সরকার ইতোমধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের আর্থিক বিবরণী বা বার্ষিক বাজেট ঘোষণা করে তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকও ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার অত্যাবশ্যকীয় এ দুই নীতি, অর্থাৎ রাজস্ব ও মুদ্রানীতির ওপরেই দেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ভর করছে। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বছরে ছয় মাস অন্তর দু'বার মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও ঘোষণা করত, যার একটি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে, অর্থাৎ জুলাই মাসে এবং অন্যটি জানুয়ারি মাসে। এই নিয়ম থেকে সরে এসে ২০২০-২১ থেকে গত অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বছরে দু'বারের পরিবর্তে একবার মুদ্রানীতি ঘোষণার নিয়ম চালু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মুদ্রানীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে পরবর্তী এক বছরে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রার সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়বে বা কমবে সেই পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরিবর্তিত অর্থ ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য সতর্কতামূলক মুদ্রানীতির ভঙ্গি অনুসরণ করে কিছুটা সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জুনের ৩০ তারিখ ঘোষিত এই মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য- টাকার দাম বাড়িয়ে মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। পাশাপাশি সীমারেখা বা মার্জিন বাড়িয়ে আমদানিতে লাগাম টানা এবং আমদানির বিকল্প পণ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে ডলারের ওপর চাপ কমানো। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও কমানো হয়েছে এই মুদ্রানীতিতে। এসব সত্ত্বেও নতুন অর্থবছরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, এই অর্থবছরে মূল্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, টাকার মান ধরে রাখা, মূল্যস্ম্ফীতি ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সমর্থন অব্যাহত রাখা।

বিগত কয়েক বছর দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতিকে ক্রমাগতভাবে সম্প্রসারণমূলক করেছে। তবে এবার ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুদ্রানীতিকে 'সতর্কতামূলক মুদ্রানীতির ভঙ্গি' অনুসরণে কিছুটা সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বলে অভিহিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, মুদ্রানীতি প্রণয়ন, পর্যালোচনা, সুদ ও বিনিময় হারের নজরদারি শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ হতে পারে না। কিন্তু এটা তো ঠিক, উন্নয়নকে প্রসারিত ও অর্থায়নকে সহজলভ্য করতে হলে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মূলত দুটি বিষয়েই বেশি নজর দিতে হবে। প্রথমত, আর্থিক খাতের দক্ষতা-শৃঙ্খলা আনয়ন। দ্বিতীয়ত, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

সদ্য ঘোষিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পুরো অর্থবছরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কমিয়ে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ করা হয়েছে, আগের মুদ্রানীতিতে যা ছিল ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার হিসেবে পরিচিত রেপো হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। নীতি সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার করতে ব্যাংকগুলোকে এখন বেশি সুদ দিতে হবে, যা মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজে দেবে। এমনিতেই ডলার কিনতে ও ঋণের জন্য ব্যাংকগুলোতে অর্থের টান পড়তে শুরু করেছে। ফলে সুদের হার বাড়ছে। তবে এখনই ঋণের ৯ শতাংশ সুদ ও আমানতের সুদের সীমা তুলে নিতে চাচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ, ব্যাংক ঋণের গড় হার এখনও ৭ শতাংশ। আর আমদানি বিকল্প পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে নতুন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালুর ঘোষণা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। পাশাপাশি বিলাস জাতীয় দ্রব্য, বিদেশি ফল, অশস্য খাদ্যপণ্য, টিনজাত ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ৭৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মার্জিন আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এতে ডলারের ওপর চাপ কমবে; সুরক্ষিত থাকবে রিজার্ভ ও মুদ্রার বিনিময় হার। শেয়ারবাজারের সার্বিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংক আগের মতোই ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন গভর্নর। নতুন মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ। সরকার নতুন অর্থবছরে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এখন দেখার বিষয়, টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়া; রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ; নতুন করে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিজনিত চাপ সামাল দিতে ঘোষিত মুদ্রানীতি কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে।

কভিড অভিঘাত কাটিয়ে ওঠার পরিক্রমায় এবং নতুন করে শীতল যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখন শুধু মুদ্রানীতি আর আর্থিক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে হবে না। কৃষক-শ্রমিকের কথা আগে ভাবতে হবে। ব্যক্তি খাতের ভালো শিল্পকে এগিয়ে নিতে নির্মোহভাবে কাজ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন অবশ্যই প্রয়োজন। স্বায়ত্তশাসন নিয়ে স্বাধীনতার দিকে গেলে চলবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা চিহ্নিত করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিলেই কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে গিয়ে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাকে ক্রমাগত সহায়তা করা; ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালীভাবে নজরদারি এবং ব্যাংকের অর্থ যেন সত্যিকার উদ্যোক্তা ও কৃষক-শ্রমিকের জন্য সহজলভ্য হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকিং খাত যেন উন্নত প্রযুক্তি ও সেবা প্রদানের মানসে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে কাজ করে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, যে কোনো মুদ্রানীতির যথাযথ কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন নির্ভর করে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের উন্নয়ন স্তর, এর দক্ষতা ও বিরাজমান সুশাসনের ওপর। বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতের অপরিকল্পিত বিকাশ ও পরিমাণগত প্রসারণ ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু আর্থিক পণ্য ও সেবার বিকাশ ঘটেনি। তৈরি হয়নি বন্ড মার্কেট। দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের তৈরি হয়নি সেকেন্ডারি মার্কেট। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়নেও সৃষ্টি হয়নি ব্যক্তি খাতের বন্ড ব্যবস্থা। কোনোভাবেই শেয়ারবাজারের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটানো যাচ্ছে না। কভিড-১৯ এর বিপর্যয়কর অভিঘাত থেকে অর্থনীতি সঠিক পথে আনা এবং ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যস্ম্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়নের যে প্রবণতা ও চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংক তার জন্য সঠিক করণীয় নির্ধারণে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করবে, যেখানে সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে দারিদ্র্য, ধরিত্রী, পরিবেশ উপযোগী উন্নয়ন- সেটাই প্রত্যাশা।

ড. মো. আইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি