আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, আমাদের দেশে ডলারের সংকট তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে ঢাক ঢাক গুড় গুড় করার আর অবকাশ নেই। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ডলারের দাম বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই রিজার্ভের ডলারে হাত দিতে হয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু বিগত কয়েক মাস রেমিট্যান্স আসাও কমে গিয়েছিল। এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল রেমিট্যান্সে। যদিও জুলাই থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ উন্নতির দিকে; এটা টেকসই হয় কিনা, সামনের দুই-তিন মাসে তা বোঝা যাবে। কারণ ইউরোপে যে মূল্যস্ম্ফীতি দেখা দিয়েছে, সে পরিপ্রেক্ষিতে ভোক্তারা খরচ কমিয়ে দিতে পারে। এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রায়।
শুধু ডলার সংকট নয়; দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে স্বস্তিদায়ক অবস্থা ছিল, তা এখন আর নেই। দেশের অর্থনীতির বাইরের কাঠামোটা ঝকমকে রয়ে গেলেও ভেতরটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে; তাতে বাইরের ঝকমকে কাঠামোর পলেস্তারাও নাজুক হয়ে পড়তে পারে। কারণ দেশে সুশাসনের অভাব, স্বজনপ্রীতি, দলবাজি, দুর্নীতি, পাচার ও অপচয়- এসব সমস্যা আগে থেকেই চলছিল। সেগুলোর সমাধান হয়নি। তার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ম্ফীতি। ফলে জনসাধারণের মধ্যে ধিকি ধিকি করে জ্বলা ছাইচাপা অসন্তোষের আগুন এখন শিখা বের করে দিতে পারে।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির এই খারাপ পরিস্থিতিও হয়তো আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব একটা সময়ের ব্যবধানে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে বাজার, ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কর্মদক্ষতা বাড়াতেই হবে। এগুলো দীর্ঘদিন ধরে উপযুক্ত ও সুষ্ঠু তদারকি ছাড়াই চলেছে। যার ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে। যদি আমরা এখনও সতর্ক না হই, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি তো হবেই না; আরও অবনতি হতে পারে। আমাদের দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই খাতের সবকিছু তদারকি করে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং পর্যায়ে 'স্থানীয় সরকার' বা অভ্যন্তরীণ সুশাসনের কর্তৃপক্ষও থাকা জরুরি। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের বেশিরভাগ ব্যাংকে এমন ব্যবস্থা দেখা যায় না।
বাংলাদেশের সামনে উদাহরণ হিসেবে আমরা এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কার কথা বলতে পারি। দীর্ঘদিন দলবাজি, স্বজনপ্রীতি ও সুশাসনে অবহেলার কারণে দেশটি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। মনে রাখতে হবে, শ্রীলঙ্কায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি ব্যাংকিং অর্থনীতিতেও সংকট ছিল। দেশটির স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ সব খাতে কর্মদক্ষতা যদিও উচ্চমানের; গোষ্ঠীতন্ত্রের কারণে ও সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়ায় দেশটি আজকের এই মহাসংকটে পড়েছে। উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এসব লক্ষণ আছে। আবার দক্ষ লোকবলের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। বিপর্যয় দেখা দিলে দক্ষতার অভাব আমাদের জন্য আরও প্রকট হয়ে দেখা দিতে পারে।
চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা বা মন্তব্য আমরা প্রায়শ শুনতে পাই। কিন্তু এই সংকট নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায়ই দেখছি কী করা যায়, পর্যবেক্ষণ করব, দেখব- এ জাতীয় কথাবার্তা বলে। বাস্তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে; আদতেও নিচ্ছে কিনা, জানা যায় না। অথচ তা জনগণকে জানানো উচিত বলে মনে করি। আমাদের দেশের আরেকটি নীতিগত বিষয় যা কাজ করা দরকার, তা হচ্ছে- আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নেই; যদিও তাদের তথ্য জানার অধিকার আছে। এই জায়গাটা আরও সহজ ও সাবলীল করা দরকার।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব বড় একটি সমস্যা। অভিযোগ শোনা যায়, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি), অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) বা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও চেম্বার বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার দেখা যায়, বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম শিথিল হয়ে যায়। এসব সংকট কাটাতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। ইতোমধ্যে অনেক বিলম্ব এবং ক্ষতি দুই-ই হয়েছে। এখনই তাৎক্ষণিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া না হলে ব্যাংকিং খাত দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মধ্যে পড়তে পারে।
ব্যাংক খাত সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধার কথা হচ্ছে, এ জন্য আইন পরিবর্তন কিংবা নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন নেই। আমি মনে করি, যে আইন রয়েছে তা যথেষ্ট শক্তিশালী। এখন ব্যাংকিং খাতের যেসব নিয়ম আছে, সেগুলোর যথাযথ প্রতিপালনে বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয় রোধ, পাচার বন্ধ আর দুর্নীতি দমনে উদ্যোগ নিতে হবে। অর্থ পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ কিছুটা রোধ করা যাবে বলে মনে করি। আগে দেশে খেলাপি ঋণ ২২ হাজার কোটি টাকা ছিল। এখন তা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আবার দেশের টাকা পাচার কারা করে, সেসব তথ্য উদ্ধার করাও কঠিন হতে পারে। মূল বিষয় হচ্ছে সদিচ্ছা। অর্থ পাচার রোধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে।
ওদিকে ডলারের দাম বৃদ্ধি, আমদানি-রপ্তানির নানা অজুহাত দেখিয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর যে কাজটি সরকার করল, তাতে সাধারণ মানুষের জীবনব্যবস্থা, শিল্প-বাণিজ্য সর্বক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যাদের আয় নির্ধারিত, বিশেষত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জীবন অসহনীয় হয়ে যাচ্ছে। খেটে খাওয়া মানুষ এমনিতেই অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করে; সেটা আরও খারাপ হবে। যাদের সঞ্চয় আছে, সঞ্চয় ভেঙে ফেলবে। তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তেলের দাম নিয়ে পদক্ষেপ আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল। এখন দেরি হয়ে গেছে। এটা কিন্তু এখন শুধু জ্বালানি না; উৎপাদন, ব্যাংকিং, বাণিজ্য সব জায়গায় প্রভাব ফেলবে। আবার গ্যাসের দাম এবং ওয়াসা পানির দাম বাড়াবে। এখন দেশের অর্থনীতির অবস্থা যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে; দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
আসলে একটি বাস্তবমুখী অন্তর্বর্তীকালীন, মধ্যবর্তীকালীন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। এটা শুধু জ্বালানি নয়; রপ্তানি, বাণিজ্য সর্বক্ষেত্রের জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। তা না হলে আমাদের চ্যালেঞ্জ আরও প্রকট হবে। এখন শুধু কভিড এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অজুহাত দিলে হবে না; আমাদের নিজস্ব সমস্যাগুলো বহুদিন সমাধান করিনি।
আগেই বলেছি, অর্থের অপচয়, অর্থ পাচার, জবাবদিহির অভাব, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে টাকা ব্যয়- এগুলো কমাতে হবে। মানুষের জীবিকা এবং জীবনব্যবস্থার উন্নয়ন হয় এমন প্রকল্প নিতে হবে। সামাজিক উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মানের দিকে নজর দেওয়া হয়নি এতদিন। প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন নিয়ে ঢালাওভাবে প্রচার হয়েছে; কিন্তু প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে কিনা- তা নিয়ে 'ক্রিটিক্যাল' আলোচনা হয়নি। বিলম্বে হলেও এ ব্যাপারে মুক্ত আলোচনা হওয়া দরকার।
সালেহউদ্দিন আহমেদ: অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর