এই পরিস্থিতিতে আমি মনে করি, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রাসঙ্গিকতাকে এগিয়ে নেওয়া। এখন আওয়ামী লীগ যদি সেটা ভালো করে বুঝে থাকে তাহলে তারা এটাকে সেভাবেই ব্যবহার করবে। আর যদি না বোঝে, তাহলে তো দেশটার একেবারে সর্বনাশ করে ফেলবে।

সমকাল: দেশের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে আপনাদের কি কোনো দায় নেই?

রাশেদ খান মেনন: নিশ্চয়ই রাজনীতিবিদদের দায়ও রয়েছে। এখানে রাজনীতিবিদদের প্রধান দায়টা হচ্ছে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় আমরা আমাদের জাতির পিতার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে দিয়েছি। সেখানে রাজনীতিবিদরা যদি সরাসরি জড়িত নাও থাকেন, কিন্তু তাদের নীরবতা এবং পরবর্তীদের হত্যাকারীদের সব অন্যায় কর্মকাণ্ডে সমর্থন সেই হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করেছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেখা গেল, যারা আগে বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, তারাই তার হত্যাকাণ্ডের ছয় ঘণ্টা পরই মোশতাক সরকারের মন্ত্রী হয়ে গেলেন। এটা যখন হলো, তখনই তো রাজনীতিবিদরা হত্যাকাণ্ডটাকে জায়েজ করে দিলেন। এর পরবর্তী দেড় দশক ধরে দেশটা আরও পিছিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায় পরিচালিত হয়েছে। তখনও এই রাজনীতিবিদরাই কিন্তু কখনও সামরিক আমলাদের মন্ত্রী হয়ে কখনও টাকা নিয়ে সম্পূর্ণভাবে তাদেরই বশীভূত থেকেছেন। এই সুযোগে সামরিক আমলারাও রাজনীতিবিদদের নিয়ে খেলেছেন। কখনও বিএনপি, কখনও জাতীয় পার্টির রূপে তাদের নিয়ে খেলা হয়েছে। এই যে সামরিক আমলাদের বশীভূত হলেন, এটা করেই তো রাজনীতিবিদরা দেশের সর্বনাশটা করে দিয়ে গেছেন। সেখান থেকে বের হওয়াই তো এখন অনেকটাই দুরূহ হয়ে পড়েছে।

সমকাল: তাহলে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আমাদের অর্জন নেই?

রাশেদ খান মেনন: না, সেটা বলব না। বরং আমি বলতে চাই, গত পঞ্চাশ বছরে আমাদের অর্জনটা বেশি। মোদ্দা কথা, আমরা একটা দেশ ও একটা পতাকা পেয়েছি। আমরা একটা অনুন্নত দেশ থেকে স্বল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়েছি, এখন তো উন্নয়নশীল দেশের পথেও এগিয়েছি। দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। মানুষ এখন কাপড় পরে, জুতা পরে। এগুলো আমাদের উন্নয়নের পরিচায়ক- সেটাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনও আমাদের সরকারি হিসাবমতেই, দেশের ২০ ভাগের মতো মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। তার মানে তিন কোটির ওপরে মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। আরও তিন কোটির মতো মানুষ পানির ওপরে নাক ভাসিয়ে রয়েছেন। যারা যে কোনো মুহূর্তে গরিব হয়ে যেতে পারেন। এর ওপর দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি যেটা ঘটেছে, সেটা মানুষকে অসহায় করে দিয়েছে। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পরিবর্তন না আনলে তো এ থেকে উত্তরণ ঘটানো যাবে না।

সমকাল: বিদ্যমান পরিস্থিতির উত্তরণে আপনার কোনো পরামর্শ?

রাশেদ খান মেনন: আমার পরামর্শ একটাই। সেটা হচ্ছে, গণতন্ত্রকে অবাধ করতে হবে। সেখানে দলমত নির্বিশেষে সবার মতামতকে সমন্ব্বয় করতে হবে, যাতে একটা দেশে জবাবদিহিমূলক সরকার থাকে। অর্থাৎ কর্তৃত্ববাদী সরকারের জায়গায় একটা জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা পরিচালিত হয়। যাতে মানুষ বুঝতে পারে, তারাও এই দেশেরই অংশ।

সমকাল: এই পর্যায়ে এসে কী প্রত্যাশা করেন?

রাশেদ খান মেনন: আমি আশাবাদী মানুষ। আমার বিশ্বাস, মৃত্যুর আগে দেখে যেতে পারব, বাংলাদেশ একটা সুন্দর দেশ হয়েছে। অন্তত নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশকে সেদিকেই নিয়ে যাবে।