ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান, আনন্দ-উৎসবসহ সর্বক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহ চান্দ্র তারিখের ওপর নির্ভরশীল। হিজরি সনের সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর তাহজিব-তমদ্দুনও ঐতিহ্যগতভাবে সম্পৃক্ত। মুসলিম উম্মাহর প্রাত্যহিক জীবনে হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম। সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর আবর্তনের সময়কালকে সৌরবর্ষ এবং পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের আবর্তনের সময়কালকে চান্দ্রবর্ষ বলা হয়। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের সুরা আর রাহমানের ৫ আয়াতে এরশাদ করেন, 'আর সূর্য ও চন্দ্র হিসাব নিমিত্তে।'
মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর হিজরতের বছরকে ইসলামী সন গণনার প্রথম বছর ধরা হয়েছে বলে এটি হিজরি সন নামে পরিচিত। হিজরি সন চান্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষ উভয় হিসেবে গণনা করা হয়। হজরত উমর (রা.)-এর খেলাফতের সময় বিস্তৃত ভূখণ্ড ইসলামী খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এ সময় হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) একটি পত্রে হযরত উমরকে (রা.) জানান, আপনি আমাদের কাছে যেসব চিঠি পাঠাচ্ছেন, সেগুলোতে সন-তারিখের উল্লেখ নেই। এতে আমাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অসুবিধা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে খলিফা হজরত উমর (রা.) একটি সন চালুর ব্যাপারে সচেষ্ট হন। তিনি সাহাবায়ে কেরাম ও অন্যান্য শীর্ষ পর্যায়ের জ্ঞানী-গুণীর পরামর্শে হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জুমাদাল উলা মোতাবেক ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হিজরি সন প্রবর্তনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। হিজরতের বছর থেকে সন গণনার পরামর্শ দেন হজরত আলী (রা.)। পবিত্র মহরম মাস থেকে ইসলামী বর্ষ শুরু করার পরামর্শ দেন হজরত উসমান (রা.)। (বুখারি ও আবুদাউদ)।
হিজরি সনের প্রথম মাস মহরম। মহরম শব্দের অর্থ সম্মানিত। ইসলামের ইতিহাসে এ মাসে কতগুলো উল্লেখযোগ্য ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যার সম্মানার্থে এ মাসকে মহরম বা সম্মানিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবার ৩৬ আয়াতে এরশাদ হয়েছে- 'আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা ১২, তার মধ্যে ৪টি মাস (মহরম, রজব, জিলকদ, জিলহজ) সম্মানিত।' হাদিস শরিফে চান্দ্রবর্ষের ১২ মাসের মধ্যে মহরমকে 'শাহরুল্লাহ' বা 'আল্লাহর মাস' বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (তাফসিরে মাজহারি)।
চান্দ্রবর্ষের প্রথম মাসটির পুরো নাম হলো 'মুহররামুল হারাম'। এ মাসের করণীয় আমলগুলো হলো চাঁদের প্রথম রাতে ও দিনে নফল নামাজ। প্রথম ১০ দিন নফল রোজা। বিশেষত ৯ ও ১০ মহরম আশুরার সুন্নত রোজা। আশুরার দিনে ও রাতে নফল ইবাদত করা।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি রাসুলে পাক (সা.)কে রোজা রাখার জন্য এত অধিক আগ্রহী হতে দেখিনি, যতটা দেখেছি এই আশুরার দিন এবং রমজান মাসের রোজার প্রতি।' (বুখারি)। অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে আপন পরিবার-পরিজনের মধ্যে পর্যাপ্ত খানাপিনার ব্যবস্থা করবে; আল্লাহপাক পুরো বছর তার রিজিকে বরকত দান করবেন। (তাবরানি)
অন্য হাদিসে বর্ণিত, হজরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন- এক ব্যক্তি রাসুলে পাক (সা.)-এর দরবারে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা রমজানের পর সবচেয়ে বেশি রোজা রাখব কোন মাসে? তিনি বলেন, তোমরা যদি রমজানের পর কোনো মাসে রোজা রাখতে চাও, তাহলে মহরম মাসে রাখ। কেননা, এটি আল্লাহর মাস। এই মাসে এমন একটি দিন আছে, যেদিন আল্লাহ আগের এক জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং পরবর্তীদের তওবাও কবুল করবেন। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
তাই আমাদের উচিত হবে মহরম মাসের রোজা রাখা, তওবা-ইস্তেগফার পাঠ করা ও অন্যান্য নফল ইবাদত বেশি বেশি আদায় করা। ইসলাম অনুমতি দেয় না এমন কাজ থেকে বিরত থাকাও আমাদের দায়িত্ব। যেমন কান্নাকাটি করা, মাতম-মর্সিয়া করা, শরীরের রক্ত বের করা ইত্যাদি থেকে আমরা বিরত থাকব।
১০ মহরমকে কেন্দ্র করে অতিরঞ্জিত কিছু না করে আমরা চেষ্টা করব হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) সত্য প্রচারের যে আদর্শ রেখে গেছেন, তা যেন সব সময় আঁকড়ে ধরে রাখতে পারি। এর জন্য আমাদের প্রাণপণ চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা