সুস্থ, সুন্দর, নির্মল ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিতে বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। পরিবেশকে ভারসাম্যপূর্ণ ও সতেজ রাখতে বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। ইসলাম বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যায় বিশেষভাবে উৎসাহ ও গুরুত্বারোপ করেছে। সবুজ বনায়ন ও বৃক্ষরাজি দিয়ে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীকে সুশোভিত ও অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন। বৃক্ষ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সুরা কাফিরে ৭ ও ৯ আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, 'আমি ভূমিকে বিস্তৃত করেছি ও পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং তাতে নয়নাভিরাম সর্বপ্রকার উদ্ভিদ উদ্‌গত করেছি। আর আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং এর দ্বারা উদ্যান ও পরিপকস্ফ শস্যরাজি উদ্‌গত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয়।'
অন্যত্র সুরা সাজদার ২৭ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, 'তারা কি লক্ষ্য করে না, আমি ঊষর ভূমির ওপর পানি প্রবাহিত করে তার সাহায্যে উদ্‌গত করি শস্য, যা থেকে তাদের গবাদি পশু এবং তারা নিজেরা আহার গ্রহণ করে।
বন ও বন্য পশুপাখি আল্লাহ পাকের অশেষ দান ও প্রাকৃতিক নিয়ামত। রাসুলে পাক (সা.) এগুলো সংরক্ষণের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি মক্কা মুকাররমা ও মদিনা মুনাওয়ারার বিশেষ এলাকাকে সংরক্ষিত বলে ঘোষণা করেছেন। ওই এলাকায় গাছপালা কাটা এবং সেখানে পশুপাখি শিকার করা আজও নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা সুরা রুমের ৪৮ আয়াতে ইরশাদ করেন, 'তিনিই আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন, অতঃপর তা মেঘমালাকে সঞ্চালিত করে। অতঃপর তিনি মেঘমালাকে যেভাবে ইচ্ছা আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তা স্তরে স্তরে রাখেন। এর পর তুমি দেখতে পাও, তার মধ্য থেকে বারিধারা নির্গত হয়। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের ইচ্ছা তা পৌঁছান, তখন তারা আনন্দিত হয়।'
রাসুলে পাক (সা.) বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব অনুধাবন করে নিজ হাতে গাছ লাগিয়েছেন; সাহাবায়ে কেরামকে গাছ লাগাতে ও বাগান করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ব্যক্তিগত ও সামাজিক বনায়নও করেছেন। তিনি বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, 'মানুষ, পাখি বা পশু যখন তাদের আহার্য গ্রহণ করে, তখন তা তার রোপণকারীর পক্ষে একটি সদকা হিসেবে পরিগণিত হয় (বুখারি ও মুসলিম)।' রাসুলে পাক (সা.) বৃক্ষরোপণে গুরুত্বারোপ করে ইরশাদ করেন, 'যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কিয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে, যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি রোপণ করবে (আদাবুল মুফরাদ)।' রাসুলে পাক (সা.) বৃক্ষরোপণের ফজিলত উল্লেখ করে সাহাবাদের উৎসাহ ও নির্দেশনা দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, 'যদি কোনো মুসলমান একটি বৃক্ষরোপণ অথবা কোনো শস্য উৎপাদন করে এবং তা থেকে কোনো মানুষ কিংবা পাখি অথবা পশু ভক্ষণ করে, তবে তা উৎপাদনকারীর জন্য সদকা বা দানস্বরূপ গণ্য হবে (বুখারি)।' রাসুলে পাক (সা.) আরও বলেছেন, 'যে ব্যক্তি কোনো বরইগাছ কাটবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।'
ইমাম আবু দাউদ (রহ.)-কে এ হাদিসের অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'এ হাদিসের বক্তব্য সংক্ষিপ্তত। এর উদ্দেশ্য হলো, যে ব্যক্তি অকারণে বা অন্যায়ভাবে মরুভূমির কোনো বরইগাছ কাটবে, যেখানে পথিক বা কোনো প্রাণী ছায়া গ্রহণ করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন (আবু দাউদ)।'
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, 'মক্কা ও মদিনার মাঝে অবস্থিত একটি বৃক্ষের কাছে যখন তিনি আসতেন, তখন তার নিচে শুয়ে বিশ্রাম করতেন। তিনি বলতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরূপ করতেন।' রাসুলে পাক (সা.)-সহ পরবর্তী ইসলামের সব খলিফা সৈন্যদের প্রতিপক্ষের কোনো গাছপালা বা শস্যক্ষেত্র ধ্বংস না করতে নির্দেশ দিতেন। রাসুলে পাক (সা.) বলতেন, 'তোমরা কোনো বৃক্ষ উৎপাটন করবে না (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক)।' গাছের প্রতিটি পাতা মহান আল্লাহর জিকির করে। সে জিকিরের সওয়াব গাছ রোপণকারীর আমলনামায় লেখা হয়।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা