২৫ মার্চ, ১৯৭১। পাকিস্তানিদের হিংস্র আক্রমণে যখন দিশেহারা বাঙালি; একদিকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটে চলা, অন্যদিকে পশুশক্তিকে রুখে দেওয়ার জন্য দুর্বার প্রতিরোধ। সমকাল-এর তৃণমূলের প্রতিনিধিদের হাত ধরে আমরা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসীম সাহসী মানুষের কাছে, যারা সেই সময়ের সাক্ষী। তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ১৯৭১-এর সূচনালগ্ন রক্তাক্ত মার্চের আগুনঝরা দিনগুলোর কথা...

একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শুনতে কেউ গিয়েছেন ঢাকায়। কেউ ঘরে বসে রেডিও, কেউ মার্কেটে, পুকুরঘাটে বসেই অনেকে শুনেছেন সেই রক্ত আগুন লাগানো ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর চট্টগ্রামের বহু এলাকায় বের হয়েছিল মিছিল। উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন নগরের ছাত্র ও যুবকরা। ছাত্রলীগ কর্মীরা সরকারি স্থাপনা ও বহু জায়গা থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ফেলে দেন নালায়। ৮ মার্চ থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করতে চট্টগ্রামের এলাকায় এলাকায় গঠিত হতে শুরু হয় সংগ্রাম কমিটি। চট্টগ্রাম শহরে মার্চের মাঝামাঝিতে অবাঙালি ও বাঙালিদের মধ্যে বেশ কয়েকবার সংঘাত-সংঘর্ষ হয়। ২৫ মার্চের আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শহরে ঢোকার চেষ্টা করলে প্রতিরোধ করেন মুক্তিপাগল ছাত্র-যুবকরা। সীতাকুণ্ডে সংগ্রাম কমিটি গঠনের পর ট্রেনিংও নিতে শুরু করেন ছাত্র-যুকবরা।

মার্চের সেই প্রতিরোধ যুদ্ধের স্মৃতিকথা তুলে ধরেন একাত্তরে ছাত্রলীগ কর্মী বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বীর মুক্তিযোদ্ধা সরোয়ার কামাল দুলু। তিনি বলেন, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আমরা সীতাকুণ্ডে বসে শুনেছি। তখন আমি ছাত্রলীগ কর্মী। এইচএসসিতে পড়াশোনা করতাম। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ শুনে আমরা উজ্জীবিত হয়ে উঠি। ভাষণ শেষ হওয়ার পরই পুকুরঘাটে উপস্থিত সাত-আটজনকে ডা. এখলাছ গ্রামে গ্রামে সংগ্রাম কমিটি গঠন শুরু করতে নির্দেশ দেন। ৮ মার্চ থেকে আমরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা শুরু করি। ২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত সীতাকুণ্ডে আমরা ১০টি সংগ্রাম কমিটি গঠন করি।

মুক্তিযোদ্ধা সরোয়ার কামাল জানান, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শেষ হওয়ার পর তাৎক্ষণিক সীতাকুণ্ড বাজারে আমরা একটি মিছিল বের করি। ডা. এখলাছ উদ্দিন ও মুলকুতুর রহমানের নেতৃত্বে সেই মিছিলে ১০-১২ জন উপস্থিত ছিলাম। আমরা মিছিল করার সময় দুই-তিনটি জায়গায় পাকিস্তানি পতাকা দেখে নামিয়ে নালায় ফেলে দিই। আমাদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন এমআর সিদ্দিকী। সীতাকুণ্ড থেকে প্রায় প্রতিদিন শহরে এসে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা নিয়ে সীতাকুণ্ডে গিয়ে আমাদের তার আলোকে কাজ ভাগ করে দিতেন ডা. এখলাস উদ্দিন। শহরে আসা-যাওয়ার জন্য গুল আহমদ মিল থেকে একটি পুরাতন গাড়ি আমাদের দেওয়া হয়েছিল। ৭ মার্চের পর থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সীতাকুণ্ডে সংগ্রাম কমিটি মানুষকে সংগঠিত ও সচেতনা বাড়াতে সক্রিয়ভাবে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ২০ মার্চের পর ডা. এখলাস উদ্দিন আমাদের তরুণদের নিয়ে সীতাকুণ্ডের পশ্চিম বহরপুর গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে রাতে সেনাবাহিনীতে চাকরি করা সিরাজুল হক ও রেনু মিয়াকে দিয়ে ট্রেনিং দেওয়া শুরু করেন। সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকা থেকে নতুন নতুন তরুণ ছেলেরা এসে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন।

যুদ্ধকালীন গেরিলা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরু বাঙালি বলেন, ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনে আমরা একদল ছাত্রলীগ কর্মী চট্টগ্রাম শহর থেকে থেকে ঢাকা রওনা হই। আমাদের রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর জনসভার ভলেন্টিয়ার নিয়োগ করা হয়। ৯ মার্চ আমরা ফের চট্টগ্রামে ফিরে আসি। ১০ মার্চ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে জেল ভেঙে কয়েদি বের হওয়ার খবরে চট্টগ্রামে খুব উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এদিন অক্সিজেন রউফাবাদ এলাকায় অবাঙালি বিহারিরা বাঙালি জনসাধারণের ওপর আক্রমণ চালায়। ১৬ মার্চ মঙ্গলবার চট্টগ্রামের শেরশাহ কলোনি, রৌফাবাদ কলোনি, হামজারবাগ এলাকায় আমাদের সঙ্গে বিহারিদের সংঘর্ষ হয়। এতে অনেক বাঙালি হতাহত হয়। ২৩ মার্চ চট্টগ্রাম বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। এদিন হালিশহর, অক্সিজেন, চকবাজার, সরদার বাহাদুর নগর, এনায়েত বাজার, আসাদগঞ্জ, চট্টেশ্বরী, ঝাউতলা এলাকায় বাঙালি-বিহারি ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ২৩ মার্চ চট্টগ্রামের নতুন পাড়া সেনানিবাস থেকে শহরের দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যাতে আসতে না পারে, সে জন্য সেদিন সকালে আমরা ষোলশহর স্টেশন থেকে ৮ বগির একটি মালবাহী ট্রেন বহর এনে ষোলশহর ২ নং গেটে রোড ব্লক করি। ২৪ মার্চ সকাল ১১টায় মেজর মীর শওকত আলীর নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি সৈন্য এসে আমাদের দেওয়া রোড ব্লক অপসারণ করে। ২৫ মার্চ সকালে লে. কর্নেল এম আর চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি সৈন্য নতুনপাড়া সেনানিবাসের আমাদের দেওয়া ব্যারিকেড ভাঙতে এসে কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। ২৫ মার্চ রাত ১১টা ৩০ মিনিটে নতুনপাড়া সেনানিবাসে ঘুমন্ত বাঙালি ইবিআরসি ব্যারাকে নির্বিচার গুলি চালিয়ে বহু সৈনিককে মেরে ফেলে।

নগরীর বক্সিরহাট এলাকার একাত্তরের যুবক শহীদুল হক সৈয়দ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে ঢাকায় যান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শুনতে বাসে করে ঢাকায় যাই। ভাষণ শুনে পরদিন চট্টগ্রামে ফিরে আসি। আমি তখন নগরের বক্সিরহাট ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি। আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশনা মোতাবেক পাড়ায় পাড়ায় সংগ্রাম কমিটি গঠনের প্রস্তুতি নিই। প্রতিটি পাড়ায় গিয়ে যুবক ও তরুণদের নিয়ে বৈঠক করে সংগ্রাম কমিটি গঠন করি। ২৫ মার্চের আগে লালদীঘি মাঠে স্বেচ্ছাসেবক লীগের পক্ষ থেকে আমরা কুচকাওয়াজের আয়োজনও করেছি। আমার সঙ্গে মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল আলম, আবছার উদ্দিন, মনসুর আহমদ, শামসুল আলম, লুৎফর রহমান খানসহ অনেকেই প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন।