মুক্তিযুদ্ধের মাহেন্দ্রক্ষণে পুরো জাতি যখন বিজয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল, সে সময় ফরিদপুরের প্রতিবাদী তারুণ্য অবদান রেখেছিল মুক্তির রক্তঝরা সংগ্রামে। ঘটনার পর ঘটনা ঘটিয়ে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের তারা বিচলিত করে তুলেছিল। স্বাধীনতাকামী ফরিদপুরবাসীকে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত করেছিলেন তা তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর বিএলএফের ডেপুটি কমান্ডার শাহ্‌ মোহাম্মদ আবু জাফর।

ফরিদপুর সার্কিট হাউসের সামনে কীভাবে জনতার স্বতঃস্ম্ফূর্ত বিক্ষোভ হয়েছিল মার্চের শুরুতে- তার বিবরণ দিতে গিয়ে শাহ্‌ জাফর বলেন, 'পাকিস্তানের সৈন্যরা সার্কিট হাউসের ছাদে এবং বিভিন্ন অবস্থানে বালুর বস্তা দিয়ে নিরাপদ অবস্থান তৈরি করে পজিশন নিয়ে এলএমজি তাক করে বসে আছে। কিন্তু সেদিন ফরিদপুরের মানুষরা যেন ভয়কে জয় করে ফেলেছে। চাই শুধু স্বাধীনতা। পূর্ব গেটের কর্তব্যরত সেনাবাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র তাক করে ধরল। উর্দুতে বলল, গেটের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে গুলি করতে বাধ্য হবো। আমি বললাম, আমরা পাকিস্তান মানি না, সার্কিট হাউসের ওপরে যে পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে, সেটা নামিয়ে আমরা স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়াতে চাই। উত্তপ্ত ছাত্র-জনতা সার্কিট হাউসের ভেতরে জোর করে প্রবেশ করার চেষ্টা করতেই হুইশেল শুনলাম। শুরু হয়ে গেল লাঠিচার্জ। মুহূর্তে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল সবাই। আমার হাতে ছিল স্বাধীন বাংলার পতাকা। আমাকে রাইফেল দিয়ে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দিয়ে লাথি মারতে শুরু করল পাকিস্তানি সেনারা। আমার হাত থেকে রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী পতাকাটি নিয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে বলেছিল, জীবন থাকতে পতাকার মর্যাদা নষ্ট হতে দেব না। ত্রিবেদীকেও পাকিস্তান আর্মি বুট দিয়ে আঘাতের পর আঘাত করে। সেই মুহূর্তে কিছু কর্মী ত্রিবেদীদাকে পতাকাসহ ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে এলো। আমরা মিছিল করে শহরের দিকে চলে এলাম। এখানে শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছিলেন।'

তিনি জানান, শত্রু পক্ষকে আতঙ্কিত করার জন্য ১১ মার্চ রাতে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে ভারী বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এই বোমা আক্রমণের দায়িত্বে ছিল মোজাম, নিমাই, নূরে আলম মঞ্জু, সেলিম ও আলা। ১১ মার্চ সকালে আমি, কবিরুল আলম মাও এবং সালাহউদ্দিন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে বৈঠক করে জানিয়ে দিই যে প্রশাসন পাকিস্তান সরকারের কথায় আর চলবে না, বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেটা অনুসরণ করে চলতে হবে। সার্কিট হাউসে যে আর্মি আছে, তারা শহরে টহল দিতে পারবে না। তাদের যশোর ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যেতে হবে। তারা আমাদের কথার সঙ্গে একমত পোষণ করলেন। মার্চের প্রায় প্রতিদিনই ফরিদপুর শহর, মহকুমা ও থানা সদরে মিছিল-মিটিং চলছিল। প্রশাসন আওয়ামী লীগ ও স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নিয়ন্ত্রণে চলতে থাকে। গোটা জাতি যেন এক ধ্যানে এগিয়ে চলেছে, কখন শুরু হবে স্বাধীনতা যুদ্ধ? ফরিদপুরের অবস্থা দেখে ফরিদপুর সার্কিট হাউস থেকে পাকিস্তান আর্মি সবকিছু গুটিয়ে নিয়ে ১৭ মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্টে চলে যায়।

২৩ মার্চ বিকেলে স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে অম্বিকা ময়দানে ছাত্র গণজমায়েত আহ্বান করা হলো। প্রচারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক শহীদুল ইসলাম নিরুর ওপর। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সৈয়দ কবিরুল আলম মাও, আমি সভা পরিচালনা করি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেই অশান্ত ঝঞ্জা-বিক্ষুব্ধ সময়ের কথা। সেই সময়ের জাতীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে একাত্তরের মার্চের উত্তাল ফরিদপুরকে দৃশ্যপটে ভাসিয়ে তুলে মুক্তিযুদ্ধের এই অন্যতম সংগঠক বলেন, ২৬ মার্চ সকালেই সেই ভয়াল রাতের খবর এলো। দেখা গেল ঢাকা থেকে হেঁটে শত শত নারী-পুরুষ ছুটে আসছেন। তাদের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। সেই সঙ্গে খবর এলো, পিলখানাতে ইপিআররা অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ইপিআর ও বাঙালি সেনারা প্রতিরোধ যুদ্ধে শামিল হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে দুই ধরনের কথা শোনা গেল। কেউ বলছে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, কেউবা বলছে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি, তিনি বুড়িগঙ্গা পার হয়ে গ্রামের দিকে চলে এসেছেন।

ফরিদপুর শহরের নীলটুলীস্থ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে তখন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন স্তরের জনগণের ভিড়। এরই মধ্যে খবর শোনা গেল, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ফের পাকিস্তানি পতাকা উড়ছে। সকালে আওয়ামী লীগ অফিস থেকে জাতীয় পরিষদ সদস্য সৈয়দ কামরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে ডেপুটি কমিশনার ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে জোরপূর্বক পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। দুপুরে তথ্য বিভাগের গাড়িতে করে মাইকে প্রচার করা হয়, 'বাংলাদেশের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। ঢাকায় পুলিশ-ইপিআর-আনসার-মুজাহিদ-ছাত্রনেতারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে পাল্টা আঘাত হেনে চলেছে। আপনাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।'

এরই মধ্যে খবর আসে, যশোর থেকে কামারখালী হয়ে পাকিস্তানি সেনারা আসছে। ফরিদপুর, কামারখালী ও বালিয়াকান্দি থেকে শত শত যুবক লাঠি, ঢাল-সড়কি, বল্লম হাতে কামারখালী ঘাটে প্রতিরোধ বূ্যহ রচনা করে। সন্ধ্যায় বিবিসি খবরে ঢাকার পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় ছাত্র-যুবকরা যশোর ও ঢাকা রোডের ওপর গাছ কেটে রেখে পথরোধ করতে শুরু করে। রাস্তার দু'পাশের গ্রামবাসী দা-কুড়াল নিয়ে কাজে অংশ নেয়। গোয়ালন্দে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাজবাড়ীর নেতাদের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা হয়। ছাত্র, জনতা, আনসার, পুলিশের সমন্বয়ে গোয়ালন্দ ঘাটে ব্যারিকেড তৈরি হয়। সবার আশঙ্কা ছিল, নদীপথে গানবোট নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা গোয়ালন্দ হয়ে ফরিদপুর আক্রমণ করতে পারে।

২৭ মার্চ বেলা ১১টায় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ডেপুটি কমিশনার ও পুলিশ সুপারের বৈঠক হয়। ২৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণায় সবাই অনুপ্রাণিত হন। ২৯ মার্চ অম্বিকা ময়দানে অ্যাডভোকেট আদেলউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে বক্তৃতা করেন কে এম ওবায়দুর রহমান, শামসুদ্দিন মোল্লা, ইমামউদ্দিন আহমেদ ও ছাত্র নেতারা। স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে জনসভা হয়। হাজার হাজার মানুষ বাঁশের লাঠি, ঢাল, সড়কি, দা-কুড়াল, দেশীয় বন্দুক নিয়ে উপস্থিত হন। ছাত্র-যুবকর্মীরা অস্ত্রের সন্ধানে তৎপর হয়ে ওঠে। তালুকদারের বন্দুকের দোকান, কালেকটারিয়েটের মালখানা ও আনসার ক্যাম্প থেকে কয়েকটি রাইফেল সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া পলিটেকনিকের ছাত্ররা পাইপগান তৈরি করে। কলেজ ও স্কুলের ল্যাবরেটরি থেকে রাসায়নিক দ্রব্য সংগ্রহ করে বোমা তৈরি করা হয়। এভাবেই সূচনা হয় স্বতঃস্ম্ফূর্ত প্রতিরোধের।