কালমেঘের পিঠে বসে জোরে জোরে ভাটিয়ালি গান গাইতে গাইতে উত্তর দিকে চলেছে কালুয়া। যেদিকে চোখ যায়, পানি আর পানি, প্রবল স্রোত উত্তর থেকে নামছে দক্ষিণে, জায়গায় জায়গায় ভয়ংকর ঘূর্ণাবর্ত, পাক খাওয়া ওই পানির নাগালে পড়লে কালো মেঘসহ সে সরাসরি পৌঁছে যাবে পাতালরাজ্যে। মোষটাও সাহসী, বুদ্ধিমান ও তাগড়া। বড় বড় দু-খানা শিং যেন ধারালো তরবারি। এই তল্লাটের কোনো মোষই কালো মেঘের মুখোমুখি হবার সাহস রাখে না। মোষটাও বোধহয় বুঝে গেছে, ঘাসপাতার খোঁজেই তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দূরে, বন্যার প্রবল দাপট ও তোড়ে এই তল্লাটের গরু-ছাগল-মোষ ও হাঁস-মুরগি কোথায় যে ভেসে গেছে! কালুয়ার গ্রামের প্রায় সব ঘরবাড়িও খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে পানির প্রবল তোড়ে ও ধাক্কায়। তবে, অন্য দু-পাঁচখানা ঘরের মতো কালুয়াদের ছোট ঘরখানা নড়বড়ে অবস্থায় টিকে গিয়েছিলো। চালা-বেড়া আলগা হয়ে গিয়েছিলো। কালো মেঘের মা-বাবা ও একটি বোন- 'কালিরানি' ভেসে গিয়েছিলো। হাঁস-মুরগিও উধাও। চোখের পলকে উঠানে হাঁটু সমান পানি। পানির পাক ও স্রোত যেন গর্জাচ্ছিলো 'সব খাব-সব খাব' বলে। ভয়ংকর সে গর্জন। পাশের গোয়ালে থাকা কালো মেঘ কিন্তু ভেসে যেতে যেতে গলার মোটা দড়ির টানে টিকে গিয়েছিলো- হয়তোবা পানির বিরুদ্ধেও লড়েছিলো ওটা বীরের মতো প্রবল বিক্রমে। কালুয়ার বৃদ্ধ দাদার অতীত অভিজ্ঞতা ভয়ংকর। হাওরপারের বাড়িতেই কাটিয়ে দিয়েছেন বাহাত্তরটা বছর। এ রকম 'হাওর-বন্যা' তিনি তাঁর জীবনে দেখেছেন বহুবার, সংগ্রাম করে টিকে রয়েছেন। তবে, এবারের মতো এত বড় ও প্রলয়ংকরী বন্যা তিনি আগে কোনো দিন দেখেননি। এই দাদাই বছর বছর মাটি কেটে এনে ১০-১৫ বছরে বাড়ির ভিটাটা মাঝারি আকারের একটি টিলা বানিয়ে ফেলেছেন। সেই টিলার ওপরেই ঘরবাড়ি, সেই টিলার মাথায় এখন হাঁটুপানি! অভাবী সংসার কালুয়াদের। কালুয়ার দাদা এই বয়সেও ধান কাটা শ্রমিক। শীতে হাওরে মাছ ধরেন। বাবাও সিজনে সিজনে পেশা বদলান। বড় ভাইটা দূরের উপজেলা সদরে রিকশাভ্যান চালান। ১৩ বছরের কালুয়া গরু-মোষের জন্য ঘাস কাটে, বড়শি দিয়ে মাছ ধরে আর হাওরে হাঁসের পাল চরায়। চলছিল মন্দ না। কিন্তু আগ্রাসী বন্যা এসে সব কিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেছে। অনাহারেই কাটছে দিন। মা-বাবা-বড় ভাই ও দাদা বহু কসরত ও কষ্ট করে গতকাল কিছু ত্রাণসামগ্রী পেয়েছেন। কিন্তু গরু-মোষের জন্য তো কোনো ত্রাণের ব্যবস্থা নেই! অনাহারি কালো মেঘকে নিয়ে তাই আজ সকালে কালুয়া বেরিয়ে পড়েছে- কালো মেঘেরই জন্য ঘাস খুঁজতে। হাওর এখন সাগর। গর্জাচ্ছেও সাগরের মতো। বহুদূরের ভারতের মেঘালয়ের আকাশছোঁয়া পাহাড়গুলোর মাথায় জমে আছে ভয়ংকর রঙের কালো মেঘ। দূরে-নিকটে কিছু কিছু ভাসমান জায়গা- মনে হচ্ছে ছোট ছোট দ্বীপ। মোষটা নাকে ফোঁস ফোঁস আওয়াজ তুলে কালুয়াকে বোঝাচ্ছে- উজানে সাঁতরাতে সাঁতরাতে সে ক্লান্ত খুব, খিদেও লেগেছে দারুণ। কালো মেঘের সঙ্গে তার যে বন্ধুর মতো সম্পর্ক। পিঠে চড়ে দূরে দূরে ঘুরে বেড়ায়।

একটা দ্বীপের কাছাকাছি হবার আগেই কালুয়া দেখলো ১০-১২টি মৃত গরু-মোষ ভাসতে ভাসতে আসছে, বন্যার তোড়ে ভেসে যাবার ভয়ে সবগুলো পশুকে বোধহয় মোটা একটি দড়িতেই বেঁধেছিলো ওগুলোর মালিক! ৫-৭টি দেশি শকুন ওই 'মড়ি-ভেলায়' বসে আরামছে খাচ্ছে মাংস। মাথার ওপরে চক্কর দিচ্ছে আরও কিছু শকুন। হাওরের জায়গায় জায়গায় ভাসছে মৃত গরু-ছাগল-কুকুর-মোষের মৃতদেহ। চলে যাচ্ছে দক্ষিণে। মরে ফুলে ওঠা গোদা গোদা ধেনো ইঁদুরও দেখা যাচ্ছে।

দ্বীপটির কিনারে পৌঁছে কালো মেঘ যেন পাগল হয়ে গেলো- প্রচুর ঘাস ও লাতাপাতা দেখে। কালুয়া তাকাতেই দেখে, মোটা একটি হিজল গাছের মোটা মোটা ডালে, যে ডালগুলো বয়ে গেছে মাটির সমান্তরালে, সেই ডালগুলোতে অস্থির ছোটাছুটি করছে ৫টি খ্যাঁকশিয়াল। ওরাও জলবন্দি। অনাহারি। ওগুলোর ভেতরে তিনটি হলো ছানা। সঙ্গে সঙ্গে কালুয়া মোষের দু'খানা শিং ধরে মোচড় দিল, মোষটি প্রবল আপত্তি জানাল- নাকের ডগার ঘাসপাতা রেখে সে কি ফিরতে চায়! তবুও ফিরলো। কিন্তু দ্বিতীয় দ্বীপটায় উঠতে গিয়েও উঠতে পারলো না- মোষটি, এই দ্বীপে জলবন্দি ১০-১২টি বুনো খরগোশ। এভাবে একে একে আরও তিনটি দ্বীপেও নামা গেল না। দুটিতে ১০-১২টি পাতিশিয়াল, অন্যটিতে পাঁচটি ছানাসহ একটি বনবিড়াল।

বারবার ঘাসবঞ্চিত হয়ে মোষটি যেন ক্ষেপে গেলো। অনতিদূরের দ্বীপটিতে কোনো প্রাণী নেই। মোষটি ওখানে উঠে পেটপুরে ঘাসপাতা খেলো। ওখানকার কালজাম গাছটিতে চড়ে পেট পুরে পাকা জাম খেলো কালুয়া, কোমরে বাঁধা গামছায় নিল প্রায় এক কেজি পাকা জাম, পুঁটলি বাঁধলো। এ সময় নজরে পড়লো অনেক মৃত হাঁস-মুরগি ভেসে যাচ্ছে দ্বীপের পাশ দিয়ে। জামের পুঁটলি দ্বীপে রেখে সে ডাইভ দিলো জলে, প্রবল স্রোতের সঙ্গে প্রবল বিক্রমে লড়তে লড়তে দু'হাতে ধরলো সাত-আটটি মৃত হাঁস-মুরগি ও একটি ছাগলছানা। দ্বীপে উঠলো। কালমেঘের পেট ফুলে ধানের গোলা, খেয়েছে মন-প্রাণ ভরে। কালুয়ার ইশারায় পানিতে নামলো আবার। পিঠে চড়লো কালুয়া। একে একে সবগুলো দ্বীপে সে দু-একটি করে হাঁস-মুরগি ছুড়ে মারলো। খরগোশদের জন্য ছুড়ে দিল জামের পুঁটলিটা। মা-বাবা-দাদা ও বড় ভাই গেছে সাত কিলোমিটার দূরের উপজেলা সদরে- ত্রাণের আশায়। হয়তোবা ফিরবেন আজ শূন্য হাতে। এখন তাকেও পৌঁছাতে হবে বাড়ি। মোষটার বিশ্রামের দরকার। নিজের পেটে খিদের কামড় তেমন নেই। আঁজলা ভরে সে পান করলো হাওরের টলটলে জল।

বিষয় : কালো মেঘ

মন্তব্য করুন