কোরবানি মুসলিম উম্মার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এ ইবাদতটি শুধু এ উম্মতের মধ্যে নয়, বরং পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্যেও ছিল। কোরবানি শব্দের আভিধানিক অর্থ ত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, নৈকট্য লাভ। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় কোরবানি হলো, জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট জন্তু জবাই করা।
মানবসৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে কোরবানি চলে এসেছে। মহান আল্লাহ সুরা হজের ৩৪ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেন- 'প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কোরবানির একটি পদ্ধতির প্রচলন করেছি, যে জানোয়ার আল্লাহ তাদের দান করেছেন, তার ওপর যেন তারা তাঁর নাম উচ্চারণ করে।' অন্যত্র আল্লাহতায়ালা সুরা আল-কাউসারের ১-২ আয়াতে এরশাদ করেন, 'হে নবী! 'নিশ্চয়ই আমি আপনাকে নিয়ামতপূর্ণ কাওসার দান করেছি। অতএব আপনি আপনার রবের সন্তুষ্টির জন্য সালাত কায়েম করুন ও তাঁর নামে কোরবানি করুন।'
হাদিসে বর্ণিত রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, 'কোরবানির দিনে মানব সন্তানের কোনো নেক আমলই আল্লাহর কাছে তত প্রিয় নয়; যত প্রিয় কোরবানি করা।'
রাসুলে পাক (সা.) মদিনার ১০ বছরের জিন্দেগিতে প্রতি বছর কোরবানি করেছেন। কখনও কোরবানি পরিত্যাগ করেননি, বরং কোরবানি পরিত্যাগকারীদের ওপর অভিসম্পাত করেছেন। হাদিসে বর্ণিত রাসুলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, 'যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে। (সুনানে ইবনে মাজাহ)'
কোরবানির পেছনে আমাদের আদি পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর চরম আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিজের জীবন, পরিবার ও বৃদ্ধ বয়সে পাওয়া প্রাণাধিক পুত্রকে জবাই করার জন্য উদ্যত হয়েছিলেন।
কোরআনের ভাষায়- (ইব্রাহিম বলল) হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একজন সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করো। অতঃপর আমি তাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। তারপর সে যখন তার পিতার সঙ্গে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো, তখন ইব্রাহিম বলল, পুত্র আমার! আমি স্বপ্নে দেখি, তোমাকে আমি জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী, বলো। পুত্র বলল, হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন, তা সম্পাদন করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। যখন তারা উভয়ে আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করল, আর ইব্রাহিম তার পুত্রকে কাত করে শায়িত করে। তখন আমি তাকে বললাম, হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলে। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করে থাকি।
নিশ্চয়ই এ ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে (পুত্র ইসমাইলকে) মুক্ত করলাম এক কোরবানির বিনিময়ে। আর আমি এটা (ঈদুল আজহায় কোরবানি করার রীতি প্রবর্তন করে) পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। (সুরা সাফফাত, আয়াত :১০০-১০৮)
জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত এই তিন দিন যে ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ তোলা রুপার যে কোনো একটির সমপরিমাণ সম্পত্তি; তার জন্য গরু, মহিষ, উট এগুলোর একটা অংশ অথবা ছাগল, দুম্বা এসব পশুর একটি কোরবানি করা ওয়াজিব।
হাদিসে বর্ণিত, সাহাবায়ে কেরাম রাসুলে পাক (সা.)কে জিজ্ঞাসা করলেন, কোরবানি কী? তিনি বললেন, তোমাদের বংশীয় বা রুহানি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আদর্শ। তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, কোরবানি করে আমরা কী পাই, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, প্রতিটি পশমের বদলে একটি নেকি। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
পবিত্র কোরআনের সুরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, 'আল্লাহর কাছে কখনও কোরবানির গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না। বরং তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়াটুকুই পৌঁছায়।'
একজন কোরবানিদাতা এ ঘোষণাই প্রদান করে- 'আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু সবকিছুই সারা জাহানের মালিক আল্লাহতায়ালার জন্য।' (সুরা আনআম, আয়াত :১৬২)
মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে সহিহ নিয়তে যথাযথভাবে পশু কোরবানি করার তৌফিক দান করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা