বয়সের ভারে ন্যুব্জপ্রায় কিশোরগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক সাব্বির আহমদ মানিক। অনেক স্মৃতি আজ মনে করতে পারেন না। তবু যেটুকু তিনি বলতে পারেন, তা শুনলেই শিউরে ওঠে শরীর। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ছিলেন স্থানীয় গুরুদয়াল কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। একইসঙ্গে কিশোরগঞ্জ মহকুমা ছাত্রলীগের তুখোড় সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও তিনি ছাত্র ও সাধারণ মানুষের কাছে সুপরিচিত ছিলেন।

একাত্তরের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারের পর পুরো জাতির সামনে একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে কিশোরগঞ্জের সর্বত্র। ছাত্রনেতা ও তরুণ সংগঠক সাব্বির আহমদ মানিক তখনই যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইত্যবসরে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক রথখলা ময়দানে পাকিস্তানের কথিত জাতীয় দিবস ২৩ মার্চ বিকেলে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে একটি বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ জনসভায় তরুণ এমএনএ মো. আবদুল হামিদ (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা নামিয়ে 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' গানের সম্মিলিত সুর-মূর্ছনার মধ্য দিয়ে লাল-সবুজের মাঝখানে মানচিত্র অঙ্কিত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। মহকুমা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সাব্বির আহমদ মানিক ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও একজন অকুতোভয় সংগঠকে পরিণত হন। প্রথমেই তিনি নিজ এলাকার অনেককে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ও উদ্বুদ্ধ করেন। ইতোমধ্যে শহরের আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একজন অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সৈনিকের নেতৃত্বে সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে যায়।

২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট শুরুর পর গাজীপুরের জয়দেবপুর সেনানিবাস থেকে বাঙালি সেনা কর্মকর্তা মেজর কেএম শফিউল্লাহ তার অধীনস্থ সব বাঙালি সেনা অফিসার ও সৈনিকদের নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। মার্চ মাসের ৩১ তারিখ বিদ্রোহী সেনাদল নিয়ে ট্রেনযোগে কিশোরগঞ্জে চলে আসেন এবং আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে ঘাঁটি স্থাপন করেন। সেনাদলের এই আগমনে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়।

১৯ এপ্রিল কিশোরগঞ্জে দখলদার পাকিস্তানি সেনাদের আগমন ঘটলে আজিমউদ্দিন স্কুল মাঠে প্রশিক্ষণরত সাব্বির আহমদ মানিক ও আনোয়ার কামাল প্রশিক্ষণস্থল ত্যাগ করে শহরে চলে আসেন। এ সময় কিশোরগঞ্জ থানার সামনে তারা দাঁড়ানো অবস্থায় চারটি খালি জিপগাড়ি দেখতে পান। হানাদার পাকিস্তানি সেনারা যাতে এই জিপ ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য এই দুই তরুণ ধারালো দা ও শাবল সংগ্রহ করে চারটি জিপকে কুপিয়ে বিকল করে দেন। ২৬ এপ্রিল সাব্বির আহমদ মানিক তার দলবল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য করিমগঞ্জের নিয়ামতপুর হয়ে নৌকাযোগে মেঘালয় রাজ্যের বালাট সীমান্ত অতিক্রম করে মহেশখোলা ক্যাম্পে উপস্থিত হন। তরুণ এমএনএ মো. আবদুল হামিদ তখন ওই ক্যাম্পে সাব-সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। সাব্বির আহমদ মানিক ও তার দলবলকে সেখান থেকে হাফলং ট্রেনিং সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই সেন্টারে ৪৫ দিন প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি সশস্ত্র অবস্থায় তার গ্রুপসহ কলাবাগান হয়ে নৌকাযোগে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। সাব্বির আহমদ মানিক সীমান্তের ওপারে অবস্থানকালে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন লোক মারফত সংবাদ পাঠিয়ে এলাকার আরও অনেক তরুণ-যুবককে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করেন। দেশে প্রবেশের পর বিভিন্ন গ্রামের তরুণ-যুবককেও তিনি যুদ্ধের জন্য সংগঠিত করে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বিভিন্ন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেন।

যুদ্ধের স্মৃতির কথা স্মরণ করে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলেন, সে এক ভয়াল সময় গেছে আমাদের। জীবন নিয়ে ফিরতে পারব কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। এরপরও দেশপ্রেমের প্রাবল্যে আমরা এতই উদ্বুদ্ধ ছিলাম যে, জীবনকে তখন তুচ্ছ মনে হতো। হানাদার পাকিস্তানি সেনাদের দেশ থেকে হটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই ছিল আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। তিনি বলেন, নেত্রকোনার কলমাকান্দা যুদ্ধ ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ। আধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত কয়েকশ' পাকিস্তানি সেনা ও শত শত রাজাকারের বিরুদ্ধে আমরা কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা টানা চারদিন সে যুদ্ধ চালিয়ে গেছি। যুদ্ধের মাঠে অস্ত্রের চেয়েও বড় শক্তি হচ্ছে তাৎক্ষণিক কৌশল ও অসম সাহসিকতা। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যা পুরোদমেই কার্যকর ছিল। যে কারণে অধিকসংখ্যক প্রতিপক্ষের সামনেও আমরা ছিলাম সাহসে বলীয়ান। যার ফল আমরা প্রতিটি যুদ্ধেই প্রত্যক্ষ করেছি। কলমাকান্দা যুদ্ধে আমরা আমাদের চারজন সহযোদ্ধাকে হারিয়েছি। এ চার মুক্তিযোদ্ধার প্রাণের বিনিময়ে সে যুদ্ধে আমাদের হাতে ১৭ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।