ইউক্রেন যুদ্ধ এখনও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম দখল করে আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কা যুদ্ধের ময়দানের বাইরে থাকলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতির এক ধরনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। কয়েক মাস ধরে শ্রীলঙ্কা বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছে। সেখানে অতিমারি ও বৈদেশিক ঋণের কারণে এমনিতেই খারাপ অবস্থা। তার ওপর ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের কারণে খাদ্য, জ্বালানি, রান্নার গ্যাস, ওষুধসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংকট চরমে উঠেছে।
জাতিসংঘের এক জরিপে প্রকাশ, ৭০ শতাংশ শ্রীলঙ্কান পরিবার বলেছে, তারা খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। সেখানে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। জ্বালানি সংকটে সবকিছু স্থবির। সেখানকার সংকট থেকে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ জনবিক্ষোভে রূপ নেয় এবং তা প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসেকে মে মাসে ক্ষমতা থেকে নামতে বাধ্য করে। গত সপ্তাহে চিকিৎসক, হাসপাতালের কর্মচারী, শিক্ষক এবং ব্যাংকাররা জ্বালানি দ্রব্য পেট্রোল কিংবা ডিজেল না পাওয়ায় তাঁদের কাজে ব্যাঘাত ঘটায় শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে বিক্ষোভ করেছেন। রয়টার্সের কাছে শিক্ষক ইউনিয়নের একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেছেন, বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের সহ্যসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে।
শ্রীলঙ্কা স্বাধীন জাতি হিসেবে গত মে মাসে ইতিহাসের প্রথমবারের মতো নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত প্রবীণ রাজনীতিবিদ রনিল বিক্রমাসিংহে দেশটির এই সংকট মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছেন। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারত এবং চীন তাদের সাহায্য করছে। কিন্তু তাঁর সামনে অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করছে। কারণ আমদানির জন্য শ্রীলঙ্কা অর্থ দিতে পারছে না। এ অবস্থায় শ্রীলঙ্কা একটি স্কিম হাতে নিয়েছে। সেটা হলো, সরকারি চাকরিজীবীদের তাঁদের বাড়ির আঙিনায় ফসল ফলানোর জন্য অতিরিক্ত ছুটি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সেখানে পাবলিক সেক্টরে কর্মরত ১৫ লাখ কর্মজীবীকে পাঁচ বছরে বিনা বেতনে ছুটি দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা বিদেশে চাকরি পেতে পারেন কিংবা অভিবাসী হন এবং শ্রীলঙ্কার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন। এ অবস্থায় সেখানকার পাসপোর্ট অফিসগুলোতে প্রচণ্ড ভিড় লেগে আছে। অনলাইনে জমাকৃত আবেদনগুলোও নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক বিশ্নেষক শ্রীলঙ্কার বর্তমান অবস্থাকে ১৯৯০ দশকের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংকটের সঙ্গে তুলনা করছেন। কেউ কেউ বলছেন, শ্রীলঙ্কা হয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়ার লেবানন- একটা ঋণজর্জরিত ও অকার্যকর রাষ্ট্র।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের সঙ্গে সরকারের দায়িত্বশীলদের ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া ১০ দিনের আলোচনা কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে বলেছিলেন, 'অতীতে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আলোচনা করেছি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। আমরা এখন দেউলিয়া রাষ্ট্র হিসেবে আলোচনা করছি। কাজেই আমরা এক কঠিন ও জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আছি।'


অনেক দিক থেকেই শ্রীলঙ্কার সমস্যাটা একেবারে স্বতন্ত্র বা অন্য কারও সঙ্গে তুলনীয় নয়। এটা স্বআরেপিত। তবে এর সঙ্গে বৈশ্বিক অবস্থারও সংযোগ রয়েছে। আমরা দেখছি, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কাকে তা আরও সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের একজন বিশ্নেষক আলান কিনান বলেছেন, 'ইউক্রেন যুদ্ধ না হলেও শ্রীলঙ্কা সংকটের মধ্যে পড়ত। তবে এ যুদ্ধ সংকটকে আরও গভীরতর করেছে। আপনি হয়তো ভেবেছেন, জ্বালানির জন্য যে ঋণ হাতে আছে তাতে দুই মাস চলবে; অথচ এখন দেখা যাচ্ছে এতে মাত্র এক মাস চলছে। এমনকি কোনো বেইল আউট কর্মসূচির সুযোগ পেলেও আপনি আগের চেয়ে অনেক কম খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি কিনতে পারছেন।'
একই ধরনের চাপ অন্যত্রও রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গ্রুপগুলোর একটি যৌথ প্রতিবেদন থেকে অক্সফ্যাম ও সেভ দ্য চিলড্রেন মে মাসে দেখেছে, খরাক্লিষ্ট ইথিওপিয়া, সোমালিয়া ও কেনিয়ায় প্রতি ৪৮ সেকেন্ডে একজন মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ পূর্ব আফ্রিকার কোটি কোটি মানুষের জন্য খাদ্য কেনা অসম্ভব করে দিয়েছে। সংস্থাগুলো এক বিবৃতিতে বলেছে, গত বছরের চেয়ে এখন ওই তিন দেশে অনাহারি মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। গত বছর অনাহারির সংখ্যাটা ছিল ১ কোটি, এখন তা ২ কোটি ৩০ লাখ। তা ছাড়া এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে তাদের ঋণের পরিমাণ তিন গুণের বেশি হয়ে গেছে। ২০১২ সালে যে ঋণ ছিল ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২০ সালে তা ছিল ৬৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে দেশগুলোর পরিষেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাত প্রায় শুকিয়ে গেছে। সংস্থাগুলো অভিযোগ তুলেছে, জি-৭ভুক্ত দেশগুলো এ পরিস্থিতিতে ওদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধের ছুতোয় ওরা গরিব দেশগুলোকে দেওয়া সাহায্যের প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে। ফলে গরিব দেশগুলো দেউলিয়া হওয়ার দিকে এগোচ্ছে।
আসলেই, যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা ইউক্রেন নিয়ে ডুবে আছে। শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো তাদের নজর থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। তবে অন্য অনেক দেশের নেতারা এ নিয়ে চিন্তিত। যেমন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট উইডুডু শ্রীলঙ্কা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে মস্কো ও কিয়েভ সফর করেছেন। উভয় দেশের নেতাদের কাছে তিনি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন, যে যুদ্ধ তাঁদের সার ও শস্য রপ্তানির পথে দেয়াল তুলে দিয়েছে। জাকার্তাভিত্তিক এক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের গবেষক সম্প্রতি নিক্কেই এশিয়াকে বলেছেন, ইন্দোনেশিয়ার প্রথম লক্ষ্য হলো যে কোনো মূল্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করা। দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো, এমন একটা ব্যবস্থা করা যাতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের গম ও সার বিশ্ববাজারে ঢুকতে পারে। এ লক্ষ্যটাই সবচেয়ে সহজে অর্জনযোগ্য বলে করেন ওই বিশ্নেষক।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা এপির সঙ্গে গত মাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিক্ষুব্ধ বিক্রমাসিংহে বলেছেন, যত নিষেধাজ্ঞাই থাকুক, তাঁর দেশ রাশিয়ার জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। তিনি খুব দুঃখভরে দেখিয়েছেন কীভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ তাঁর দেশের অর্থনীতিকে সংকুচিত করে দিয়েছে। তিনি এও বলেছেন, এ সমস্যায় যে শুধু শ্রীলঙ্কাই ভুগবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। তিনি বলেছেন, 'আমি মনে করি এ বছরের শেষদিকেই এ দৃশ্য সবাই দেখতে পাবে। বিশ্বে খাদ্য ঘাটতি চরমে; দেশগুলো কোনো খাদ্য রপ্তানি করছে না।'
ঈশান থারুর: দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের বিদেশবিষয়ক কলামিস্ট। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তর