কোথায় গেলো রাজরাজড়া, সঙ্গে তাদের ঘোড়া
স্বর্ণরাজি, হর্ম্যপুরী, মাণিক্যতে মোড়া।
এই এখানে ছিলো তারা এই তো নদীর ধারে
পড়ে আছে চিহ্ন কিছু আলো অন্ধকারে
শ্যাওলা পড়া, ভাঙাচোরা, রংচটা এক বাড়ি
ইতিহাসের চিহ্ন যত বুকে লেখা তারই।
ঝোপ জঙ্গল ভরে আছে বাড়ির আশেপাশে
পা রাখতেই দৌড়ালো এক বেজি ঊর্ধ্বশ্বাসে।
কেমন যেন ভূতুড়ে এক স্তব্ধ নীরবতা
সাপের মৃদু চলনে কি কাঁপলো গাছের লতা?
এখানেই তো থাকতো মানুষ সারাটাদিন ভরে
বলতো কত কথা ওরা এ-ঘরে ও-ঘরে।
কত গল্প ঘটনা আর হাসির রিনিঝিনি
এই বাড়িটা সরব করে রাখতো প্রতিদিনই।
দুপুর বেলা ছিলো কত ভোজের আয়োজন
খাবার ঘ্রাণে ম-ম করে উঠত এ প্রাঙ্গণ।
ওদের হাতে ছিলো তখন রাজ্য শাসন ভার
চোখ রাঙানো গর্জনে তার ফুটতো অহংকার।
এখন শুধু ধুলোবালি ইঁদুর ভরা ঘর
মাকড়সারা নিজের জালে হাঁটছে নিরন্তর।
অচেনা দুর্গন্ধে ভরা মলিন কালো মেঝে
মানুষ তো নয় ভূতেরই স্বর উঠলো কোথাও বেজে।
এখানে আর যায় না থাকা এ যে ভূতের বাড়ি
দম বন্ধ হয়ে আসছে পালাই তাড়াতাড়ি।
বেরিয়ে এলাম নদীর ধারে আবছা অন্ধকারে
ঘাসের শিখা ছায়ার মত দুলছে সারে সারে।
ট্রেনের মতো শিষ বাজিয়ে আসছে শীতল হাওয়া
মেঘ তাড়িয়ে গাছ নাড়িয়ে তার হারিয়ে যাওয়া।
অন্ধকারে জ্বলছে নিভছে হাজার জোনাক পোকা
দেখতে দেখতে আমার মনে ভাবনারা দেয় টোকা।
নদীর পাড়ে ঠান্ডা হাওয়ায় দীর্ঘ নিশ্বাস টানি
সন্ধ্যাবেলার অন্ধকারে ঘুমায় নদীর পানি।

যেখানে একদিন ছিলো হায় হাজার মুখের সাড়া
কোথায় তারা হারিয়ে গেছে সকলে নামহারা।
ছিলেন যিনি প্রতাপশালী, দামী পোষাক পরা
ধমক দিতেন প্রাণ কাঁপিয়ে রক্তকে হিম করা।
পৃথিবীকে দাসের মত মনে হতো যার
মাটির নিচে হয়ে আছেন অতল অন্ধকার।
হারিয়ে গেছে দাস-দাসী আর রানী-মহারানী
তাদের কথা কেউ বলে না নেইকো জানাজানি।
ভয় ছড়ানো নিঝুম বাড়ি কোত্থাও নেই কেউ
কেউ দেবে না সাড়া এখন হাজারো ডাকলেও।
আমরা আছি আজকে যারা ব্যস্ত পৃথিবীতে
চাচ্ছি সবাই স্বপ্ন যত পূরণ করে নিতে
দেখছি সকাল দুপুর রাত্রি, দেখছি আবার দিন
হচ্ছে মনে আর কখনো হবো না বিলীন।
নতুন দিনের নতুন আশা জাগছে শুধু মনে
প্রজাপতির মতো এ মন উড়ছে ক্ষণে ক্ষণে।
আলো নিভে হঠাৎ আঁধার নেমে আসার মতো
সামনে থেকে মুছে গেলে দৃশ্য আছে যত
ধুলোর সাথে মিশে গিয়ে যখন হবো ধুলো
থাকবে পড়ে আর কিছুদিন মলিন স্মৃতিগুলো।
ওদের মতোই হয়ে যাবো নাম পরিচয়হীন
সময় যাবে আজকে যেমন যাচ্ছে রাত আর দিন।
এখন সেটা ভাবতে যেন কেমন অবাক লাগে।
সেদিন হবে কেমন ভেবে বিস্ময়ে মন জাগে।
এখন আছি এই তো বেঁচে দেখছি পৃথিবীকে
আঁধার যত নামছে তত আলো হচ্ছে ফিকে।
উঠছে জেগে মালার মতো তারার ফোঁটাগুলো
দিগন্ত পাড় ঘেঁষে ঘেঁষে ভাসছে মেঘের তুলো।
যাচ্ছে মুছে ঐ তো দূরে প্রাচীন বাড়ির ছায়া
থাকলো জেগে আমার মনে একটুখানি মায়া।
আঁধারে ম্লান হয়ে আসা এই তো নদীর পাড়ে
নির্জনতা হাতছানি দেয়, কেবলি মন কাড়ে।
উঠতে হবে তাই তো এবার ক্লান্ত পা-কে টানি
সন্ধ্যাবেলার অন্ধকারে ঘুমায় নদীর পানি।

বিষয় : ছড়া-কবিতা

মন্তব্য করুন