আজ ১২ জুন। পাহাড়ের সংগ্রামী কল্পনা চাকমার অপহরণের দিন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন নিজ বাড়ি থকে অপহৃত হন তৎকালীন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমা। কিন্তু আমরা জানি না- বিশ্বজুড়ে আলোচিত এই অপহরণের কেন বিচার হলো না। ২৬ বছর আগে অপহরণের শিকার হন কল্পনা।

বিএনপি একবার এবং আওয়ামী লীগ চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসে, কিন্তু এই অপহরণের কোনো বিচার হয়নি।

এটি বলাতে কোনো রকম দোনামোনা ভাব থাকা উচিত নয় যে, কল্পনার অপহরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানাভাবে ছাপ ফেলেছে। তার মধ্যে তিনটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে পাহাড়ে নারী নিপীড়ন তথা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দাপটকে স্পষ্ট করে। স্পষ্টত বোঝা যায়, এ কারণেই ২৬ বছর পরও তার অপহরণের কোনো কূলকিনারা হয়নি। এখনও হচ্ছে পাহাড়ে নারী নিপীড়ন। প্রতিনিয়তই এগুলো নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে। 'উন্নয়ন'-এর জোয়ারে ঢেকে যাচ্ছে পাহাড়। সাজেক না গেলে অনেকেরই এখন 'মর্যাদা' থাকে না। কিন্তু কল্পনা চাকমাকে নিয়ে কেউ আর কথা বলেন না। দীর্ঘ ২৬ বছরে মাঝখানকার ক্ষতি- আশার জায়গা থেকে ফসকে পড়ে গেল কল্পনা অপহরণ মামলাটি। মামলাটি আরও তিন বছর আগেই ক্লোজড ঘোষণা করেছে সরকার। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ঘটনার সাক্ষী এবং কোনো ধরনের আলামত না থাকায় মামলাটি ক্লোজ করা হয়েছে। কিন্তু সে সময় সবাই জানে যে, কল্পনাকে তাঁর বাড়ি থেকে তাঁর ভাই এবং মায়ের সামনে থেকেই তুলে নেওয়া হয়েছে এবং তাঁর ভাইয়েরা তাঁর সঙ্গে অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েছিল। সেগুলো গায়েব করে ফেলা হয়েছে। মেয়ে অপহরণের বিচার না দেখেই চলে গেছেন কল্পনার মা। পাহাড়ের বুকে এখন 'ম্যারিয়েট' হোটেল, কিন্তু নেই কল্পনা। তাদের আগেই উপড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, কল্পনাই সম্ভবত পাহাড়ি নারীদের মধ্য প্রথম, যাঁর অপহরণ আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত হয়েছে এবং মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের জাতীয় নারী আন্দোলন ও পাহাড়ের নারীদের আন্দোলনের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপিত হয়। বিশেষ করে কল্পনার অপহরণ বাংলাদেশের নারী আন্দোলনে আদিবাসী নারী নিপীড়নের বিষয়টি যুক্ত করতে ভাবনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। বলতে দ্বিধা নেই, এর আগ পর্যন্ত আদিবাসী নারীদের বিষয় একেবারেই গুরুত্বহীন এবং অবহেলিত ছিল 'মূলধারা'র নারী আন্দোলনে এবং নারী আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আদর্শে প্রভাবান্বিত ছিল। তাই এই অপহরণ প্রথমবারের মতো নারী আন্দোলনে পাহাড় এবং সমতলের নারীদের যুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে। কল্পনা তাই এখন শুধু পাহাড়ের জন্যই প্রতিবাদের স্মারক নন; বাংলাদেশের নারী আন্দোলন তথা নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক। আমরা কল্পনার রক্ত বহন করে চলেছি। তৃতীয়ত, পাহাড়ের নারী হিসেবে কল্পনা চাকমা এখন পুরো বাংলাদেশের নারী নিপীড়নের প্রতীক হিসেবে উঠে আসে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শান্তিচুক্তির পাহাড়ে স্বায়ত্তশাসনের জন্য দীর্ঘ লড়াই এবং তার পরিণতিতে অপহরণের শিকার হওয়া কল্পনা চাকমার বিষয়ে সে সময় অনেকটাই চুপ ছিলেন পাহাড়ি নেতারাও। এমনকি শান্তিচুক্তিতে পাহাড়ে নারী নিপীড়ন নিয়ে কোনো ধারাও রাখা হয়নি।

এখন কল্পনা অনেকটাই সীমিত তাঁর অপহরণ দিবসের স্মরণ হিসেবে। এর বাইরে কল্পনাকে নিয়ে আর কিছু হয় না। বলার অপেক্ষা রাখে না, কল্পনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছিল। এ কারণেই রাজনৈতিক সংগঠক কল্পনা তখনই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর নিজ সমাজের পুরুষতান্ত্রিক চরিত্রকে। আরও বুঝতে পেরেছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদী শত্রুর সঙ্গে পুরুষতন্ত্রের এক অসীম ক্ষমতার বোঝাপড়াকে।

পাহাড়ে থামেনি নিপীড়ন। ভেঙেছে শরীরে, রাজনীতিতে। ভেঙেই ক্ষান্ত হয়নি; আঞ্চলিক দলগুলো বিভক্ত হয়েছে নানাভাবে। নতুন নতুন নিপীড়নের কৌশল পাহাড়ে দৃশ্যমান। পাহাড়ে এখন আর শত্রু-মিত্র নির্ধারিত নয়। মাঝখানে শুধু কল্পনা অপহরণের মামলাটির ইতি টানা হয়েছে। কল্পনার অপহরণ বেশ কিছু দিককে বুঝতে সহায়তা করেছে। কেন তাঁকে অপহরণ করা হলো; কারা করল- সে প্রশ্নের উত্তর আজ এত বছর পরও কারও অজানা থাকার কথা নয়। তবু বাংলাদেশ রাষ্ট্র যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন আমাদের বলে যেতে হবে কল্পনার অপহরণের কথা। কারণ, বিশ্বাস করি নিপীড়নের ইতিহাস মানুষকে মনে রাখতে হয় এবং এর মধ্য দিয়েই টিকে থাকে রাজনৈতিক ইতিহাস।

কল্পনা চাকমা কেন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ? কেন কল্পনার লড়াইয়ের স্মৃতি আমাদের জিইয়ে রাখতে হবে? কারণ খুবই স্পষ্ট। কল্পনার লড়াই, সংগ্রাম ও অপহরণের ঘটনা যদি হারিয়ে ফেলি, তাহলে আমরা আসলে দূরে সরে যাব পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়নের ইতিহাস থেকে। তাই অপহরণ মামলা মরে গেলেও কল্পনাকে মনে রাখতে হবে স্লোগানে, জীবনযাপনে।

সরকারিভাবে ক্লোজড হয়েছে কল্পনার অপহরণ মামলা। কিন্তু তাতে কি কল্পনাকে জানা থেমে থাকবে? নিশ্চয়ই নয়। বাংলাদেশে কল্পনা চাকমাকে পাঠন-পঠন খুব জরুরি। কেন জরুরি? কেন আমাদের বারবার কল্পনা এবং তাঁর অপহরণকে মনে রাখতে হবে? কেন যুগ যুগ ধরে কল্পনাকে জিইয়ে রাখতে হবে? কারণগুলো একেবারেই স্পষ্ট। আমাদের মনে রাখতে হবে, কল্পনা যদি এ দেশের নিপীড়নের ইতিহাসের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায় তাহলে হারিয়ে যাবে এ দেশের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসও। রাষ্ট্র, সরকার হয়তো চাইবে কোনো কোনো লড়াইয়ের ইতিহাস বিস্মৃত হোক। কারণ এটাই স্মৃতি-বিস্মৃতির রাজনীতি। কিন্তু তার বিপরীতে আমরা চাই কল্পনা শুধু ১২ জুনের পাঠ নয়; কল্পনা ইতিহাসের টেক্সট হয়েই সব সময় সব লড়াই-সংগ্রামে আমাদের অংশ হয়ে থাকবে। কল্পনা আমাদের স্মৃতি-বিস্মৃতির রাজনীতির অংশ নয়। কল্পনা আমাদের নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনের মশাল।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
zobaidanasreen@gmail.com