গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা ট্রলারের পাটাতনে উৎসুক মুখগুলোর চেহারায় কৌতূহল, আতঙ্ক ও রহস্যের ছাপ। কারণ, ওই ট্রলারে দেখা যায় এক নারীকে। টর্চ জ্বেলে চঞ্চল চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন- 'কোন বোটত্থে আইছো? সত্যি করে কও।' রহস্যের জাল বিছিয়ে নির্বিকার মেয়েটি। গত ৭ জুন 'হাওয়া' ছবির এমন একটি ট্রেলার শেয়ার করে সামাজিক মাধ্যমে নন্দিত অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী লেখেন, "আপনাদের আরেকবার বাংলাদেশের সিনেমার চমক দেখাতে চাই।

'হাওয়া' বাংলাদেশের সিনেমাকে বিশ্ব মানচিত্রে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।" এ ছবিতে তিনি যে ভিন্নরূপে হাজির হচ্ছেন এমনই আভাস দিলেন। কিছুক্ষণ পরই তার নিচে পড়তে থাকে ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীর শত শত মন্তব্য। 'আলাদা চরিত্র মানেই চঞ্চল চৌধুরী', 'চঞ্চল মানে নিখুঁত অভিনয়', 'নতুন রূপের নতুন হাসি'- এ রকম নানা মন্তব্যে দর্শক-ভক্তরা তাঁকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। এতেই প্রতীয়মান হয়, দর্শক তাঁর অভিনয় কতটা ভালোবাসেন। সিনেমা ও সিরিজে তাঁর অভিনীত চরিত্রের জন্য অপেক্ষা করেন। প্রকৃত অর্থে এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্র হয়ে উঠতে পারেন ক'জন। তাঁদের সংখ্যা হাতেগোনা। চঞ্চল এমনই এক অভিনেতা, যে কোনো চরিত্রের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন সহজেই। 'মনপুরা'র সোনাই-পরীর সুন্দর, স্নিগ্ধ প্রেমের অমন নিঠুর পরিণতি দর্শকের মনে এক ক্ষত তৈরি করেছিল। তিনিই আবার কখনও হয়ে উঠেছেন শারাফত করিম আয়নার মতো দুর্ধর্ষ চরিত্র। আবার 'দেবী'র মিসির আলী চরিত্রে হয়ে উঠেছিলেন অনন্য।

তাছাড়াও 'মনের মানুষ' বা 'টেলিভিশন'-এর মতো সিনেমাগুলোতে অভিনয় দিয়ে সবার মন জয় করেছেন তিনি। চরিত্র থেকে চরিত্রে- এমন বদল বাংলা চলচ্চিত্র বোধহয় আর কখনও দেখেনি। তাঁর অভিনয়ের দৃষ্টিভঙ্গি, কাজের মান নির্ণয় এবং পর্দায় ভিন্ন রূপে উপস্থাপনই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে।

যেজন্য ছোট বা বড় পর্দা, মডেলিং কিংবা ওয়েব মাধ্যমে অভিনয়- প্রতিটি কাজেই দর্শকের প্রশংসা পেয়েছেন তিনি। চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়া, অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা কঠিন কাজ। যেজন্য চঞ্চল চৌধুরীর কাছে প্রশ্ন ছিল চ্যালেঞ্জিং কাজটি এত সহজে করেন কী করে? "অভিনয়ের সময় চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করার চেষ্টা করি। এটি করতে গিয়ে কখনও কখনও ঘোরের মধ্যে চলে গেছি। সেই ঘোর থেকে বাস্তব জীবনে ফিরে আসার অভিজ্ঞতাও ছিল অন্যরকম। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অন্য এক 'আমি'কে তুলে ধরা এবং তা দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারাই অভিনয়। কাজটা চ্যালেঞ্জিং। চ্যালেঞ্জিং বলে নানা চরিত্রের মধ্য দিয়ে অভিনয় জগতে ভ্রমণ রোমাঞ্চকর। দর্শক যখন ব্যক্তি চঞ্চল চৌধুরীকে খুঁজে না পান তখনই তাঁরা মুগ্ধ হন। যেমন মিসির আলী চরিত্রের কথাই ধরুন। আমার বয়স ষাট না হলেও ওই বয়সী একজন মানুষে রূপান্তর করার সব রকম চেষ্টা ছিল।

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের কালজয়ী চরিত্র মিসির আলী পাঠকের কল্পনার চোখে একেকভাবে ধরা দিয়েছেন। তাই দর্শকের কাছে মিসির আলী রূপে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠা আমার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। সবার আগে নিজেকে বোঝাতে হয়েছে, আমিই মিসির আলী। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ভুলে যেতে হয়েছে নিজেকে। এই যে নিজের কাছে চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা 'দেবী'র আগে ও পরে বহুবার করতে হয়েছে।"

সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত সিনেমা 'পাপপুণ্য'। গিয়াসউদ্দিন সেলিমের এই ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন খোরশেদ চেয়ারম্যানের ভূমিকায়। দেশ ও দেশের বাইরে ছবিটি এখন বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে চলছে।

সর্বশেষ মুক্তি প্রতীক্ষিত মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত 'হাওয়া' ছবি নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
মঞ্চ, টেলিভিশনের প্রিয় মুখ চঞ্চল নাটক, টেলিছবির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের সময় বহুবার ভেঙেছেন নিজেকে। দর্শকনন্দিত এবং একই সঙ্গে ব্যবসা সফল ছবিগুলোর সঙ্গেও জড়িয়ে আছে তাঁর নাম। সব মাধ্যমেই অভিনয়ে সাবলীল এই গুণী অভিনেতা অভিনয় ক্যারিয়ার দুই যুগের বেশি সময় পার করেছেন। অনেকেই তাঁকে বলেন, লম্বা রেসের ঘোড়া।

চঞ্চল চৌধুরী মানেই নতুন কিছু, তাই তো তাঁর নতুন ছবির খবরের জন্য মুখিয়ে থাকেন দর্শক। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "সাধারণত দুই থেকে তিন বছর পর নতুন ছবিতে অভিনয় করি। আমার অভিনীত 'পাপপুণ্য' মুক্তি পেয়েছে বেশিদিন হয়নি। আবার 'হাওয়া' মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। 'হাওয়া'র মুক্তির পর নতুন ছবিতে অভিনয়ের বিষয়ে ভাবব।"

'ওভার দ্য টপ' [ওটিটি] মাধ্যমেও এই অভিনেতা সফলতার প্রমাণ দিয়েছেন। 'তাকদির' ওয়েব সিরিজে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেও সাড়া ফেলেছেন। 'বলি' সিরিজে দেখিয়েছেন অভিনয় মুনশিয়ানা। যেজন্য শুধু দেশেই নয়, ভারতের দর্শকদের কাছেও প্রিয় অভিনেতার নাম চঞ্চল চৌধুরী।