দহনদিনে রবীন্দ্রনাথের গান

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২০   

বিনোদন প্রতিবেদক

সাত সুরের গাঁথুনিতে রবিঠাকুর মিশিয়ে দিয়েছেন প্রতিটি ঋতুর প্রাকৃতিক নির্যাস। যার সুবাদে তার সংগীত হয়ে উঠেছে একেকটি অনবদ্য সৃষ্টি। এই শ্রাবণের বৃষ্টিমুখর দহনদিনেও সংগীতপিপাসুদের তৃষ্ণা নিবারণ করে যাচ্ছে বিশ্বকবির গান। শতক পেরিয়েও প্রতিটি প্রজন্মে কীভাবে তার গান মোহিত করে রেখেছেন তা নিয়ে কথা বলেছেন বরেণ্য তিন শিল্পী। 

'শ্রাবণ মেঘের এই দিন যে কেবল বৃষ্টিমুখর- তা তো নয়, ক্ষণে ক্ষণে উষ্ণ পবনের ঝাপটাও লাগে। এ যেন অবিরাম মেঘ-রোদ্দুরের খেলা। তাই সবুজ পাতায় বৃষ্টির ফোঁটার ছুঁয়ে যাওয়াই নয়, একই সঙ্গে সুরের গাঁথুনিতে কবিগুরু তুলে এনেছেন দহনদিনের চিত্র। সময়ের পরিক্রমা কীভাবে চলছে, তা যেমন প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে জানা যায়, তেমনই জানা যায় রবিঠাকুরের কথা-সুরের মেলবন্ধন থেকে। তাই তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলা হয়, ঋতু সৌন্দর্যের কবি। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটকেই শুধু যতটা নয়, তারচেয়ে বেশি ঋতুবৈচিত্র্যের চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় তার গানে। এ নিয়ে নন্দিত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী পাপিয়া সারোয়ার বলেন, 'আমরা যখন রবীন্দ্রনাথের গানে ঋতুবৈচিত্র্য খুঁজছি, তখন আমাদেরই এক সহপথিক দেখিয়ে দিয়েছিলেন আকাশ-বাতাস, মেঘ, বৃষ্টি, ফুল, পাতা, বৃক্ষসহ প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নব কিছুর যেমন রূপ বদল হয়, তেমনি এই বৈচিত্র্য প্রকাশ পায় আমাদের শৈশব-কৈশোর, যৌবন-বার্ধক্যে। ঋতুর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ একদিকে দেখেছেন, তার কঠোর রূপ, অন্যদিকে দেখেছেন রস-কোমলতা, সৃষ্টির স্নিগ্ধতা। এখানেই রবীন্দ্র সৃষ্টি অনেকের থেকে আলাদা হয়ে গেছে।' তিনি আরও বলেন, 'এই দহনদিনেও দৃশ্যগুলো কত বৈচিত্র্যময় হতে পারে, তা জানা যায় কবিগুরুর গান থেকে।

গানের মধ্য দিয়েই তিনি বলেন, 'নাই রস নাই, দারুণ দাহনবেলা'। দহকালের চিত্র আরও খুঁজে পাওয়া যায়, 'এসো এসো হে তৃষ্ণার জল', 'প্রখর তপন তাপে', 'শুস্কতাপের দৈত্যপুরে দ্বার ভাঙবে বলে', 'হে তাপস তার শুষ্ক কঠোর রূপের গভীর রসে', 'মধ্যদিনের বিজন বাতায়নে'সহ আরও অনেক গানে। কিন্তু দেখার বিষয় হলো, কথার অনবদ্য গাঁথুনি আর সুরের অনিন্দ্য সমাহারে প্রতিটি সৃষ্টি হয়ে উঠেছে অনবদ্য। যেজন্য কবিগুরুর প্রকৃতি পর্বের গানের কদর শত বছর পরেও এতটুকু ম্লান হয়নি। পাপিয়া সারোয়ারের এ কথার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন দেশের আরও দুই নন্দিত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও শামা রহমান। একই সঙ্গে রবীন্দ্র সৃষ্টি প্রকৃতি পর্বের গান নিয়ে যারা বলেছেন আরও কিছু কথা। যা থেকে এটা প্রমাণ হয় যে, রবিঠাকুর মনগড়া কথায় নয়, তার সৃষ্টিতে প্রকৃতিকে তুলে ধরছেন প্রকৃত আদলে। গ্রীষ্মের খা খা রোদ্দুরে প্রকৃতির ভয়াবহতা তুলে ধরতে তিনি লিখেছেন, 'দারুণ অগ্নিবাণে রে/ হৃদয় তৃষ্ণায় হানে রে'। এই গীতিকথায় প্রকৃতির আগুনের বাণ হৃদয়কে কতটা তৃষ্ণায় কাতর করে তোলে- তারই উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে 'চক্ষে আমার তৃষ্ণা/ ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে/ আমি বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন/ সন্তাপে প্রাণ যায় যে পুড়ে'- এই গীতিকথার বৈশাখের এই কঠোর দিনকে যদি আমরা মানবিক বিরহের সাথে তুলনা করি, বৃষ্টিহীনতাকে যদি স্নেহহীনতা বা প্রেমহীনতাকে বুঝি, তাহলে এই গানটি হয়ে উঠতে পারে বিরহ উদযাপনের বা হৃদয়ের ব্যথাকে ব্যক্ত করার মাধ্যম।

গ্রীষ্মের পরে যেভাবে বর্ষার আগমন, ঠিক সেভাবেই জল আর সবুজের সমাহারে চোখে পড়ে বরীন্দ্রনাথের গানে। যেন রুষ্ট, শুকিয়ে থাকা প্রকৃতি স্নান করে সেজে উঠে নতুন রঙে। ঠিক যেন বিরহের পর এক চিলতে আশার বাণী, প্রথম প্রেমের লক্ষণ ধরা দিয়েছে এভাবেই- 'আজি ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে/ জানিনে, জানিনে/ কিছুতে কেন যে মন লাগেনা'। নয়তো এভাবেও মনের কথা প্রকাশ পেয়েছে, ঋতু বদলের হাওয়ার সঙ্গে, 'পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে/ পাগল আমার মন জেগে ওঠে।' একইভাবে শহৎ এসেছে 'এসো শরতের অমল মহিমা/ এসো হে ধীরে/ চিত্ত বিকশিবে চরণ ভীড়ে।' এমন কাব্য-গীতের মধ্য দিয়ে। হেমন্তকে সংগীতপ্রেমীরা নতুন করে অনুভব করেছেন 'হেমন্তে কোন বসন্তেরই বাণী/ পূর্ণ শশী ঐ ঐ ঐ যে দিলো আনি' অন্যান্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। এখানেই শেষ নয়, 'শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন লাগল নাচন/ আমলকির ঐ ডালে ডালে', গীতিকথার মধ্য দিয়ে শীত এবং 'আহা আজি এ বসন্তে, এতো ফুল ফোটে, এতো বাঁশি বাজে, এতে পাখি গায়'সহ অসংখ্য গানের মধ্য দিয়ে সব ঋতু প্রকাশ পেয়েছে নানা রূপে। এই দহনদিনেও সংগীত পূজারিদের পিপাসা মেটাতে কবিগুরুর গান হতে পাবে বড় অবলম্বন- এমনও মন অনেকের।

বিশ্বকবির প্রকৃতি পর্বেও গানের সম্ভার এবং সৃষ্টির মাহাত্ম্য নিয়ে আলোচনা আরও হতে পারে। তবে দেশবরেণ্য তিন শিল্পীর কাছে আমাদের প্রশ্ন ছিল, শতাব্দী পেরিয়েও কীভাবে কবিগুরুর সৃষ্টি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মেও হৃদয় আন্দোলিত করে যাচ্ছে? এর উত্তরে পাপিয়া সারোয়ার বলেন, 'প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্দনা করে যাবে, এটা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। কারণ রবিঠাকুরের অনবদ্য সৃষ্টি তাকে অমর করে রেখেছে। এ কারণে অবাক হই না, শতবর্ষ পরেও তার নাটক, গান, সাহিত্য থেকে শুরু করে যে কোনো বিষয় নিয়ে কাউকে মেতে উঠতে।' রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, 'কবিগুরুর গানের কথা ও সুরে শ্রোতাকে কাছে টানার মন্ত্র আছে।

এরপর পরের পৃষ্ঠায়আরও সহজভাবে বললে, সহজ কথা ও মোলায়েম সুরে বিশ্বকবি তার গানগুলো সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এই সহজ কথার গভীরে সূক্ষ্ণ সূক্ষভাবে তিনি জীবনবোধ তুলে ধরেছেন। 'আমার পরান যাহা চায়, তুমি তাই গো' কিংবা 'ভালোবাসি ভালোবাসি' গানগুলোর কথাই ধরুন, ভালোবাসার কথা এর চেয়ে সহজভাবে কি বলা যায়? কী মধুর তার বলার ভঙ্গি। এতে আকৃষ্ট হবে না কে বলুন? আরেকটি বিষয় হলো, রবীন্দ্রসংগীত স্বরলিপিনির্ভর, যার জন্য এর সুর কখনও বিকৃত হয়নি। হাজার শিল্পীর কণ্ঠে শুনলেও গানের মূল ভাব অপরিবর্তিত থাকে।' বন্যার এ কথার সঙ্গে একমত হয়ে শামা রহমান বলেন, 'রবি ঠাকুর ভাববাদী মানুষ ছিলেন। নির্দিষ্ট কেউ নয়, তিনি গান করেছেন সর্বজনের কথা ভেবে। মানুষের সূক্ষ্ণ অনুভূতি গানের কথা ও সুরে নকশিকাঁথার বুননের মতো তুলে ধরেছেন, যা মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। যে কারণে রবীন্দ্রসংগীতের আবেদন আজও এতটুকু ম্লান হয়নি।'

এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এখনকার তরুণ শিল্পীদের মধ্য রবীন্দ্রচর্চা কতটা চোখে পড়ছে? এর জবাবে পাপিয়া সারোয়ার বলেন, 'তরুণদের অনেকে প্রতিভাবান। তারা মূলধারার গানই গাইছে। এই ধারা থেকে যারা সরে যাচ্ছে, তাদের সংখ্যাও বেশি নয়। তাছাড়া বেশিরভাগ শিল্পী খুব ভালো গান করছে এবং তারা অনেক শিক্ষিত। এই তরুণদের নিয়ে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। আশার কথা শোনা গেছে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কণ্ঠেও। তিনি বলেন, 'রবীন্দ্রসংগীত শেখা ও রবীন্দ্রনাথকে জানার বিষয়ে তরুণদের আগ্রহের কমতি নেই। ভালো শিক্ষক পেলে তারা আগ্রহ ও নিষ্ঠার সঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা করে থাকেন। সম্ভাবনা অনেক আছে। আমরা আশাবাদী, আগামীতে রবীন্দ্রনাথকে বোঝেন, জানেন ও চর্চা করেন এমন অনেক শিল্পী পাব আমরা।' শামা রহমান বলেন, 'রবি ঠাকুরের সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে গান হলো সেই মাধ্যম, যা সহজেই মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ তৈরি করে। মনের গহিনে লুকিয়ে থাকা মানুষের অবয়ব যিনি নিখুঁতভাবে আঁকতে পারেন, অনায়াসে বলতে পারেন সবার মনের কথা, যার অনবদ্য সৃষ্টি ভাবায়-কাঁদায়-হাসায়, পরিভ্রমণ করায় কল্পলোকে; তার প্রেমে না পড়ে থাকা যায় না। তাই তরুণ শিল্পীরা রবীন্দ্রচর্চায় নান্দনিক বিষয় খুঁজে পাওয়ার পাশাপাশি সৃষ্টির মাহাত্ম্য বুঝতে পারবে। তাই শতবর্ষ নয়, সহস্র বছর পরও কবিগুরুর গান মানুষের মনে অনুরণন তুলে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস।'