যখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন আক্রমণের আদেশ দেন, তখন তিনি হয়তো দ্রুত কিয়েভ দখল করে সেখানে তাঁর পছন্দের সরকার বসানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। যেমনটা সোভিয়েত ইউনিয়নের সময়ে আমরা দেখেছি ১৯৫৬ সালে বুদাপেস্টে এবং ১৯৬৮ সালে প্রাগে। তবে এখন সেটা হয়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উন্মত্ততা এখনও আমরা দেখছি এবং কেউ জানে না কখন বা কীভাবে এর সমাপ্তি ঘটবে। এ অবস্থায় উপসংহার টানারও সময় আসেনি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ট্যাঙ্ক যুদ্ধ সমাপ্তির যে কথা বলা হয়েছিল, তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কারণ যুদ্ধ কিয়েভের উত্তর দিক থেকে দোনবাসের পূর্বদিকে গেছে। যুদ্ধের, আমার মতে, এ অবস্থায় অন্তত আটটি শিক্ষা রয়েছে। কিছু পুরোনো, কিছু নতুন।

প্রথমত, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারবিরোধী ব্যবস্থা কাজ করছে। কিন্তু এটি সক্ষমতার চেয়েও বেশি নির্ভর করছে আপেক্ষিক সংকটের ওপর। পশ্চিমাদের থামানো গেলেও তা কেবল একটি পয়েন্টে কাজে লাগছে। ভদ্মাদিমির পুতিনের হুমকি ইউক্রেনে সৈন্য বাহিনী পাঠানো থেকে পশ্চিমা বিশ্বকে নিবৃত্ত করেছে। যদিও তারা যুদ্ধাস্ত্র পাঠিয়েছে বা পাঠাচ্ছে। এটা রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তিমত্তার প্রকাশ নয়, বরং পুতিন যেভাবে ইউক্রেনকে তাঁর জাতীয় স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরতে পেরেছেন, পশ্চিমারা ইউক্রেনকে ততটা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি।

দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাও যুদ্ধ রোধ করতে পারে না। এই শিক্ষা ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক অংশীদারদের এটা দেখা গেছে। তবে এটি জার্মান নীতিনির্ধারকরা অগ্রাহ্য করেছেন। যেমন সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডার আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি করেছিলেন। রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর জার্মানির নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। এর ফলে সম্ভবত প্রত্যাশা করা হয়েছিল, উভয় দিক থেকে বাণিজ্যিক মিত্রতা ভাঙা বুঝি খুব কঠিন হবে। অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা থেকে যখন যুদ্ধটা বড় হয়ে ওঠে, তখন এটি যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে না।

তৃতীয়ত, অসম অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার বিপদ আছে। এতে কম নির্ভরশীল দেশের দ্বারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হওয়ার শঙ্কা থাকে। তবে উভয় দেশ সমানে সমান হলে নির্ভরশীলতার শক্তি খাটানোর শঙ্কা কম থাকে। যেমন রাশিয়া তার যুদ্ধে অর্থায়নের জন্য জ্বালানি রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত অর্থের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইউরোপ জ্বালানির ক্ষেত্রে রাশিয়ার ওপর এতটাই নির্ভরশীল, তারা রাশিয়া থেকে আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারছে না। জ্বালানি বিষয়ে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অবশ্য কিছুটা সমপর্যায়ের। তবে অর্থনীতির বিশ্বে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়া আরও দুর্বল। ভবিষ্যতে এটি রাশিয়ার জন্য আরও খারাপ হতে পারে।


চতুর্থত, নিষেধাজ্ঞা যখন আক্রমণকারীদের জন্য আরও খারাপ ফল বয়ে আনছে, তখন তারা অল্প সময়ে ফল বের করে আনতে পারবে বলে মনে হয় না। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক উইলিয়াম বার্নস, যিনি সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে রাশিয়ায় দায়িত্ব পালন করেন। কথিত আছে, তিনি গত নভেম্বরে ভদ্মাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করে সতর্ক করে নাকি বলেছিলেন, আক্রমণ করে লাভ নেই, এতে নিষেধাজ্ঞা ধেয়ে আসবে। পশ্চিমারা নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে ঐকমত্য বজায় রাখবে কিনা সে ব্যাপারে পুতিন হয়তো সন্দেহ করে থাকবেন। অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পুতিনকে সীমিত সহায়তা দেওয়ার কথা বলেছেন। যদিও তারা রাশিয়ার সঙ্গে 'সীমাহীন' বন্ধুত্বের ঘোষণা দিয়েছে। সম্ভবত চীনের এই ঘোষণার কারণেই মার্কিন দ্বিতীয় নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

পঞ্চমত, যুদ্ধসংঘাতে তথ্য পার্থক্য তৈরি করতে পারে। যেমনটা র‌্যান্ড করপোরেশনের জন আরকিলা দুই দশক আগে তুলে ধরেছেন, আধুনিক যুদ্ধের ফলাফল কেবল কার সেনাবাহিনী বিজয়ী হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে না, একই সঙ্গে 'কার গল্প জিতছে' সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে আমেরিকার সতর্ক গোয়েন্দা তথ্যের প্রকাশ প্রমাণ করেছে, ইউরোপে পুতিনের ভুয়া তথ্যাখ্যান বেশ কার্যকর এবং যখন পূর্বাভাস হিসেবে হামলা পরিচালিত হয়, তখন এটি পশ্চিমা পক্ষগুলোকে ব্যাপক সুবিধা দেয়।

ষষ্ঠত, একই সঙ্গে হার্ড ও সফট পাওয়ার তথা শক্ত ও নরম শক্তি ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যখন কৌশল হিসেবে উদ্বুদ্ধকরণ জবরদস্তির পেছনে থাকলে কাছাকাছি পর্যায়ে কাজ করে, তখন 'সফট পাওয়ার' ব্যাপক পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। স্মার্ট পাওয়ার কিংবা বুদ্ধিমান শক্তি হলো, সেটা যেখানে শক্ত ও নরম উভয় কৌশলই কাজ করে এবং তারা একে অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লাগার পরিবর্তে যুগপৎভাবে কাজ করবে। পুতিন এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন। রাশিয়ার আচরণের কারণে জার্মানি নর্ড স্ট্রিম-২ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প চালুর অনুমোদন বাতিল করে। অথচ গত কয়েক বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটি চাপ দিয়েও বাতিল করতে ব্যর্থ হয়েছিল। বিপরীতে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট সাবেক অভিনেতা ভলোদেমির জেলেনস্কি তাঁর পেশাগত নাটকীয় দক্ষতাকে শানিত করে দেশে তাঁর নিজের ভালো ইমেজ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে তিনি কেবল সমবেদনাই পাননি, একই সঙ্গে 'হার্ড পাওয়ারের' জন্য জরুরি হিসেবে সামরিক অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য জরুরি উপকরণও পেয়েছেন।

সপ্তমত, সাইবার দক্ষতা বা প্রাযুক্তিক সামর্থ্যই মহৌষধ নয়। রাশিয়া অন্তত ২০১৫ সাল থেকে সাইবার অস্ত্র ব্যবহার করে ইউক্রেনের জ্বালানি কেন্দ্রে হামলার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। অনেক বিশ্নেষক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, দেশটির অবকাঠামো ও সরকারের বিরুদ্ধে সাইবার হামলা হলো আক্রমণের সূচনা। যুদ্ধের সময়ে কথিত অনেক সাইবার হামলা হয়েছে। এর কোনোটিই সে অর্থে বিস্তৃত ফল দেয়নি। যখন ভায়াসাত নেটওয়ার্ক হ্যাক হয়েছিল, তখন জেলেনস্কি স্টারলিংক প্রদত্ত ছোট ছোট অনেক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। অধিকন্তু প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ইউক্রেনীয় সাইবার প্রতিরক্ষা উন্নতি লাভ করেছে।

সর্বশেষ, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যেটা সবচেয়ে পুরোনোও বটে তা হলো, যুদ্ধ 'আনপ্রেডিক্টেবল', নিশ্চিত করে এ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। যেমনটা উইলিয়াম শেকসপিয়র ১০ শতকেরও আগে লিখেছেন, একজন নেতার জন্য বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করে যুদ্ধ লাগানো খুব ভয়ঙ্কর। একটি ছোট যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি হলো বিপজ্জনক এক প্রলোভনের মতো। ১৯১৪ সালের আগস্টে ইউরোপীয় নেতারা প্রত্যাশা করেছিলেন, সৈন্যরা ভালো ফল আনবে। বাস্তবে তারা চার বছরের যুদ্ধ এনেছিল এবং চার নেতা তাঁদের সিংহাসন হারান। ২০০৩ সালে ইরাকে আমেরিকার হামলার সময় ওয়াশিংটনে অনেকে তা সহজ কাজ বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল। কিন্তু সে প্রচেষ্টা কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যর্থ হয়ে যায়।

জোসেফ এস. ন্যায়, জুনিয়র: হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ঈষৎ সংক্ষেপে ভাষান্তরিত।