দুর্যোগেও সক্রিয় দুর্বৃত্ত!

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

--

বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ ও মহামারি হিসেবে হাজির হওয়া করোনাভাইরাসের বাংলাদেশে উপস্থিতির পর থেকেই মানুষের মাঝে সতর্কতা যতটা বেড়েছে, তারচেয়ে বেশি সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই আতঙ্কিত মানুষ বেশি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করে মজুদ করতে থাকে। একইসঙ্গে করোনা থেকে বাঁচতে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ক্রয় করে মাস্ক ও জীবাণুনাশক তথা হ্যান্ড স্যানিটাইজারও। আমরা দেখেছি, এসব স্বাস্থ্য সামগ্রীর কয়েকগুণ চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে একদল অসাধু ব্যবসায়ী এসবের দাম বৃদ্ধি ও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যনিটাইজারের দাম কিছুটা কমলেও 'না পাওয়া' সংকটের মধ্যেই আমরা দেখছি 'বাজারে নকল স্যানিটাইজার'। এ সংক্রান্ত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে, মালয়েশিয়ার ডলফিন হেলথ কেয়ার কোম্পানির নামে সানজেল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি হচ্ছে। অথচ এটি ওই প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড নয়। পণ্যের গায়ে উৎপাদন ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ নেই, কোন প্রতিষ্ঠান আমদানি করেছে তারও কোনো সিল বা স্টিকার নেই। এমনকি তাতে গায়ে মূল্য লেখা না থাকলেও বিক্রি হচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি দামে। ঢাকার মিরপুর ও তার আশপাশে ঘুরে সমকাল প্রতিবেদক এ ভেজাল স্যানিটাইজারের সন্ধান পান। ওষুধের দোকানগুলোও এটি নিচ্ছে; কারণ এখন চাহিদা রয়েছে। যেখানে দেশি কোম্পানিগুলো চাহিদামতো স্যানিটাইজার দিতে পারছে না, ঠিক সে মোক্ষম সময়েই অসাধু চক্র বিদেশি স্যানিটাইজার বলে নকল পণ্য দিয়ে যেমন মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একইসঙ্গে আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত উভয় দিক থেকেই মানুষের ক্ষতি করছে। সম্প্রতি রাজধানীতে অভিযানে স্যানিটাইজার তৈরির কাঁচামাল আইপিএ বিক্রিতে জালিয়াতি করায় এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা ও অন্য ব্যবসায়ীদের সতর্ক করার বিষয়টিও প্রতিবেদনে এসেছে।
আমাদের জন্য এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের যে, যখনই মানুষের উৎসব, বিপদ কিংবা উপলক্ষে কোনো কিছুর চাহিদা বেড়ে যায়, তখনই তার দাম বেড়ে যায় কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। আর হ্যান্ড স্যানিটাইজারের এই দুঃখজনক অভিজ্ঞতা বলছে- তার নকলও তৈরি হয়ে যায়। অথচ আমরা জানি, বিশ্বের অনেক দেশের অবস্থাই সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে চাহিদা ও উপলক্ষের সময় জিনিসপত্রের দাম কমে যায়। আর বিপদের সময় দাম তো কমেই, এমনকি এ সময় তা বিনামূল্যে প্রদান করতে অনেকেই এগিয়ে আসেন। যদিও ভেজাল স্যানিটাইজার বিক্রির ঘটনা প্রতিবেশী ভারতেও ঘটেছে বলে আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, সেখানে স্যানিটাইজারের নামে বিক্রি হচ্ছে আসবাব পরিস্কারের মাল্টি সারফেস স্প্রে।
বলাবাহুল্য, করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে হ্যান্ড স্যানিটাইজারই সমাধান নয়। বরং চিকিৎসকরা বলছেন, এ থেকে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া অধিক নিরাপদ। এমনকি একেবারে কাপড় ধোয়ার সাবান তার চেয়ে বেশি কার্যকর। তাহলে অধিক দাম দিয়ে কেন স্যানিটাইজার কিনতে দোকানে ভিড় করা? বস্তুত করোনা প্রাদুর্ভাবের আগে স্যানিটাইজার কেউ তেমন ছিনতোও না। মূলত চিকিৎসা ও গবেষণাক্ষেত্রেই এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল। এখন এর ব্যবহার তো বাড়ছেই এমনকি লক্ষণীয় হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী/শিক্ষকরাও অ্যালকোহলনির্ভর হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করেছে। চাহিদা মেটাতে এর উৎপাদন শুরু করেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দেশের একমাত্র ডিস্টিলারি কেরু অ্যান্ড কোং (বাংলাদেশ) লিমিটেডও।
এতসব প্রতিষ্ঠান হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরিতে এগিয়ে আসার পরও ভেজাল ও নকল স্যানিটাইজার বাজারজাতকরণের বিষয়টি মেনে নেওয়ার মতো নয়। সমকাল তার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও নকল পণ্যবিরোধী প্রচারাভিযান চালু করেছে- 'নকল পণ্য কিনবো না, নকল পণ্য বেচবো না'। আমরা আশা করি, এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সজাগ থাকবে। যারা নকল স্যানিটাইজার উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে জড়িত, তাদের বের করে উপযুক্ত শাস্তি দিন। দুর্যোগের এ সময় এমন দুর্বত্তপনা কোনোভাবে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না।