মনিকা খান্না চেয়েছিলেন পাখির মতো উড়তে। সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন একজন দক্ষ পাইলট হওয়ার মাধ্যমে। এরপর বিমানের ককপিটে বসে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্ত। অন্যান্য দিনের মতো রোববারও মনিকা খান্না উড়ছিলেন স্পাইস জেটের এসজি৭২৫ ফ্লাইটটি নিয়ে। কিন্তু মাঝআকাশে পাখির ধাক্কায় আগুন ধরে যায় বিমানের ইঞ্জিনে।

মনিকার কাঁধে তখন বিমানে থাকা ১৮৫ যাত্রীর জীবন রক্ষার গুরু দায়িত্ব। সেই দায়িত্বটা সাফল্যের সঙ্গে পালন করেছেন স্পাইস জেটের এই বৈমানিক। অগ্নি পরীক্ষায় উতরে গিয়ে উড়োজাহাজটিকে পটনায় জরুরি অবতরণ করিয়ে ১৮৫ যাত্রীর জীবন রক্ষা করেন তিনি। আর তাতে ১৮৫ যাত্রীর ত্রাতা বনে যাওয়া মনিকা এখন দু'হাতে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন।

রোববার বিহারের পাটনা বিমানবন্দর থেকে আরোহীদের নিয়ে স্পাইস জেটের ওই বিমানটি দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পর পাখির ধাক্কায় বিমানের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। পাটনা বিমানবন্দর থেকে টেক-অফের পরই বিমানের ডানায় আগুন দেখতে পান স্থানীয়রা। আগুন দেখে তারা বিমানবন্দরে খবর দেন। আর পাইলট মনিকা খান্না বিমানের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই সেটি পাটনা বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করান। তার এমন সাহসিকতাপূর্ণ এবং সময়োচিত সিদ্ধান্তে ১৮৫ যাত্রী অল্পের জন্য বেঁচে যান।

স্পাইস জেটের পাইলট ক্যাপ্টেন মনিকা খান্না। ছবি- ইনস্টাগ্রাম

স্পাইস জেটের কর্মকর্তারা বলেছেন, বিমানের কেবিন ক্রুরা বাম পাশের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যাওয়ার তথ্য জানানোর সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনটি বন্ধ করে দেন মনিকা। এরপর পাটনার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে নিরাপদে বিমানটিকে জরুরি অবতরণ করান তিনি। পরে সব যাত্রীকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয় এবং এতে কেউ আহত হননি।

স্পাইস জেটের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের প্রধান গুরুচরণ অরোরার বরাত দিয়ে ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, মনিকা খান্না ও ফার্স্ট অফিসার বলপ্রীত সিং ভাটিয়া এ ঘটনায় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন। তারা পুরো সময় শান্ত ছিলেন এবং উড়োজাহাজটি ভালোভাবে পরিচালনা করেন। তারা অভিজ্ঞ অফিসার এবং আমরা তাদের জন্য গর্বিত।

কী ঘটেছিল বিমানে?

উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পাইস জেটের ওই বিমানের বাম পাশের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। এটিসির সঙ্গে যোগাযোগের পর ক্যাপ্টেন মনিকা খান্না তাৎক্ষণিকভাবে বিমানের জ্বলতে থাকা ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বিমানের স্টান্ডার্ড প্রক্রিয়া অনুযায়ী, এক চক্কর দেয়ার পর বিমানটি পাটনা বিমানবন্দরের দিকে দ্রুত ফিরে আসে। বোয়িং ৭৩৭ বিমানটি ফিরে আসার সময় কেবল একটি ইঞ্জিন সচল ছিল।

দক্ষ পাইলট হিসেবে বেশ সুখ্যাতি রয়েছে মনিকার। ছবি- ইনস্টাগ্রাম

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রানওয়ের কাছে আসার আগেই বিমানটির ইঞ্জিনে আগুন নিভে যায়। নিরাপদে অবতরণের পর এয়ারলাইন্সের প্রতিনিধি ও বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা করতালি দিয়ে ক্যাপ্টেন মনিকাকে স্বাগত জানান।

বিমান প্রকৌশলীদের মতে, পাখির আঘাতে বিমানটির একটি ফ্যানের ব্লেড ও ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল এভিয়েশন (ডিজিসিএ) বিমানের ইঞ্জিনে আগুন লেগে যাওয়ার এই ঘটনা তদন্ত করছে।

কে এই মনিকা খান্না?

ভারতের কিছু গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, মনিকা খান্না স্পাইসজেট লিমিটেডের অত্যন্ত দক্ষতাসম্পন্ন একজন পাইলট। ২০১৮ সালে পাইলট হিসেবে স্পাইস জেটে যোগ দেন তিনি। চার বছরের মধ্যে প্রথমবার এমন অভিজ্ঞতা মুখোমুখি হন মনিকা। প্রথমবারেই সাফল্যের সঙ্গে যাত্রীদের প্রাণ বাঁচিয়ে বাজিমাত করেছেন এই নারী বৈমানিক।

ভারতীয় গণমাধ্যম বলছে, মনিকার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, স্পাইস জেটের এই পাইলট ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন। নিত্য-নতুন ফ্যাশন এবং ট্রেন্ডিংয়ের প্রতিও গভীর আগ্রহ আছে তার।

২০১৮ সালে পাইলট হিসেবে স্পাইস জেটে যোগ দেন মনিকা। ছবি- ইনস্টাগ্রাম

জরুরি পরিস্থিতিতে ক্যাপ্টেন মনিকা খান্নার দ্রুত এবং সঠিক পদক্ষেপের ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পায় স্পাইস জেটের ওই বিমান। আর অল্পের জন্য বেঁচে যায় ১৮৫ যাত্রীর প্রাণ।

জানা যায়, পাটনা ভারতের একটি ছোট বিমানবন্দর যার রানওয়ে খুব সংকীর্ণ। বিমানবন্দরের চারপাশে রয়েছে বড় বড় গাছের সারি। এছাড়া রানওয়ের আরেক দিকে রয়েছে রেললাইন। এমন পরিস্থিতিতেও মনিকা অত্যন্ত কৌশলের সঙ্গে বিমানটিকে জরুরি অবতরণ করান।