বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির যৌথ উদযাপনের অংশ হিসেবে দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ছোট প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ভারতের মেঘরাজ্য মেঘালয় ভ্রমণ করে। ভূখণ্ডগত ঘনিষ্ঠতার কারণে মেঘালয় নিবিড়ভাবে জড়িত ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। সেখানকার অনিন্দ্যসুন্দর ছোট-বড় পাহাড়ে গড়ে ওঠে শত শত শরণার্থী শিবির। টানানো হয় মুক্তিবাহিনীর তাঁবু। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর স্মৃতিময় সেই জায়গাগুলো ঘুরতে পেরে ১১ নম্বর সেক্টরের বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধারা যেন একাত্তরে ফিরে গিয়েছিলেন।
ইতিহাসের অলিন্দে ঘুরে আসা এই সফরে প্রতিনিধি দলের সামনে আবিস্কৃত হন উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবাদতুল্য স্বাধীনতা সংগ্রামী ইউ তিড়ৎ সিং। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সম্মানে শিলংয়ের রাজ ভবনে আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে মেঘালয়ের রাজ্যপাল শ্রী সত্য পাল মালিক ইতিহাসখ্যাত সেই বীরের ছবি উন্মোচন করেন। আরও চমকিত হই জেনে, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত যুদ্ধ পরিচালনাকারী এই বীরের মৃত্যু ঘটে ঢাকায়, অর্থাৎ বাংলাদেশের মাটিতে।
রাজ ভবনের ওই অনুষ্ঠানের আগে সর্বভারতীয় ইতিহাসেও স্বল্প পরিচিত এই খাসিয়া বীর সম্পর্কে নিতান্তই কম জানা ছিল আমাদের। ইউ তিড়ৎ সিংয়ের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানতে পরবর্তী সময়ে রাজ্যের সরকারি-বেসরকারি প্রকাশনা সংগ্রহ করার চেষ্টা করি আমি। জানতে চেষ্টা করি, ১৯ শতকের এই বীর সেনাপতি কীভাবে শুধু তীর-ধনুক ও বল্লম-তলোয়ার দিয়ে নিজ জনগোষ্ঠীর এক বিশাল মুক্তিবাহিনী গঠন করেন এবং পরাক্রমশালী ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
প্রসঙ্গত, আমাদের ভ্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছিল আরও একটি বড় উপলক্ষ; রাজ্য হিসেবে স্বীকৃত মেঘালয়ের ৫০তম বার্ষিকী। মনে পড়ে, মুক্তিযুদ্ধের সময় মেঘালয় ছিল আসামের প্রশাসনিক সীমানার মধ্যে, যদিও গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজধানী ছিল শিলং। ইউ তিড়ৎ সিং ছিলেন মেঘালয়ের নঙখলো, অর্থাৎ খাসিয়া পাহাড় অঞ্চলের রাজা বা সাংবিধানিক প্রধান। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয়, 'সায়েম'।
পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত ও হত্যার পর এককালের ব্যবসায়ী ইংরেজ ক্রমান্বয়ে আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। ১৮২৬ সালের ইয়ানদাবো চুক্তির পর গোটা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা তাদের করতলে আসে। সে সমর উত্তর-পূর্ব ভারতের গভর্নরের 'এজেন্ট' ছিলেন চতুর ইংরেজ কর্মকর্তা ডেভিড স্কট। তাঁর হাতে অর্পিত ছিল আসামের শিলচর থেকে অধুনা বাংলাদেশের সিলেট, এমনকি সিকিম পর্যন্ত দেখাশোনা করার দায়িত্ব।
ডেভিড স্কট এক সময় উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হন। তিনি গৌহাটি থেকে সিলেট পর্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা করেন। কিন্তু মেঘালয়ের স্বাধীন খাসিয়া রাজা ইউ তিড়ৎ সিংয়ের সম্মতি না পেলে এই সড়ক নির্মাণ সম্ভব ছিল না। অতএব, চতুর ইংরেজ খাসিয়া রাজার কাছে সবিনয়ে রাস্তা তৈরির প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। বললেন, সড়কটি ব্রহ্মপুত্র থেকে সুরমা উপত্যকা পর্যন্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত করবে। তিড়ৎ সিং সভা ডেকে তাঁর জনগণের সম্মতি নিয়ে ১৮২৭ সালে সম্মতি দিলেন। কিন্তু যত দিন গেল, ইংরেজের অসৎ উদ্দেশ্য স্পষ্ট হতে থাকল।


তিড়ৎ সিং দেখলেন, রাস্তা বানানোর কথা বলে ইংরেজ আদপে মেঘালয়ে ঢুকে খাসিয়া জনগোষ্ঠীকে শোষণের পরিকল্পনা করছে। এরই মধ্যে ইংরেজ দপ্তরে কর্মরত একজন বাঙালি কর্মচারী গোপনে ইউ তিড়ৎ সিংকে জানালেন- রাস্তাটি বানানোর প্রক্রিয়ায় স্থানীয়দের ওপর ইংরেজ নতুন কর আরোপ করার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে, তিড়ৎ সিংয়ের নিজস্ব গুপ্তচর বাহিনী জানাল, রাস্তাটি যে কোনোভাবে বানাতে আসামের গৌহাটি থেকে ইংরেজ বাহিনী খাসিয়া পাহাড়ের দিকে আসতে শুরু করেছে। এমন অবস্থায় রাজা আরেকটি বৈঠক ডাকলেন এবং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁর এলাকা থেকে অবিলম্বে ইংরেজদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিড়ৎ সিংয়ের নির্দেশ স্বভাবতই পালিত হলো না। সামরিক অফিসারদের তত্ত্বাবধানে ইংরেজরা জোর করে রাস্তা বানানোর প্রস্তুতি নিতে থাকল।
রাজা তিড়ৎ সিং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। ১৮২৯ সালের ৪ এপ্রিল ইংরেজদের ওপর আক্রমণ চালালেন। সে যুদ্ধে পর্যায়ক্রমে মারা গেল ইংরেজ লে. বেডিংফিল্ড ও লে. বার্লটন। সিলেট ও কামরূপ থেকেও ইংরেজ বাহিনী এগিয়ে এলো। শুরু হলো চার বছরের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। সে যুদ্ধে তীর-ধনুক ও তরবারি-বল্লম নিয়ে খাসিয়া যোদ্ধারা গেরিলা পদ্ধতিতে প্রথমদিকে সফলতা অর্জন করলেও পরের দিকে আর সম্ভব হলো না। আধুনিক মারণাস্ত্র সজ্জিত ইংরেজ বাহিনীর কাছে এক সময় খাসিয়া বাহিনী পরাজিত হলো। অধিনায়ক তিড়ৎ সিং গুরুতর আহত অবস্থায় পাহাড়ের গোপন গুহায় আশ্রয় নিলেন। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় একজনের বিশ্বাসঘাতকতায় তিড়ৎ সিং বন্দি হলেন। তারিখ ৯ জানুয়ারি, ১৮৩৩।
উপনিবেশবিরোধী খাসিয়া পাহাড়ের আঞ্চলিক স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে যথেষ্ট গবেষণা বা তথ্যানুসন্ধান হয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে। সেই গবেষণার সূত্র ধরে জানা যায়, ১৮৩৩ সালের ৯ জানুয়ারি বন্দি হওয়ার পর রাজা তিড়ৎ সিংকে ইংরেজ বাহিনী প্রথমে গৌহাটি নিয়ে যায় বিচারের জন্য। তারপর একই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁকে 'রাজবন্দি' হিসেবে ঢাকায় স্থানান্তর করে। সে সময়ের কয়েকজন ব্রিটিশ অফিসারের চিঠিপত্র বা নোট ঘেঁটে দেখা যায়, 'রাজবন্দি' তিড়ৎ সিংকে প্রথমে ঢাকার একটি জেলে রাখা হয়। তারপর ঢাকার কোতোয়ালিতে বরকন্দাজের পাহারায় একটি বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। তাদের চিঠিপত্র বা সরকারি নোটে আরও জনা যায়, সে বাড়িটি ছিল পুরান ঢাকার গীরদকিল্লায় (নামটি এভাবেই উল্লেখিত), যার অবস্থান ছিল ঢাকার নবাবদের সুরম্য অট্টালিকার আশপাশে। অর্থাৎ যেখানে বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটির লাইব্রেরি আছে, তার ঠিক কাছাকাছি।
অবশ্য তিড়ৎ সিংকে মেরে ফেলে ইংরেজরা, নাকি তিনি নিছক অসুস্থতার কারণে মৃত্যুবরণ করেন, সে ব্যাপারে পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে খাসিয়া সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, তিড়ৎ সিং ঢাকাতেই পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণ করেন। সে যাই হোক, উত্তর-পূর্ব ভারতের এই কিংবদন্তি স্বাধীনতা যোদ্ধা বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন ১৭ জুলাই ১৮৩৫।
মেঘালয়ের নানা অংশে 'তিড়ৎ সিং মেমোরিয়াল' গড়ে উঠেছে। তিনি খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সাহস ও দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। দিন যতই এগিয়ে যাচ্ছে, তিড়ৎ সিংয়ের জীবন ও সংগ্রাম সংগীত, নৃত্য, কবিতা, নাটকসহ শিল্পকলার সব অঙ্গনে বিস্তৃত হচ্ছে। কলকাতার নাটকের দলগুলোও তিড়ৎ সিংয়ের ওপর নাটক মঞ্চস্থ করছে। মেঘালয়ের মাটিতে প্রতি বছর ১৭ জুলাই 'তিড়ৎ সিং দিবস' যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর নামে রাজ্য সরকার শিল্পকলা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য পদক প্রবর্তন করেছে।
মেঘালয়ের মান্যবর সচিব ও কমিশনার ফ্রেডেরিক রয় খারকংগর আমাকে জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার এই প্রবাদপ্রতিম খাসিয়া মুক্তিযোদ্ধার বাংলাদেশ-সম্পৃক্ততার ইতিহাস-অধ্যায়টিকে ধরে রাখতে ঢাকায় 'তিড়ৎ সিং স্মৃতিকেন্দ্র' প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী। যে মাটিতে এই বীরের মৃত্যু, সেই ঢাকার সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়াতে চায় আমাদের প্রতিবেশী মেঘালয়।
বস্তুত উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মতো মেঘালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সময়ের দাবি। ২০১৮ সালে ঢাকা সফরে এসেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কোনরাড সাংমা। তিনিও ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংস্কৃতিতে দুই অঞ্চলের গভীর সম্পৃক্ততা কামনা করেছেন।
ব্রিটিশ উপনিবেশমুক্তির সুদীর্ঘ ও বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে পূর্ববঙ্গ বা আজকের বাংলাদেশের ভূমিকা উজ্জ্বল। ইতিহাসের পূর্ণতা ঘটে তখনই, যখন আঞ্চলিক বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো কেন্দ্রীয় অধ্যায়ের সঙ্গে পঠিত হয়। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের সঠিক ইতিহাস জানতে ইউ তিড়ৎ সিংসহ সব বীরের জীবন ও সংগ্রাম গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত।
হারুন হাবীব: মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
hh1971@gmail.com