অমর একুশে চলচ্চিত্র নাটক গানে

ভাষা আন্দোলন ও চলচ্চিত্র

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অনুপম হায়াৎ

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বায়ান্নর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষাকে শিকলমুক্ত করে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তা করতে গিয়ে জন্ম রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের। বায়ান্ন তাই ইতিহাসের পাতায় লেখা একটি অধ্যায় নয়, বাঙালি জাতির মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে তাই যুগ যুগ ধরে লেখা হয়েছে অগণিত গল্প, উপন্যাস, নির্মিত হয়েছে নাটক, চলচ্চিত্র। সৃষ্টি হয়েছে অগণিত গান। যেখানে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, মাতৃভাষার প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসার কথা প্রকাশ পেয়েছে। অমর একুশের সেসব গান, নাটক, চলচ্চিত্র নিয়ে এ আয়োজন।

একুশ আমাদের অহংকার। আমাদের জাতিসত্তার একটি প্রধান অংশ। স্বাধিকার আন্দোলন শুরু হয়েছিল ভাষাকে কেন্দ্র করেই। চূড়ান্ত পরিণতিতে আমরা পেয়েছি স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ভাষা আন্দোলন ঘিরে প্রথম প্রতিবাদ হয় কবিতার মাধ্যমে। পরে গান, প্রবন্ধ, সংকলন, নাটক, চিত্রকর্ম, চলচ্চিত্রসহ নানা মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন উঠে এসেছে। ঠিক ওই সময় ভাষা আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম জহির রায়হান। তিনি প্রথম একুশের পটভূমি বা ভাষা আন্দোলন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন।

 ১৯৫৭ সালে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক এফডিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন বঙ্গবন্ধু ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করার। নির্মাতা ফতেহ লোহানীকে এ ব্যাপারে অনুরোধও করেছিলেন। ১৯৬৫ সালের দিকে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা অনেক কঠিন ব্যাপার ছিল। আইয়ুব খানের রাজত্ব চলছে। চলচ্চিত্র নির্মাণের অনুমোদন পেতেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। বঙ্গবন্ধু জেলে। পূর্ববঙ্গের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাও কথা বলতে গেলে পাকিস্তানি শাসক-শোষকরা জেলে ভরত কিংবা মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করত।

এ অবস্থায় জহির রায়হান 'একুশে ফেব্রুয়ারি' নামেই চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এফডিসিতে সেটা জমাও দিয়েছিলেন। 'সৃজনী' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এটি নির্মিত হওয়ার কথা ছিল। পরে তৎকালীন সরকারের অসহযোগিতার কারণে এটি আলোর মুখ দেখেনি। ওই সময় রাজনৈতিক আন্দোলন তুঙ্গে ছিল। বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণা করেছিলেন। এর পর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটু পরিবেশ অনুকূলে এলো। তখন গণআন্দোলনের পটভূমিতে 'জীবন থেকে নেয়া' নির্মাণ করলেন জহির রায়হান। সেখানে একুশে ফেব্রুয়ারির একটি অংশ রয়েছে। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখা 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানটি ব্যবহূত হয়েছিল ছবিতে।

এতে প্রভাতফেরি, বিভিন্ন সংগঠনের পুষ্পস্তবক অর্পণের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। 'জীবন থেকে নেয়া' মুক্তি পায় ১৯৭০ সালের ১১ এপ্রিল, ঘোষিত নির্দিষ্ট তারিখের একদিন পর। কেননা, তৎকালীন গোটা পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে 'জীবন থেকে নেয়া' একমাত্র চলচ্চিত্র, যাতে সমকালীন গণআন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, রাজনীতি, পুলিশি নির্যাতন, একুশের বিভিন্ন কর্মসূচি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ, একনায়কতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ- ইত্যাদি প্রসঙ্গ ও ঘটনা, পারিবারিক কর্তৃত্বের মেয়েলি লড়াই রূপকের আড়ালে তুলে ধরা হয়েছিল। সেই সঙ্গে ছিল পারিবারিক কর্তৃত্ব, তরুণ-তরুণীর রোমান্স এবং বিয়ের প্রসঙ্গ।

এই চলচ্চিত্রে রাজনৈতিক ঘটনা ও বক্তব্য থাকার কারণে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক সরকার শুটিং পর্বেই এর নির্মাণ কাজ বন্ধের ষড়যন্ত্র, শুটিংকৃত এক্সপোজড ফিল্ম আটকের নির্দেশ, ছবির প্রযোজক-পরিচালক জহির রায়হানকে নানাভাবে হয়রানি, সেন্সর সার্টিফিকেট না দেওয়ার পাঁয়তারা করেছিল। নির্দিষ্ট তারিখে ছবিটি মুক্তি না পাওয়ার কারণে তাৎক্ষণিক সচেতন দর্শক ও জনসাধারণ প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করে। তারা স্লোগান সহকারে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন সিনেমা হল আক্রমণ করে।

এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সামরিক সরকার তখন বাধ্য হয়ে সেন্সর সার্টিফিকেট প্রদান করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভাষা আন্দোলনের মতো একটা বিশাল ঘটনাকে প্রযোজক নির্মাতারাও গুরুত্ব দেননি। এটা দুঃখজনক ব্যাপার। তবে কিছু ছবিতে একুশে উঠেছে। বেশ কিছু প্রামাণ্য চলচ্চিত্র, সরকারিভাবে 'হৃদয়ে একুশ' এবং 'বায়ান্নর মিছিল' নামে একটি ডকুমেন্টারি হয়েছে। আহমদ ছফার 'ওঙ্কার' উপন্যাস অবলম্বনে শহীদুল ইসলাম খোকন 'বাংলা' নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। সর্বশেষ তৌকীর আহমেদের 'ফাগুন হাওয়ায়' একুশ উঠে এসেছে।