রাজশাহীতে কলেজছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় বাবাকে যেভাবে হাতুড়ি ও রড দিয়ে পিটিয়ে যখম করা হয়েছে, তাতে আমরা হতাশ হলেও বিস্মিত নই। বুধবার রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী হয়েও একজন বাবার অসহায়ত্বই ফুটে উঠছে। যাদের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ দিয়েছেন, তারা ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। তারা এমনই শক্তিশালী যে, থানাও মামলা গ্রহণ করেনি! এলাকাটি থানার আওতাভুক্ত কিনা- এ কূট তর্ক সামনে এনে তিন থানা যেভাবে ভুক্তভোগীকে সেবা দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে, তা আমাদের হতবাক করেছে। রাজশাহী নগরীর মতিহার, চন্দ্রিমা ও রেলওয়ে থানার ওসি প্রত্যেকেই সমকালকে বলেছেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশন এলাকায় যেখানে ভুক্তভোগী হামলার শিকার হয়েছেন, তা তাঁদের থানার বাইরে- এমনটা কীভাবে সম্ভব! তা ছাড়া একজন গুরুতর আহত সেবাপ্রার্থী নিকটবর্তী থানার হলেই কি তাঁকে বিদায় করে দিতে হবে? আমরা মনে করি, ভুক্তভোগীকে নাজুক এ অবস্থায় যেভাবে এক থানা থেকে আরেক থানায় সেবা না দিয়ে ঘুরানো হয়েছে, তা যে কোনো বিচারে অন্যায়। বলা বাহুল্য, উত্ত্যক্তের ঘটনাগুলোতে ভুক্তভোগী বিচার না পাওয়ায় এমন অপসংস্কৃতি বেড়েই চলেছে।
উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় প্রায়ই প্রতিবাদকারী আক্রান্ত হওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কখনও বাবা, কখনও ভাই, কখনও আত্মীয়স্বজন উত্ত্যক্তকারীদের হামলার শিকার হন। এমনকি প্রতিবাদ করতে গিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। অন্যায় করার পরও উত্ত্যক্তকারীরা কেন এতটা বেপরোয়া- এর কারণ তারা প্রভাবশালী। বিচার না হওয়ার কারণে এরা আরও আশকারা পাচ্ছে।
রাজশাহীর অঘটনও এর ব্যতিক্রম নয়। ভুক্তভোগী নীলমাধব সাহা সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছেন, রাজশাহী মহিলা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ূয়া তাঁর মেয়েকে প্রায় পাঁচ মাস ধরে উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশনে তাঁর স্ত্রীর বিউটি পার্লারে গিয়েও বখাটেরা চাঁদা দাবি করে এবং চাঁদা না দিলে মেয়েকে উঠিয়ে নেওয়ার হুমকি দেয়। এসব বিষয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার কারণেই বখাটেরা তাঁর ওপর রড ও হাতুড়ি নিয়ে হামলা করে। এ ঘটনায় রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতিসহ একাধিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন নীলমাধব। এমন গুরুতর অভিযোগের পরও কেন থানাগুলো মামলা নেয়নি?
আইন নিজ হাতে নিয়ে কারও ওপর হামলা করা ফৌজদারি অপরাধ। একই সঙ্গে উত্ত্যক্ত করাও দণ্ডনীয়। বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ২৯৪ ধারা অনুযায়ী, নারীকে কেউ উত্ত্যক্ত করলে সেই ব্যক্তিকে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় আরও গুরুতর শাস্তির কথা বলা আছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দণ্ডবিধিতে থাকলেও উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় বখাটেরা পার পেয়ে যায়। রাজশাহীর ঘটনায় তিনটি থানার আচরণ এরই বহিঃপ্রকাশ বলে আমাদের ধারণা।
বখাটেদের উত্ত্যক্তের শিকার হতে কোনো বয়সের নারীই রেহাই পাচ্ছে না। তাদের উপদ্রবে নারীরা ভয়ে থাকেন। বখাটেপনার হাত থেকে বাঁচতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ূয়া মেয়ে অনেকের বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধের ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি উত্ত্যক্তে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যার মতো অঘটনও আমাদের দেখতে হয়েছে।
বখাটেদের উৎপাত বন্ধ না হলে নারীর পথচলা সংকীর্ণ হয়ে উঠবে। দেশের বিভিন্ন স্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পথ-ঘাট এবং হাল আমলে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্ত্যক্তের ঘটনা বেড়েই চলেছে। যারা উত্ত্যক্ত করে, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের প্রভাবশালী। সে জন্য অন্যায়ের প্রতিবাদকারীকে উল্টো নিগ্রহের শিকার হতে হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারস্থ হয়েও প্রতিকার পাওয়া যায় না। রাজশাহীর অঘটন যে দুঃখজনক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, তা আর চলতে দেওয়া যায় না। এ অঘটনে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী নীলমাধব সাহার মামলা তিনটির থানার কোনো থানাই কেন গ্রহণ করল না- কর্তৃপক্ষকে তার জবাবদিহি করতেই হবে। এমন সব দুর্বৃত্তপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহযোগিতার হাত না বাড়ালে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? বখাটেরা যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়, তা নিশ্চিত করা চাই।

বিষয় : অপত্য অসহায়ত্ব সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন