মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। বর্তমানে তিনি বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট। কামালপুর, ধলই বিওপি, কানাইঘাট ও সিলেটের এমসি কলেজের বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে দলনেতা (কমান্ডার) হিসেবে নেতৃত্ব দেন মেজর হাফিজ। ভোলা-৩ আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপি সরকারের সাবেক এই পানিসম্পদমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, যে গণতন্ত্রের জন্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ, দেশে এখন সেই গণতন্ত্রই নেই। ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন লোটন একরাম

সমকাল: যে চেতনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, সেই আকাঙ্ক্ষা আজ কতটুকু পূরণ হয়েছে?

মেজর (অব.) হাফিজ: অধিকাংশ প্রত্যাশাই বাস্তবায়ন হয়নি। প্রধানত গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করেছি, আজ সেই গণতন্ত্র নেই। আইনের শাসন নেই। বাকস্বাধীনতা নেই। ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। এ অবস্থার জন্য যুদ্ধ করিনি। তবে অর্জনের মধ্যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, অর্থাৎ একটি মানচিত্র পেয়েছি। অর্থনৈতিক মুক্তিও কিছুটা অর্জিত হয়েছে।

সমকাল: প্রত্যাশিত লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার কারণ কী এবং এর জন্য দায়ী কারা?

মেজর (অব.) হাফিজ: প্রধানত রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতার কারণেই আমাদের সব লক্ষ্য অর্জন হয়নি। স্বাধীনতার পর যে রাজনৈতিক দলটি (আওয়ামী লীগ) ক্ষমতায় এলো তারা তিন বছরের মাথায় গণতন্ত্র হত্যা করল। অথচ এই গণতন্ত্রের জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি। সব রাজনৈতিক দল ও সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হলো। এখন আমরা দেখছি চারদিকে ব্যাপক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে গুম-খুন করা হচ্ছে।

সমকাল: মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

মেজর (অব.) হাফিজ: দু'জনের মধ্যে তুলনা করতে চাই না। বঙ্গবন্ধু নিঃসন্দেহে অনেক বড় মাপের একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। আর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। মুজিব পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা চাননি, তিনি চেয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে। বিবিসির সংবাদদাতা ডেভিড ফ্রস্ট ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ৭ বা ২৫ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি কেন? জবাবে শেখ মুজিব বলেছিলেন, তারা (পাকিস্তান) লক্ষ লক্ষ মানুষ মেরে ফেলত। তবে বঙ্গবন্ধু সৎ ছিলেন, দুর্নীতিবাজ ছিলেন না। তাজউদ্দীনসহ শীর্ষ দু-তিনজন দুর্নীতিমুক্ত ছিলেন। বাকিরা সবাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিলেন। জিয়া সততা ও দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন।

সমকাল: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে বিএনপি নেতারা দাবি করছেন। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা তা প্রত্যাখ্যান করছেন।

মেজর (অব.) হাফিজ: আমি খালেদা জিয়াকে একজন মুক্তিযোদ্ধা মনে করি। কারণ পাকিস্তানি বাহিনী ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের তালাশ করেছে। অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতাকে খোঁজেনি। জিয়া ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার পর খালেদা জিয়াকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। সেনানিবাসে ৯ মাস বন্দি থাকতে হয়েছে। তিনি স্বাধীনতা ঘোষণার আগে জিয়াকেও সাহস ও উদ্দীপনা জুগিয়েছেন।

সমকাল: শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পেছনে জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ আওয়ামী লীগ নেতাদের। খুনিদের পুনর্বাসনের অভিযোগ তো রয়েছে।

মেজর (অব.) হাফিজ: আমি জিয়াউর রহমানের একান্ত সচিব ছিলাম দেড় বছর। ১৫ আগস্ট সকাল ৬টায় আমি ও কমান্ডিং কর্নেল শাফায়াত জামিল জিয়াউর রহমানের বাসায় যাই। তাকে জানালাম, রাষ্ট্রপতি নিহত হয়েছেন। তার রি-অ্যাকশন ছিল সৈনিকের মতো। প্রেসিডেন্ট না থাকলে ভাইস প্রেসিডেন্ট আছেন। আমরা সংবিধান মান্য করব। তুমি সৈনিকদের তৈরি করো। জিয়া ষড়যন্ত্র করার মানুষ নন। খুনিদের পুনর্বাসন করেছেন খন্দকার মোশতাক। কর্নেল ফারুক রহমান ১৯৭৭ সালে জিয়ার বিরুদ্ধে বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে সেনাবিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। অথচ সে ১৫ আগস্টের প্রধান নায়ক। এতে প্রমাণ হয়, জিয়ার সঙ্গে তাদের সংশ্নিষ্টতা ছিল না।

সমকাল: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

মেজর (অব.) হাফিজ: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সমর্থন করি। তবে বিচারে যাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, তাদের আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। দু-একজন নির্দোষ ব্যক্তির বিচার হয়েছে।

সমকাল: অনেকের অভিযোগ, স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে আপনারা অস্বীকার করেন?

মেজর (অব.) হাফিজ: অস্বীকার করি তারা ইতিহাস বিকৃতি করেছে বলেই। ১৯৭১ সালের প্রকৃত ঘটনা এখনও লেখা হয়নি। শেখ মুজিবের ভূমিকা অস্বীকার করি না, আবার জিয়াউর রহমান ও মওলানা ভাসানীর ভূমিকাও স্বীকার করি। আওয়ামী লীগ যদি এভাবে বলে আমরা ৭০-এর ভোটে নির্বাচিত হয়েছি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। যেদিন জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করল, সেদিনই স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া উচিত ছিল। তাহলে এত মানুষ মারা যেত না।

সমকাল: জামায়াতের সঙ্গে মৈত্রী ও ২০০১ সালে সরকার গঠন বিএনপিকে লাভবান না ক্ষতিগ্রস্ত করেছে? এ ধারা কি অব্যাহত থাকবে?

মেজর (অব.) হাফিজ: বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটসঙ্গী হিসেবে মিলেমিশে বিএনপির পতন ঘটিয়েছে জামায়াত। আবার যে কোনো কারণে হোক ২০০১ সালে বিএনপি তাদের সঙ্গে নিয়েছে। তারপর দু'জনকে মন্ত্রী করা উচিত হয়নি। জামায়াতের মধ্যে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা এমপিও ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে করা যেত।

সমকাল: এখন বিএনপির বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গঠনের পথেও জামায়াত বড় বাধা বলে আলোচনা আছে।

মেজর (অব.) হাফিজ: জামায়াতকে জোটে রেখে খুব বেশি উপকার হয়নি বিএনপির। জোট থেকে বের না করলেও সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত। প্রকাশ্যে জোটের প্রয়োজন নেই। তারা তাদের রাজনীতি করুক। আমরা আমাদের রাজনীতি করি। অবশ্য বিএনপি ত্যাগ করলেই আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিয়ে নেবে।

সমকাল: এখন দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার অবক্ষয় নিয়ে প্রবলভাবে আলোচনা চলছে।

মেজর (অব.) হাফিজ: গত তিনটি নির্বাচন প্রহসন ছিল। ২০১৮ সালে আমি ঘর থেকে বের হতে পারিনি। আগের রাতেই ভোট হয়ে গেছে। এ কারণে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ওপর জনগণের কোনো আস্থা নেই। নির্বাচন করে পুলিশ ও প্রশাসন।

সমকাল: বিরোধী জোটে নির্বাচনীকালীন সরকার নিয়ে দুই মত লক্ষ্য করা যাচ্ছে?

মেজর (অব.) হাফিজ: দেশের কৃতিসন্তানদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল। এ ধরনের দল-নিরপেক্ষ লোকদের নিয়ে দুই বছরের জন্য সরকার গঠন করতে হবে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দিতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন করতে হবে। রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের পক্ষে নিরপেক্ষ থাকা কঠিন।

সমকাল: আগামী দিনে কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান এবং চ্যালেঞ্জগুলো কী?

মেজর (অব.) হাফিজ: বাংলাদেশকে কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই। সবার সমান সুযোগ থাকবে। দলীয়করণ ও দুর্নীতিমুক্ত এবং আইনের শাসন দেখতে চাই। প্রধান চ্যালেঞ্জ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং সৎ লোকের শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।

সমকাল: বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের অনেক উন্নয়ন তো হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ অনেক সূচকে এগিয়ে রয়েছে।

মেজর (অব.) হাফিজ: দক্ষ ব্যবসায়ীরা শিল্পায়ন করে বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছেন। এতে সরকারের কোনো কৃতিত্ব নেই। তারা লুটপাট নিয়েই ব্যস্ত রয়েছে।

সমকাল: মুক্তিযুদ্ধে ভারতসহ অনেক দেশ সহায়তা করেছে। এখন তাদের ভূমিকা কেমন?

মেজর (অব.) হাফিজ: অবশ্যই সাহায্য-সহযোগিতা করেছে, সে জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু কৃতজ্ঞতার ঋণ তো মনে হয় কেয়ামত পর্যন্ত শোধ হবে না। গত নির্বাচনের আগে জেনারেল এরশাদকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকতে চাপ দেওয়া হলো। এসব মানুষ খুবই মর্মাহত করে।

সমকাল: মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না কেন?

মেজর (অব.) হাফিজ: এটি অনেক দুঃখজনক। যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ৮০ হাজার থেকে এক লাখ। এখন আড়াই লাখের বেশি। মন্ত্রীরাও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ হয়েছেন। চারজন সচিব বয়স বাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। লন্ডন, পাকিস্তানে থাকার পরও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

সমকাল: এ সরকার তো মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা অনেক বাড়িয়েছে।

মেজর (অব.) হাফিজ: প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা এ ভাতা পেয়ে উপকৃত হয়ে থাকলে সমর্থন করি। যারা ভুয়া বা কলকাতা শহরের হোটেলে ঘুমিয়ে এখন ভাতা নিয়ে থাকলে তা সমর্থন করি না।

সমকাল: র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে আপনার কী বক্তব্য?

মেজর (অব.) হাফিজ: আমি এই নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করি। এটি বহুগুণে বাড়ানো প্রয়োজন।

সমকাল: সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

মেজর (অব.) হাফিজ: সমকালকেও ধন্যবাদ।