সরকারের নীতিনির্ধারণে তরুণদের চাহিদাকে প্রাধান্য দিতে হবে। তাদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে আগামী অর্থবছরের বাজেটে। বিশেষত তরুণদের উদ্যোগ এবং তাদের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন করতে হবে।

গতকাল শনিবার 'তারুণ্যের বাজেট' শিরোনামে গোলটেবিল আলোচনায় এমন মতামত দিয়েছেন বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা। দৈনিক সমকাল ও জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল (জেসিআই) ২০২২-২৩ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সামনে রেখে এ আয়োজন করে। রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।

আলোচনায় বিভিন্ন প্রস্তাব প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বাজেট পেশের আগে শেষ পর্যায়ে এ আলোচনা হচ্ছে। তবে বাজেট পেশের পর ও পাসের আগ পর্যন্ত তরুণদের উন্নয়নে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো বিবেচনার সুযোগ আছে। বক্তাদের আলোচনার সূত্র ধরে তিনি বলেন, ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনা সহজ করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্বলতা আছে। এটি হয়তো সংস্কৃতিরই সমস্যা।

বৈঠকের সভাপতি সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, তরুণরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। দেশ গড়ার কাজেও তারা নিয়োজিত। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে তারা বিদেশ থেকে টাকা পাঠাচ্ছে। বাজেটে তাদের জন্য বিশেষ বিবেচনা ন্যায্য দাবি। তরুণদের কেউই যাতে সরকারের উন্নয়ন পদক্ষেপ থেকে বাদ না পড়ে, সে বিবেচনা অগ্রগণ্য হতে হবে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও এ কে খান টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম খান বলেন, সহজে ব্যবসা করার সূচকে উন্নতির জন্য সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। দু-একটি প্রতিষ্ঠানের কারণে ই-কমার্স খাত ইমেজ সংকটে পড়েছে। এই খাত যথেষ্ট সম্ভাবনাময় ও তরুণ উদ্যোক্তারা সম্পৃক্ত। আগামী বাজেটে ই-কমার্স খাতে সরকারের নীতি সহায়তা দেওয়া উচিত।

বিষয়ের ওপর প্রারম্ভিক বক্তব্যে সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট জাফর সাদিক বলেন, দেশের জনসংখ্যার মধ্যে তরুণদের আধিক্য বেশি। সুতরাং বাজেটে তাদের চাহিদার প্রতিফলন থাকা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতির আকারের বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্বের ৪০টি দেশের একটি। অথচ ব্যবসার পরিবেশ কিংবা লজিস্টিকসের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সূচকে এ দেশের অবস্থান একশটি দেশের মধ্যে নেই। এ অবস্থার উন্নতি করলে তা তরুণদের উদ্যোগ নিতে সহায়তা করবে।

বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। জাতীয় সব উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশ্ববাজারে চাহিদার বিবেচনায় তৈরি পোশাকে কৃত্রিম তন্তুর পণ্য উৎপাদনে এখন ব্যাপক হারে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ ধরনের বিনিয়োগে তরুণদের আগ্রহী করতে হবে।

শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান বলেন, খেলাপি ঋণের কারণে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর পুনর্মূলধনীকরণের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। এর পরিবর্তে এ টাকা তরুণদের জন্য তহবিল হিসেবে দেওয়া হলে একদিকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে সরকারের টাকাও ফেরত দেবে।

দৈনিক ইত্তেফাকের পরিচালক তারিন হোসেন বলেন, বাজেট আলোচনায় সাধারণত তরুণ প্রজন্মকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ করোনায় সবচেয়ে বড় অভিঘাত তাদের ওপরই এসেছে। তরুণদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। আগামী বাজেটে গুণগত শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।

জেসিআই বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট নিয়াজ মোর্শেদ এলিট বলেন, তরুণদের বড় একটা অংশের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন। তাদের জন্য বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তরুণদের বিনিয়োগে আগ্রহী করতে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা করার অনুরোধ জানান তিনি।

দারাজ বাংলাদেশের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার এ এইচ এম হাসিনুল কুদ্দুস বলেন, করোনাকালের অভিজ্ঞতা বলছে, ই-কমার্সের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এ খাতে নূ্যনতম কর হিসেবে এখন শূন্য দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ কর ধার্য রয়েছে। ই-কমার্সের বিকাশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আপাতত এ হার শূন্য দশমিক ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন তিনি। অনলাইন কেনাকাটায় ভ্যাট চালান সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনেও জটিলতায় আছেন তাঁরা। এ ধরনের ডকুমেন্টেশন অনলাইনে সংরক্ষণের সুযোগ দাবি করেন তিনি।

ফরচুন সুজের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, পোশাকের পরই চামড়া ও চামড়াপণ্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময়। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের এ খাতে কর্মসংস্থানে নিয়ে আসার সুযোগ আছে। তরুণদের সুযোগ করে দিতে হবে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. আশরাফুল হক সিয়াম বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। এ হার দক্ষিণ এশিয়ার গড় বরাদ্দ ৫ দশমিক ৩ শতাংশের অর্ধেকেরও কম। সাধারণ মানুষের কাছে গুণমানসম্পন্ন সেবা পৌঁছাতে এ বরাদ্দ অবশ্যই বাড়াতে হবে।

চাল-ডাল লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক জিয়া আশরাফ বলেন, করোনাকালে মুদিপণ্য সরবরাহে বড় অবদান রেখেছেন তাঁরা। তবে কেউ তাঁদের বিশ্বাস করে না। ব্যাংক ঋণ পেতে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। চাল-ডালের মতো অন্যান্য বিনিয়োগ বিকাশে ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দাবি করেন তিনি।

ক্ল্যাসিক গ্রুপের পরিচালক তাহসিন আজিম সেজান বলেন, তরুণ উদ্যোক্তা বিকাশে ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে স্বল্প সুদে এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সহযোগিতা পাওয়া গেলে তৈরি পোশাকের লজিস্টিকসে বিনিয়োগ করার জন্য অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এগিয়ে আসতে চায়।

যুব উদ্যোক্তাদের জন্য স্বাধীন একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব করেন শপ-আপের পরিচালক রেজা আলী মাহমুদ। আহমেদ ফুডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ আহম্মেদ বলেন, ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার পাশাপাশি বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক সময় লাগছে। রেলের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি। বিএনও লুব্রিকেন্টসের পরিচালক সালাউদ্দিন ইউসূফ শিল্পনীতির সঙ্গে সমন্বয় করে বাজেট প্রণয়নের সুপারিশ করেন। তিনি জ্বালানির দরের ক্ষেত্রে অনুমানযোগ্য নীতি, ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে পণ্য পরিবহনের জন্য আলাদা লেন এবং বিএসটিআইর সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি করেন।

বৈঠক সঞ্চালনা করেন সমকালের বিজনেস এডিটর জাকির হোসেন। জেসিআই ঢাকা উত্তরের প্রেসিডেন্ট শাখাওয়াত হোসেন ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। জেসিআই বাংলাদেশের জেনারেল লিগ্যাল কাউন্সেল ইমরান কাদিরসহ আয়োজক ও পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।