'মহাজন, ফেরিওয়ালাটা করোনায় মইরা গেছে।' চালের আড়তের মালিক কথাটি শুনে হাতপাখা ঘোরানো বন্ধ করলেন। কালো টিনের চালের নিচে কাঠের শক্ত মাচা। মাচার ফ্রেমে ঝোলানো বৈদ্যুতিক পাখা সারাক্ষণ ঘোরে। তবু মহাজনের হাতপাখা মুদ্রাদোষের মতো ঘোরে এবং বদল হয়। কাপড়ের হাতপাখায় ফুলের নকশা।

মৃত্যুর খবর মহাজনকে আমিন হাজির কথা মনে করিয়ে দেয়। আমিন হাজির কাছেই মহাজন শিখেছেন কাফন পরিধানের নিয়ম। আমিন হাজি এখন শয্যাশায়ী। সুস্থ থাকতে প্রায়ই তিনি আড়তে আসতেন, চা খেতেন আর করতেন পক্ষপাতপূর্ণ সালিশ। কিন্তু মৃত্যুর খবর তাঁকে দেবদূত করে দিত। যে অবস্থায় থাকতেন, ছুটে যেতেন। ছুটন্ত আমিন হাজি মহাজনের চোখে আসমানের ফেরেশতা যেন!

হরিরামপুর থেকে দরিদ্র লোকজন মানিকগঞ্জ শহরে আসেন। ফেরি করেন খেলনা ও কসমেটিকস। কেউ পসরা সাজান ডিসি অফিসে সামনে। জজকোর্ট চত্বরে বসেন তিন-চারজন। আমাদের বাড়ির সামনে বরই গাছের নিচে বসেন মজিদ শেখ। গার্লস স্কুল ছুটি হলেই বরই গাছতলায় মজিদ শেখকে ঘিরে মেয়েদের জটলা। বিকেলে বসেন দুধবাজারের সামনের সড়কে। পান চিবোন। মেহেদির মতো লাল পিক ফেলেন।

করোনা শুরু হয়েছে। মানিকগঞ্জ শূন্য! দুধবাজারে ঘোষেরা আসেন না। কামারের চালা নির্জন থাকে। গার্লস স্কুলের গেটে বসে আক্কাস মামা পিঠ চুলকান স্কেল দিয়ে। শহরজুড়ে লকডাউন। মজিদ শেখের খেলনা বিক্রি হয় না। তবু তিনি হাঁটেন। রাস্তায় শোনা যায় তাঁর হাঁক- 'খেলনা নিবেন, খেলনা। লেইস ফিতা নিবেন।'

মহাজন শোনেন, মজিদ শেখ অসুস্থ। স্কুলের বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছেন। ভ্যানচালক মালুর কথায় অবাক হলেন। মজিদ শেখ এতো দ্রুত চলে যাবেন, তিনি ভাবেননি। হাতপাখা নাড়ানো বন্ধ করে, ক্যাশ বাক্সে তালা দিয়ে, মাড় দেওয়া সাদা লুঙ্গিটা পুনরায় গিঁট দিতে দিতে বলেন, 'আড়ত বন্ধ করে দিস, আমি চললাম।'

মজিদ শেখকে দাফন করার লোক পাওয়া যায়নি। জানাজার জন্য ইমাম পাওয়া যায়নি। মহাজন ও ভ্যানচালক কবর খোঁড়েন। দাফন করেন। রাতে ক্লান্ত মহাজন বাড়ি ফেরেন। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলেন, 'আম্মাজানরা, গামছা-লুঙ্গি নিয়ে আসেন।' আমরা তিন বোন দাঁড়িয়ে আমাদের স্নানরত বাবাকে দেখি। ভীরু মানুষের স্রোতে এমন সাহসী মানুষ আর ক'জন আছেন? এমন সাহসী বাবা আর ক'জনার আছে?

চতুর্থ শ্রেণি, এস. কে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকগঞ্জ

বিষয় : গপ্পো আমার বাবা

মন্তব্য করুন