রোববার রাত সাড়ে ১০টা। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে লুকিয়ে চুপি চুপি ঈদের টিকিট বিক্রি করছিলেন রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) হাবিলদার রবিউল হোসেন ও সিপাহি ইমরান হোসেন। তাঁদের এই গোপন কাজে চোখ রেখেছিল র‌্যাবের গোয়েন্দা দল। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। কালোবাজারে টিকিট বিক্রির সময় আরএনবির সেই দুই সদস্য ধরা পড়েন হাতেনাতে। যেন শর্ষের ভেতরেই ভূত! আটকের পর র‌্যাব তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে আরএনবির সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেয়। পরে দু'জনকেই করা হয় সাময়িক বরখাস্ত। টিকিটের কালোবাজারি রোধসহ অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে পালা করে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন আরএনবি সদস্যরা। খোদ আরএনবির কতিপয় সদস্য টিকিট কালোবাজারিতে জড়িয়ে পড়ায় নানা আলোচনার ডালপালা মেলছে।

মাঝে কিছুদিন কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি আবার বেড়েছে। বিভিন্ন সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বন্ধ করা যাচ্ছে না কালোবাজারি। খোদ রেলকর্মীদের যোগসাজশে টিকিট কালোবাজারি হচ্ছে। অনেক রেলকর্মী আবার রাখঢাক না রেখে নিজেরাই টিকিট কালোবাজারিতে জড়াচ্ছেন।

আরএনবির দুই সদস্য হাতেনাতে ধরা পড়ার পর র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ ইউসুফ বলেন, 'ঈদের সময় মানুষ স্বজনের সান্নিধ্যে গ্রামে যান। নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য অনেকেই ট্রেনে করে বাড়ি যেতে চান। তবে চাহিদা অনুযায়ী টিকিট সরবরাহ করতে পারে না রেলওয়ে। রেলের এই 'অক্ষমতা'র সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র টিকিট কালোবাজারিতে নামে। সেখানে নির্ধারিত দামের চেয়ে দ্বিগুণ দরে বিক্রি হয় টিকিট। বিশেষ করে বাড়তি চাহিদা থাকায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ ও চাঁদপুরগামী ট্রেনের টিকিটের একটি অংশ কালোবাজারে চলে যায়। এটা যাতে বন্ধ করা যায় সে জন্য ঈদের সময় র‌্যাবের গোয়েন্দা দল স্টেশনে নজর রাখে। এবার সেই জালে ধরা পড়েন আরএনবির দুই সদস্য। তাঁদের কাছ থেকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী বিভিন্ন ট্রেনের ৯টি টিকিট ও টিকিট বিক্রির ১০ হাজার ৩২০ টাকা উদ্ধার করা হয়।'

আরএনবির সহকারী কমান্ড্যান্ট সত্যজিৎ দাশ জানান, র‌্যাবের হাতে ধরা পড়া দুই সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক রতন কুমার চৌধুরী জানিয়েছেন, আসনের চেয়ে আগ্রহী যাত্রীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ট্রেনের টিকিটের চাহিদাও থাকে বেশ। তবে কালোবাজারি বন্ধে টিকিট বিক্রির সঙ্গে জড়িত বুকিং ক্লার্কসহ সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজরে রাখা হয়। তারপরও কীভাবে টিকিট কালোবাজারে যাচ্ছে তা বোধগম্য হচ্ছে না।

গত ৩০ মার্চ রাতে রেলওয়ে থানা পুলিশের (জিআরপি) হাতে আটক হন ফয়সাল ও মজনু মিয়া নামে দুই টিকিট কালোবাজারি। চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুরগামী সাগরিকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ১৬৫ টাকার একটি টিকিট দ্বিগুণ দামে বিক্রির সময় তাঁদের হাতেনাতে ধরা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে ছয়টি টিকিট উদ্ধার করা হয়। ফয়সাল পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, মজনু মিয়া নামে এক ব্যক্তি তাকে এসব টিকিট দিয়েছে। ফয়সালের তথ্যের ভিত্তিতে সেদিনই গ্রেপ্তার করা হয় মজনুকে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে মজনু জানান, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে পেয়েছেন এসব টিকিট। মূলত রেলের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে টিকিট কালোবাজারে যাচ্ছে। একইদিন কিছু সময়ের ব্যবধানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী তূর্ণা এক্সপ্রেসের আটটি টিকিটসহ গ্রেপ্তার করা হয় রফিকুল ইসলাম নামে একজনকে। জিজ্ঞাসাবাদে তারও একই উত্তর- রেলকর্মীদের মাধ্যমেই তিনি পেয়েছেন টিকিটগুলো।

প্রতি বছরের মতো গত ঈদুল ফিতরেও ট্রেনের টিকিটের চাহিদা ছিল বেশি। সেই ঈদ সামনে রেখে গত ২৯ এপ্রিল রেলস্টেশন এলাকায় কালোবাজারে সাধারণ যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি করছিলেন বিপ্লব কুমার সাহা নামে এক কালোবাজারি। প্রতিটি টিকিট বিক্রি করছিলেন দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি দামে। ওই সময় সেই টিকিট কালোবাজারি বিক্রি করতে গিয়েছিলেন সাদা পোশাকধারী পুলিশ সদস্যের কাছেও। ফলে হাতেনাতে ধরা পড়েন তিনি। বিভিন্ন অন্তঃনগর ট্রেনের বেশকিছু আসনের টিকিট পাওয়া যায় তাঁর কাছে। গত ৯ মার্চ চট্টগ্রাম স্টেশন রোড এলাকা থেকে জাহাঙ্গীর আলম নামে এক টিকিট কালোবাজারিকে গ্রেপ্তার করে সিএমপির গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় তাঁর কাছ থেকে ঢাকাগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনের ২০টি আসনের টিকিট পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, রেলকর্মীদের যোগসাজশেই এসব টিকিট বের করে আনেন টিকিট কালোবাজারি চক্রের সদস্যরা। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশি দামে ট্রেনের টিকিট বিক্রি করে ফায়দা নেন তাঁরা।

বিষয় : টিকিট কালোবাজারে রেলকর্মী

মন্তব্য করুন