বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাস আর আমাদের সাহিত্যের উন্মোচন পর্ব পরস্পর পরিপূরক। চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমান পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী চেতনার আবেগ তখন কারও কারও লেখায় ফুটে ওঠে। কোনো কোনো লেখক সচেতনভাবে তাদের ভাষার মধ্যে আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দ টেনে আনেন। কিন্তু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশজ অসাম্প্রদায়িক সাহিত্যের ধারা পরিস্রুত হয়ে উঠতে থাকে। তাই আমরা বলতে পারি, ভাষা আন্দোলন থেকে বাংলাদেশ আন্দোলনের সূত্রপাতই শুধু নয়; বাংলাদেশের সাহিত্যের গতিপথও নির্ধারিত হয়ে যায়। তরুণ লেখকদের মধ্যে আর কলকাতাভিত্তিক লেখকদের অনুকরণ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় না। তাদের সামনে চলে আসে নতুন ভাষা, নতুন বিষয়। যেহেতু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ফলে মুসলমান-রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পায় পূর্ব পাকিস্তান। তাই মুসলিম সংস্কৃতি, না বাঙালি সংস্কৃতি- কোনটা হবে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়- এই প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এর সমাধান পেতে আমাদের লেখকদের খুব বেশি সমস্যা হয়নি। কেননা, ত্রিশ ও চল্লিশের দশকেই দেখি আমাদের সাহিত্যের প্রগতিশীল ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আমাদের সাহিত্য ধর্মীয় কুসংস্কার-ধর্মান্ধতার ওপর আঘাত হেনেছে। উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবোধ বাংলার বহুত্ববাদী লোকায়ত সংস্কৃতির মধ্যে কখনোই ছিল না। আবুল ফজলের 'চৌচির' (১৯৩৪), আবুল মনসুর আহমদের 'আয়না' (১৯৩৬) ও 'ফুড কনফারেন্স' (১৯৪৪); সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর 'লালসালু' (১৯৪৮) লেখা হয়ে গেছে পঞ্চাশ দশকের আগেই। এ কারণে আজ যখন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে কথা বলি, তখন ত্রিশ বা চল্লিশ দশকের এসব সৃষ্টিকে আমরা আলোচনা থেকে বাদ দিতে পারি না।

অখণ্ড বাংলা সাহিত্য থেকে বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পূর্ণভাবে আলাদা পথে যাত্রা শুরু করে পঞ্চাশের দশকে এসে। ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের সাহিত্যকে যতটা প্রভাবিত করেছে; মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া বাঙালির আর কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা এককভাবে এত প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। যখনই বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা সংকটের মধ্যে পড়েছে, তখনই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস প্রেরণা জুগিয়েছে। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের আগমুহূর্তেও আমরা দেখি ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কবিতা-গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। শামসুর রাহমান এ কারণেই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে স্মরণ করে লিখেছেন :

'বুঝি তাই উনিশশো ঊনসত্তরেওআবার সালাম নামে রাজপথে
শূন্যে তোলে ফ্ল্যাগ,
বরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে।
সালামের বুক আজ উন্মথিত মেঘনা,
সালামের মুখ আজ তরুণ শ্যামল পূর্ব বাংলা।

[ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯]

এভাবে আমাদের লেখকরাও জাতীয় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই কলমযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন তারা। ষাটের দশকে তেমনই এক সাংস্কৃতিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে অর্জন করি। এর ফলে রবীন্দ্রনাথ আরও বেশি আমাদের হয়ে ওঠে। এসব ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ২৩ বছর ছিল আমাদের সাহিত্যের প্রস্তুতির সময়। শিল্প-সাহিত্যের একটা বিরাট অংশ তখন রচিত হয়েছে সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে। সময়ের ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের লেখকরা গণমানুষের মুখে ভাষা তুলে দিতে থাকেন। এই ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে তাদের পুরোনো পদ্য-গদ্যরীতি বা বিন্যাসরীতি বাতিল করে নতুন ধরনের ভাষা ও বর্ণনাশৈলী নির্মাণ করতে হয়েছে। বিদ্যাসাগরি গদ্য, আলালি গদ্য, বঙ্কিমি গদ্য-পদ্য অবসরে চলে গিয়েছিল আগেই। কাব্যে রবীন্দ্র-প্রভাব থেকেও বের হয়ে এসেছিলেন ত্রিশ ও চল্লিশের কবিরা। বাঙালি মুসলমান লেখকদের সাহিত্যে ফারসি, আরবি ও উর্দু শব্দের ব্যবহার কমে গেল। এ সময় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবেই বাংলার বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাকে সাহিত্যিকরা তুলে আনলেন গল্প-উপন্যাসে। মোটা দাগে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ নোয়াখালীর, শামসুদ্দীন আবুল কালাম আজাদ বরিশালের, আবু ইসহাক বিক্রমপুরের, আলাউদ্দিন আল আজাদ চট্টগ্রামের, আবু বকর সিদ্দিকী খুলনার এবং হাসান আজিজুল হক বরেন্দ্র অঞ্চলের ভাষা ব্যবহার করলেন। বাংলার ইতিহাসকে উপন্যাসের উপজীব্য করে তুললেন রিজিয়া রহমান, শওকত আলী, সেলিনা হোসেনের মতো প্রগতিশীল লেখক। শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী ও রফিক আজাদের মতো কবি সরল-সাধারণ ভাষায় কবিতা লেখা শুরু করলেন। ভাষার সরলীকরণের সঙ্গে যোগ হলো আধুনিক চেতনা ও বিশ্ববোধ। সব মিলে বাংলাদেশের সাহিত্যের একটা স্বকীয় চেহারার শক্ত ভিত তৈরি হয়ে গিয়েছিল ১৯৭১-এর আগেই; সেটি যেমন কবিতায়, তেমন গল্প-প্রবন্ধ-নাটক এবং চারুশিল্পেও। আর এর দৃশ্যত যে অর্জন সেটি পেতে থাকলাম আমরা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে।

কিন্তু দেশ স্বাধীন হলেও আমাদের লেখকদের সামাজিক-রাজনৈতিক দায় কমেনি। কলমের যুদ্ধটা তখন অন্যদিকে মোড় নেয়। স্বাধীনতার পরপরই ধর্মান্ধতার পুরোনো অস্ত্র শান দেওয়া শুরু করে একটি মহল। যুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত দেশে যুদ্ধফেরত তরুণদের বিভ্রান্ত করতে থাকে সুবিধাভোগী অসাধু শ্রেণি। দুর্নীতি সর্বক্ষেত্রে প্রবল হয়ে দেখা দেয়। তাই তো ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে বলতে হয় :'সরকারি আইন করে কোনোদিন দুর্নীতিবাজদের দূর করা সম্ভব নয়, জনগণের সমর্থন ছাড়া। আজকে আমার একটিমাত্র অনুরোধ আছে আপনাদের কাছে। আমি বলেছিলাম- ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে শত্রুর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলব বাংলার জনগণকে- এক নম্ব্বর কাজ হবে দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করা।'

স্বাধীনতার পর বড় ধাক্কাটা আসে ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে। চরম অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয় দেশকে। এ সময় জাতীয় কর্তব্য পালনে আমরা কলম ধরতে দেখি আমাদের ইতিহাস-সচেতন লেখকদের। একে একে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র যখন ক্ষমতায় চলে আসে, তখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যান লেখকরা।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারত থেকে পাকিস্তান ঔপনিবেশিক বাংলা; ভাষা আন্দোলন থেকে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং ৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশে স্বাধীনতার রূপকার বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার প্রশ্নে ইসলামী মৌলবাদী শক্তির চোখরাঙানি। এই রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহাসিক কালক্রমে আমাদের লেখকদের আনন্দে কেবল উচ্চমার্গীয় শিল্ক সৃষ্টির অভিপ্রায় নিয়ে সাহিত্যচর্চার সুযোগ কখনোই ছিল না। লেখক-শিল্পীদের সামাজিক দায় প্রসঙ্গে তাই ইউরোপীয় লেখক-তাত্ত্বিকদের কথা টেনে এনে এখানে যারা আমাদের গল্প-কবিতাকে শুধু নন্দনতাত্ত্বিক জায়গা থেকে পাঠ করতে চান; তাদের পাঠ যেমন খণ্ডিত তেমন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমাদের অস্ত্রের যুদ্ধ সমাপ্ত হলেও সাংস্কৃতিক যুদ্ধটা এখনও চলমান। আমাদের মূলধারার সাহিত্য যে প্রগতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিনিধিত্ব করছে, সেটা প্রতিনিয়ত একটা অদৃশ্য যুদ্ধের মধ্য দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে।


আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শেষ করে নব্বইয়ের দশকে এসে ইসলামী মৌলবাদবিরোধী যুদ্ধটা আরও তীব্র হয়েছে। এই যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে আমাদের লেখকরা বারবার ফিরে গেছেন মুক্তিযুদ্ধে। সত্তর ও আশির দশকের সাহিত্যে এই কারণে মুক্তিযুদ্ধ ঘুরেফিরে আসতে থাকে। কখনও সরাসরি যুদ্ধের গল্প, কখনও যুদ্ধকালীন সংকটের গল্প, কখনও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে যুদ্ধের স্মৃতি-আক্রান্ত মানুষের গল্প। যুদ্ধে যারা হারিয়েছে সংসার কিংবা প্রিয় মানুষ তাদের আমৃত্যু বয়ে বেড়ানো ক্ষত বারবার উঠে আসে সাহিত্যে।
আশির দশকের শেষদিকে এসে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের কেন্দ্রীয় চরিত্রে চলে আসতে থাকেন যুদ্ধাক্রান্ত নারীরা। বাংলাদেশের সাহিত্যে যে কলকাতার বাংলা সাহিত্যের মতো দেশভাগ নিয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক বড় কাজ হয়নি; এর কারণ আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ- একটা রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। এই ইতিহাস আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নে এমন করে নাড়িয়ে দিয়েছে যে, দেশভাগের স্মৃতি যাপন করার মতো অবকাশ আমাদের লেখকদের খুব বেশি মেলেনি।

এর পর আমরা দেখি, নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশের সাহিত্য গণমুখী চেতনা থেকে সরে এসে ব্যক্তিমুখী হতে থাকে। কারণ স্বাধীনতার এ পর্যায়ে এসে দেশে সমষ্টির মতোই গুরুত্বপূূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিসত্তা। ব্যক্তি তখন তার অধিকার নিয়ে জেগে উঠতে শুরু করেছে। দলে দলে মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, শহরমুখী হচ্ছে। আর তার ঝটকা গিয়ে লাগছে গ্রামগুলোতে। রাষ্ট্রের সঙ্গে, আমলাতন্ত্রের জটিলতার সঙ্গে নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে ব্যক্তি। অন্যদিকে দেশে একটা নব্য শ্রেণি গড়ে উঠছে। তাদের হাত ধরে গড়ে উঠছে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা। পুঁজির অসুস্থ বিকাশের ফলে মধ্যবিত্তের হিসাবনিকাশটা যাচ্ছে বদলে। এই সংকটের প্রভাব গিয়ে পড়ছে সাহিত্যে। এর পর থেকে সাহিত্য ক্রমেই দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে। নব্বই দশকের কবিতা পাঠ করলে আমরা দেখব, অন্যান্য যে কোনো দশকের চেয়ে এই সময়ের কবিতা বিমূর্ত ও অস্পষ্ট। কথাসাহিত্যেও আশির দশক থেকে শুরু করে নব্বই দশকে আমরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, নাসরীন জাহান, মামুন হুসাইন, শাহাদুজ্জামানের মতো লেখককে পাই, যারা প্রচলিত আখ্যানরীতি থেকে সরে এসে নতুন ধরনের ন্যারেটিভের সন্ধান করেন। শূন্য দশকে এসে তারা তরুণ লেখকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এক দল নতুন লেখকের আবির্ভাব ঘটে, যারা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, রাবেয়া খাতুন, হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, শওকত ওসমান, রিজিয়া রহমান প্রমুখ লেখকের প্রভাব কাটিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও শহীদুল জহির দ্বারা প্রভাবিত হন। কবিতার ক্ষেত্রেও শূন্য দশকের কবিরা ষাটের দশকের কবিতার গণমুখী প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কবিতাকে আরও বেশি ব্যক্তিগত, একই সঙ্গে নৈর্ব্যক্তিক করে তুলতে চান এ সময়ের কবিরা। সব মিলে নব্বইয়ের দশকে আমাদের সাহিত্যে 'ট্রানজিশনাল' কাল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। শূন্য এবং দ্বিতীয় দশকে এসে তারই ছাপ পড়েছে বেশি। মিডিয়া ও প্রযুক্তির 'আগ্রাসনতুল্য' সর্বব্যাপী উত্থান এই সময়ের ঘটনা। এবং এই সময়ের সাহিত্যে সেই প্রভাবটা সবচেয়ে বেশি।

সাহিত্যের ধর্মই পরিবর্তনের সঙ্গে থাকা; সেটা পৃথিবীর যে কোনো দেশের সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমানভাবে খাটে। তবে বাংলাদেশের সাহিত্য যে রাজনৈতিক সংগ্রাম, ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতন এবং সামাজিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, তার নজির সাম্প্রতিক বিশ্বে বিরল। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সাহিত্যের 'ইউনিক কন্টেন্ট'। আমাদের বাউল ও লোকায়ত সংস্কৃতি এবং লোকজ সাহিত্যের ধারা পৃথিবীর আর কোনো দেশের সঙ্গে মেলে না। কিন্তু আফসোসের বিষয়, আমাদের সাহিত্য বিশ্বে কোনো পরিচিতি অর্জন করতে পারেনি। গত শতকের ষাটের দশক থেকেই লাতিন সাহিত্য বিশ্বে ব্যাপকভাবে চর্চিত হচ্ছে। আর্জেন্টিনা থেকে হোর্হে লুইস বোর্হেস ও কোর্তাসার, কিউবা থেকে আলেহো কার্পেন্তিয়ের, উরুগুয়ে থেকে হুয়ান কার্লোস ওনেত্তি, ব্রাজিল থেকে জর্জ আমাদো, মেক্সিকো থেকে হুয়ান রুলফো ও ফুয়েন্তেস, পেরু থেকে মারিও বার্গাস য়্যওসা, চিলি থেকে রবার্তো বোলান্‌ঞ এবং কলম্ব্বিয়া থেকে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মতো লেখককে বিশ্বসাহিত্য পেয়েছে। আফ্রিকাও পিছিয়ে নেই। নাইজেরিয়া থেকে চিনুয়া আচেবে-বেন ওকরি-চিমামান্দা আদিচি, ঘানা থেকে আমা আতা আইদু, কেনিয়া থেকে নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো, সোমালিয়া থেকে নুরুদ্দিন ফারাহ প্রমুখ লেখক স্বজাতি ও স্বভূমিকে অতিক্রম করে বিশ্বের লেখক হয়ে উঠেছেন। সে তুলনায় বিশ্বসাহিত্যের ম্যাপিংয়ে বাংলাদেশের কোনো স্থান নেই।

গত দুই দশকে আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নানা রকম সামাজিক উন্নয়নমূলক সূচকে বিশ্বের অনেক দেশকে ছাড়িয়ে গেছি। আমাদের দেশে উৎপন্ন পোশাক সারাবিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সময়েও আমাদের সাহিত্যের পরিসর ও পরিধিগত উন্নয়ন তেমন ঘটেনি। বাংলাদেশের আজ যে বিশ্বে পরিচিতি, তার সঙ্গে আমাদের সাহিত্যের পরিচিতি যুক্ত হয়নি। সাংস্কৃতিক প্রভাব ছাড়া অর্থনৈতিক প্রভাব কখনও স্থায়ী হয় না। আমরা যদি আমাদের সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পণ্য হিসেবে তুলে ধরতে পারতাম তাহলে আমাদের সাংস্কৃতিক পণ্যের বাজার সৃষ্টি হতো ইউরোপ-আমেরিকায়।

আমাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রতিভাধর লেখক ও 'ইউনিক কন্টেন্ট' থাকা সত্ত্বেও আমাদের সাহিত্যের বাজার সৃষ্টি করতে কেন পারিনি- এ প্রশ্নের সরল কোনো উত্তর হয় না। আমরা সব সময় বলে থাকি, মানসম্পন্ন অনুবাদের অভাব। এটা একটা কারণ বটে; কিন্তু এটাই সব নয়। মানসম্মত অনুবাদ হলেও সেটি গ্রহণ করতে ইউরোপ বা আমেরিকার বাজার প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি। প্রস্তুত করে তোলার দায়টাও আমাদের। সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, বিশ্বে প্রবাসীর সংখ্যায় পঞ্চম অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। এই প্রবাসীদের একটা বড় অংশ আছে ইউরোপ-আমেরিকায়। কিন্তু প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীদের মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমের পাঠকের সংখ্যা খুব কম। বাংলাদেশি সাহিত্যের বাজার সৃষ্টিতে প্রাথমিক অন্তরায় এটা। ভারত এবং চীন এ ক্ষেত্রে বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে। নেটিভ ইউরোপীয় বা আমেরিকান পাঠকরা বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে না ওঠার কারণ ইংরেজি ভাষায় আমাদের কোনো প্রতিনিধিত্বশীল ডায়াসপোরা লেখক নেই, যার মধ্য দিয়ে আমাদের নেটিভ সাহিত্যের ব্র্যান্ডিং হবে। ভারতের যেমন নাইপল, রুশদি থেকে শুরু করে ঝুম্পা লাহিড়ি, রহিনটন মিস্ত্রি, অরুন্ধতী রায়ের মতো অনেক লেখক আছেন। এমনকি পাকিস্তানও হানিফ কুরাইশি, মহসিন হাবিবের মতো লেখককে পেয়েছে। আফগানিস্তান থেকে উঠে এসেছেন খালেদ হোসাইনি। শ্রীলঙ্কার সাহিত্যের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য একা মাইকেল ওন্ডাৎজেই যথেষ্ট। কানাডায় বসবাসরত এ লেখক দু'বার বুকার পুরস্কার অর্জন করেছেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের ডায়াসপোরা সাহিত্য পিছিয়ে আছে। তৃতীয়ত, সাহিত্যের আন্তর্জাতিকীকরণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের দিক থেকেও আমরা পিছিয়ে। প্রথমত, মানসম্মত অনুবাদ নিশ্চিত করা; এবং দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও বিপণন কাজে আমাদের সরকারি কোনো পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত আমরা দেখিনি। লক্ষ্য করার বিষয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে বৈশ্বিক পরিচিতি; সেটা বাঙালি অনুবাদকদের হাত ধরে আসেনি। রবীন্দ্রনাথের নির্ভরযোগ্য অনুবাদকদের ভেতর আছেন ম্যারিনো রিগন, যিনি বাংলা থেকে সরাসরি ইতালি ভাষায় অনুবাদ করেছেন; ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছেন আঁদ্রে জিদের মতো প্রখ্যাত লেখক, যিনি পরবর্তীকালে নিজেও সাহিত্যে নোবেল পান; স্পেনে আরেক নোবেলজয়ী লেখক হুয়ান রামোন হিমেনেস, আর্জেন্টিনায় ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো, নেদারল্যান্ডসে ফ্রেদেরিক ভন ইডেন, চেক ভাষায় ভিনসেনস লেসনি এবং দুসান জাভিতেল, লাতভিয়াতে কার্লিস ইগল এবং রিচার্ডস রুডিটিস, আরবে মুহাম্মদ সুখরি আয়াদ এবং রুশ ভাষায় এপি নাতুক-ডানিল'চাক। জীবনানন্দ দাশও বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছেন উইলিয়াম রাদিচে, ক্লিনটন বি. সিলি, জো উইন্টারের মতো অনুবাদকের মাধ্যমে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো সরকারই বাংলা ভাষা জানা বিদেশি অনুবাদকদের দিয়ে বাংলাদেশি সাহিত্য অনুবাদের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এ রকম আরও কিছু কারণ আছে আমাদের সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরি না হওয়ার পেছনে। কিন্তু বলার অপেক্ষা রাখে না, সম্ভাবনার দ্বার ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে। এখন সরকারি-বেসরকারিভাবে কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে আমাদের কাজটা আরও সহজ হয়ে উঠবে।

এটা গেল আমাদের সাহিত্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দিক। দেশের মধ্যেও আমাদের সাহিত্য, বিশেষ করে লোকায়ত সংস্কৃতিচর্চার অবস্থাটা ভালো নেই। আমাদের লোকায়ত সংস্কৃতি, বাউল সংগীত, যাত্রাপালা, জারি-সারি, পালা গান প্রভৃতি চর্চার ক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠেছে মৌলবাদী চেতনা। কিন্তু আশার কথা হলো, আমাদের সাহিত্য এ ধরনের যুদ্ধে সব সময় জয়ী হয়েছে।

আমাদের লেখকরা এসব ব্যাপারে সচেতন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকালে আমাদের প্রত্যয় থাকবে সমাজের অন্যান্য নষ্টের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সাহিত্যও লক্ষ্যচ্যুত না হয়ে যায়। শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমেই অসাম্প্রদায়িক মানবিক সমাজ গঠনের বাণী ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। শিল্প-সাহিত্যই পারে বহুস্বর ধারণ করতে। দেশের সরকারকেও অনুধাবন করতে হবে, সাংস্কৃতিক মুক্তি ছাড়া মানবিক মুক্তি সম্ভব নয়। তাই সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রটা আরও সহজ ও অবাধ করে দিতে হবে। লেখকদের উপলব্ধি করতে হবে, তারা রাজনীতির দাস হবেন না; হবেন ক্রিটিক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠায় কোনো আপস চলে না। শিল্প-সাহিত্য প্রতিমুহূর্তে সেটা স্মরণ করিয়ে দেবে রাষ্ট্রকে। আমাদের লেখকদের যুদ্ধটা এখনও চলমান- স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনকালে সেটা আরও একবার স্মরণ করতে চাই।

লেখক
কথাসাহিত্যিক
প্রাবন্ধিক