গত অর্থবছরে (জুনে সমাপ্ত) রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় কমে যাওয়া নিয়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হলেও নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই রেমিট্যান্সে লক্ষণীয় গতি বেড়েছে। জুলাই মাসের ২৮ দিনেই দেশে এসেছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। এই অঙ্ক গত বছরের জুলাই মাসের পুরো সময়ের চেয়েও ৫ শতাংশ বেশি। সাধারণত দুই ঈদের আগে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাড়ে; ঈদের পর কমে যায়। তবে এবার কোরবানির ঈদের আগে যে গতিতে রেমিট্যান্স এসেছে; একই ধারাতে ঈদের পরও রেমিট্যান্স আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩০ জুন ২০২২-২৩ অর্থবছরের নতুন যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, তাতে বলা হয়েছে, রেমিট্যান্স ঊর্ধ্বমুখী হবে এবং চলতি অর্থবছরে গত বছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি আসবে।
আমরা জানি, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা যে কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভরশীল, তার মধ্যে প্রধানতম রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। সরকারি হিসাবে বিশ্বের ১৬৮টি দেশে বাংলাদেশি কর্মী আছেন ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি। তাঁদের ঘাম ও শ্রমে উপার্জিত অর্থ দেশে এলেই একে আমরা প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বলে থাকি। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রমাণ হয়েছে করোনাভাইরাস-সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারির সময়। করোনার পরপর শুরু হওয়া বর্তমান বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক সংকটেও প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্বল।
বিশ্বব্যাংকের মতে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, স্কুল-মাদ্রাসা, মসজিদ, হাসপাতাল স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও এ অর্থ ব্যয় হয়। রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় ৬৩ শতাংশ ব্যয় হয় দৈনন্দিন খরচের খাতে। এতে ওই পরিবারগুলোর দারিদ্র্য দূর হয়। রেমিট্যান্স পাওয়ার পর একটি পরিবারের আয় আগের তুলনায় ৮২ শতাংশ বাড়ে।
অবশ্য সংখ্যাতাত্ত্বিক এসব হিসাব-নিকাশের বিপরীতে যদি বলা হয়, 'বাংলাদেশ প্রবাসীদের কী দিচ্ছে'; তাহলে আমাদের বেশ নিরাশ হতে হয়। সরকারের মতে, ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি প্রবাসীর অধিকার, সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব শ্রমকল্যাণ উইংয়ের। কিন্তু বিশ্বের ১৬৮টি দেশে বাংলাদেশি কর্মীরা গেলেও তাঁদের সুরক্ষা ও অধিকার রক্ষায় ২৬টি দেশের বাংলাদেশ মিশনে শ্রমকল্যাণ উইং আছে মাত্র ২৯টি, যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইতালিতে দুটি করে। সৌদি আরবে ২৩ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের যে দুটি উইং আছে, সেখানে জনবল মাত্র ১২ জন। এত সংখ্যক প্রবাসীর সেবা নিশ্চিত করা ওই ক্ষুদ্র জনবল দিয়ে কীভাবে সম্ভব? আর যেসব দেশে উইং নেই, তাদের জন্য কী হবে?
বিপদগ্রস্ত, দুর্ঘটনাকবলিত, বঞ্চিত প্রবাসীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, নারী কর্মীদের নিগ্রহ থেকে বাঁচানো; লাশ হওয়া বাংলাদেশির অধিকার রক্ষা, ক্ষতিপূরণ আদায়সহ প্রবাসীদের যাবতীয় সমস্যার দেখভাল করাই মূলত শ্রমকল্যাণ উইংয়ের কাজ। কিন্তু প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই এ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশের ইমিগ্রান্ট নাগরিকদের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবেই গণ্য করা হয়। উন্নত সব দেশেও একই অবস্থা। নাগরিক হয়েও যদি তাঁরা তৃতীয় শ্রেণির হন, তাহলে অদক্ষ ও অল্প দক্ষ শ্রমিক কর্মীরা কী সমাদর পান, সহজেই অনুমেয়।
প্রবাসীদের আমরা কাগজ-কলমে অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলি। অথচ প্রায়ই পত্রপত্রিকায় খবর দেখা যায়, নিজের দেশের বিমানবন্দরে প্রবাসী কর্মীদের প্রচণ্ড দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়। হয়রানির শিকার হওয়া তো তাদের নিয়তির লিখন। অন্যদিকে, সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রার এই দুঃসময়ে অনেকে 'ভিআইপি মর্যাদা' নিয়ে খোদ বিমানবন্দর দিয়ে ডলার পাচার করছেন। 
প্রবাসী কর্মীদের সমস্যার কথা লিখে শেষ করা যাবে না। তাঁদের ভোগান্তি যেন শুরু হয় ঘর থেকেই। আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বেশিরভাগ গ্রামের অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত মানুষ। দালালরা প্রবাসজীবনের কষ্টের কথা গোপন করে উচ্চ বেতন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাজের জায়গা, রাজকীয় জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখিয়ে বিদেশ পাঠানোর ফাঁদে ফেলে। তারপর পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, ডাক্তারি পরীক্ষা, ভিসা, ইমিগ্রেশন, স্মার্টকার্ড, বিমান ভাড়া ইত্যাদির কথা বলে সূক্ষ্ণভাবে হাতিয়ে নেয় প্রয়োজনের দ্বিগুণ টাকা। সহজ-সরল এসব মানুষ প্রবাসে গিয়ে দুর্দিন পার করেন।
অনেক সময় বিদেশের কর্মস্থলে অমানবিক অবস্থা সত্ত্বেও বাংলাদেশি শ্রমিক-কর্মীকে বাধ্য হয়ে দাসের জীবন কাটাতে হয়। কারণ বিপুল অর্থ খরচ করে তাঁকে প্রবাসে যেতে হয়েছে, যা তিনি জমি বেচে অথবা এনজিওর উচ্চ সুদের ঋণ করে সংগ্রহ করেছেন। এ অবস্থার অবসান প্রয়োজন।
প্রবাসীদের ভোগান্তি দূর করতে প্রবাসজীবনের শুরু থেকে কাজ করতে হবে। প্রবাস সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ দালালের ফাঁদে না পড়েন। মানব পাচারকারীদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের নির্মূলে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রবাসীদের জন্য পর্যাপ্ত ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের শ্রমশক্তিকে দক্ষ শক্তিতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে কর্মসূচি নিতে হবে। তাদের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ ঠিক রাখতে দক্ষদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিমানবন্দরে আসা-যাওয়ার পথে চরম ভোগান্তি দূর করতে হবে। প্রবাসীদের যাতায়াতে দেশের বিমানবন্দরগুলোয় পৃথক চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাঁরাই আমাদের অর্থনীতির প্রাণ- এ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে- শত প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতির অব্যাহত অগ্রযাত্রা বিশ্ববাসীর কাছে এখন এক অনুপ্রেরণার নাম, যার মূল কারিগর রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। মহামারি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার দুঃসময়ে বাংলাদেশকে উদ্ধারে প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশি ভাইবোনরাই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে মাত্র ১৮ ডলার রেখে গিয়েছিল। আর এখন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে প্রবাসী ও পোশাক কর্মীদেরই সবচেয়ে বড় অবদান। তাই তাঁদের যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া আমাদের কর্তব্য।   
ড. মো. আইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি