রমনার রেসকোর্স ময়দানে বসে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পর মোবারক হোসেনের শরীরের রক্ত যেন গর্জন দিয়ে ওঠে। ৭ মার্চের পর সারাদেশ ক্রমেই উত্তাল হতে থাকে। ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন মুক্তিকামী টগবগে যুবকরা। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার সিংগারদীঘি গ্রামের কলিম উদ্দিনের ছেলে মোবারক তখন ঢাকার বংশালে থাকেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সপ্তাহখানেক পর গ্রামে ফিরে আসেন তিনি। ২৫ মার্চের পর পরিস্থিতি যখন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তখন ঢাকা ও গাজীপুরে অবস্থানকারী উত্তরবঙ্গের নারী-পুরুষ ও শিশুরা শ্রীপুরের মাওনা হয়ে পালিয়ে যেতে থাকেন। এলাকার আরও কয়েক যুবককে সংগঠিত করে গ্রামে ফিরে যাওয়া মানুষজনকে নানাভাবে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মোবারক হোসেনের সাংগঠনিক কার্যক্রম। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সিংগারদীঘি গ্রামে প্রয়াত ইউপি চেয়ারম্যান নূরুল ইসলামের বাড়িতে হাজির হন অবিভক্ত ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও '৭০-এর নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে বিপুল ভোটে বিজয়ী এমএনএ শামসুল হক। মোবারক হোসেন ২৬ বছরের টগবগে যুবক। এমএনএ শামসুল হকের সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ হলো। এ এলাকায় সপ্তাহখানেক অবস্থান করার সুযোগে শামসুল হকের সঙ্গে মোবারকের সম্পর্ক গড়ালো ঘনিষ্ঠতার দিকে। এলাকার সব যুবককে ঐক্যবদ্ধ করে যুদ্ধের ময়দানে মোবারককে নেমে পড়ার নির্দেশ দিয়ে শামসুল হক হালুয়াঘাট হয়ে মেঘালয়-আসাম দিয়ে আগরতলা চলে যান।

যুবকদের সংগঠিত করার কাজ শুরু করেন মোবারক হোসেন। দিনের আলোয় নিজেকে লুকিয়ে রাখতেন আর রাত হলেই বেরিয়ে পড়তেন তরুণদের খোঁজে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে থাকলেন। মে মাসের গোড়ার দিকে একই এলাকার মোসলেহ উদ্দিন ফরাজী ও শফিকুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে মোবারক হেঁটে আগরতলার হাপানিয়া ক্যাম্পে চলে যান। সেখানে গিয়ে দেখা মেলে শামসুল হকের সঙ্গে। কালিয়াকৈরের ঠেঙ্গারবান্ধের গ্রামের বাড়ি থেকে নিজের স্ত্রী, ছেলে-মেয়েকে আগরতলা নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেককেই অনুরোধ করেছেন। কিন্তু কেউ রাজি হননি। মোবারক হোসেন রাজি হয়ে গেলেন। হাপানিয়া ক্যাম্পে ৩-৪ দিন থাকার পর মোবারক চলে এলেন দেশে। শামসুল হকের গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে এলেন তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েকে। এদের সঙ্গে সংগঠিত করে প্রায় ৩০০ জন মানুষের এক বহর নিয়ে মোবারক চললেন আগরতলার দিকে।

২১ দিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে ৬৬ জনের দলবল নিয়ে গ্রামে ফিরে আসেন মোবারক। এই ৬৬ জনকে ৬টি সেকশনে ভাগ করা হয়। প্রত্যেক সেকশনে একজন করে কমান্ডার নিযুক্ত হন। এক নম্বর সেকশনের কমান্ডার করা হয় মোবারক হোসেনকে। বাকি ৫টি সেকশন ছিল তারই নিয়ন্ত্রণাধীন।

এলাকায় ফিরে শ্রীপুরের গোলাঘাট সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন তারা। সেখানে ১৪ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাদের যুদ্ধ। মাওনার পাথার সম্মুখযুদ্ধ, রাজাবাড়ী ব্রিজের যুদ্ধসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধ করেন তারা। মোবারক হোসেন বলেন, 'ডিসেম্বরের ৫ তারিখ মাওনার পাথার যুদ্ধ হয়। সখীপুর থেকে ৫শ' থেকে ৬শ' পাকিস্তানি সেনা আসছে বলে তাদের কাছে খবর আসে। আগে থেকেই তাদের আমরা টার্গেট করতে থাকি। এক পর্যায়ে মাওনা ব্রিজের কাছে আসার পর দু'পক্ষের তুমুল গোলাগুলি চলতে থাকে। আশপাশের সব মুক্তিযোদ্ধা পাথারে এসে জড়ো হন। আমাদের সশস্ত্র অবস্থান দেখে মধ্যরাতের পর পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যায়।

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জন্মভিটা কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামের পাশের গ্রাম তরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন নূর মুহাম্মদ ফকির। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ২২ বছরের যুবক। এর আগেই তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় তাজউদ্দীন আহমদের ব্যাগ নিয়ে তারই সঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন নূরু ফকির। কাপাসিয়া ও শ্রীপুর এলাকায় নূরু ফকির 'তাজউদ্দীনের ব্যাগ' নামে তখন পরিচিত হয়ে ওঠেন। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন স্কুলজীবন থেকেই। নূরু ফকিরের বয়স যখন ৮ বছর, তখন তার বাবা কেরামত আলী ফকির শ্রীপুরের গোসিঙ্গা ইউনিয়নের হায়াতখার চালা গ্রামে এসে বসতি শুরু করেন। এ গ্রামেই তার বেড়ে ওঠা। মুক্তিযুদ্ধের আগেই তিনি গোসিঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বীরযোদ্ধা নূর মুহাম্মদ ফকির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চ ভাষণ দেবেন এ কথা আগেই জানা ছিল। ৬ মার্চ রাতেই এলাকার শ্রীপুর থানা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ট্রেনে চেপে ঢাকা গিয়ে পৌঁছি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য দুপুর হওয়ার আগেই ময়দানে গিয়ে হাজির হই আমরা। মঞ্চের খুব কাছ থেকে সে ভাষণ শোনার সুযোগ হয়েছিল সেদিন। এ ভাষণই আমার প্রেরণা ছিল, ছিল মূল শক্তির উৎস। নূরু ফকির বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পালনে নেমে পড়লেন মাঠে-ময়দানে। শ্রীপুর থানা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে গ্রাম পাড়া-মহল্লা ও ইউনিয়নে 'সংগ্রাম পরিষদ গঠন' করতে শুরু করলেন। শাহাবুদ্দিন মণ্ডলের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে থাকলেন যুবসমাজকে। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো একদল যুবককে নিয়ে আগরতলার কংগ্রেস ভবনে যান। মাত্র ৬ দিন সেখানে অবস্থান শেষে আবার ফিরে আসেন এলাকায়। তিনি বলেন, ফিরে এসে রাজাবাড়ী ব্রিজ যুদ্ধে অংশ নেন। এরপর আবার চলে যান আগরতলা শরণার্থী শিবিরে। নিয়ে যান অন্তত ৭৮ যুবককে। এদের মধ্যে ৫০ জনই ছিল তার সরাসরি ছাত্র। তিনি বলেন, বলদী ঘাটের হাসেন মৃধা, বদনী ভাঙার নূরু মেম্বার ও শাইটেলিয়া গ্রামের আনসার আলী সরকারের বাড়িতে মিটিং করে এসব যুবককে সংগঠিত করেছিলাম। শরণার্থী শিবিরে যুবকদের পৌঁছে দেওয়ার পর সেখান থেকে বাছাই করে পাঠানো হতো হাপানিয়া যুব শিবিরে। সেখান থেকে পাঠানো হতো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। প্রশিক্ষণ শেষে যুবকরা নেমে পড়তেন যুদ্ধের ময়দানে। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ৫৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর শ্রীপুরে ফিরে আসেন নূরু ফকির। তার নেতৃত্বেই তখন শুরু হয় যুদ্ধ। ৫৫ জনকে ৫টি সেকশনে ভাগ করা হয়েছিল। প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন পেলাইদের সিরাজ উদ্দিন প্রধান। ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক সহযোগিতায় থেকেছেন নূরু ফকির।