টেক্সাসে যেভাবে গুলিতে গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে, এটি যেন সাধারণ ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা আমাদের খুব পরিচিত বটে, কিন্তু প্রতিটি ঘটনাই নারকীয় ভয়াবহতার জন্ম দেয়। এ ঘটনা ৫৬ বছর আগের টেক্সাস টাওয়ারে গুলি করে হত্যার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় বন্দুকধারীর গুলিতে ১৮ জন প্রাণ হারায়। আর মঙ্গলবার টেক্সাসের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গুলিতে ১৯ শিক্ষার্থীসহ ২১ জন প্রাণ হারায়। ২০১৯ সালে টেক্সাসে এল পাসোতে ওয়ালমার্ট শপিংমলের কাছে হিস্পানিকদের লক্ষ্য করে গুলিতে ২৩ জন নিহত হয়। এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গুলি করে হত্যার ঘটনার পরিসংখ্যান অনেক বড়। ২০১৮ সালে টেক্সাসেই একটি চার্চে বন্দুকধারীর হামলায় নিহত হয় ২৬ জন। ১৯৯১ সালে রেস্টুরেন্টে হামলায় প্রাণ হারায় ২৪ জন। সেনা ঘাঁটিতে ২০০৯ ও '১৪ সালে দুই দফা হামলায় যথাক্রমে ১৩ ও ৪ জনের প্রাণ হরণ করে ঘাতক। ২০১৮ সালে হাই স্কুলে বন্দুকধারী ১০ জনের প্রাণ হরণ করে। ২০১৯ সালে ওডেসা-মিডল্যান্ড সড়কে পুলিশকে লক্ষ্য করে চালকের গুলিতে নিহত হয় সাতজন। ২০১৬ সালে ডালাসে সড়কে গুলিতে পাঁচজন প্রাণ হারায়।

মঙ্গলবার গুলির ঘটনায় নিহত অধিকাংশের নাম এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, তাদের মাত্র দু'দিন পরই স্কুলের এ বছরের সেশন শেষ হতো। আমরা জানি, কভিড-১৯ এর সময় এসব শিশু আইসোলেশনে থেকে বাড়িতে বসেই লেখাপড়া করেছে। টেক্সাসে উভালদের যে ক্যাম্পাসে এই গুলির ঘটনা ঘটে, সেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীই হিস্পানিক। সেখানকার ৫ ভাগের ৪ ভাগ শিক্ষার্থীই অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া। তারা নিশ্চয় দিনটিতে অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীর মতো হেসেখেলে কাটাচ্ছিল। তাদের জন্য কী বিপদই না অপেক্ষা করছিল!

এতটি নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু আমাদের বেদনার আকাশে আরেকটি কালো দাগ ফেলেছে। এর পরও দেখা গেল রুটিন শোক, ক্ষোভের প্রকাশ ও শেষ পর্যন্ত নিষ্ফ্ক্রিয়তা। গুলি করা সম্পন্ন হওয়ার পর পরিচিত সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি আমরা দেখলাম। সংবাদ সম্মেলনে টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট বন্দুকধারীর তথ্য জানান। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে যেসব পরিবার, তাদের প্রতি শোক প্রকাশ করে বলেন, 'যখন কোনো অভিভাবক তাঁর সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেন, তখনই তাঁরা প্রত্যাশা করেন- স্কুল শেষ হওয়ার পর সন্তানদের আবার ফিরিয়ে নিতে পারবেন।' অ্যাবট আরও বলেন, 'কেবল সন্তান হারানো পরিবারই এখন শোক করছে তা নয়, তাদের শোকে পুরো টেক্সাস রাজ্য শোকাহত।'

ইতিহাস যদি সত্য হয়ে থাকে, আগামী কিছুদিন হয়তো আমরা বিভাজনের কাদা ছোড়াছুড়ি দেখব। মঙ্গলবার পর্যন্ত রাজ্যের প্রশাসক এই বলে সতর্ক করেন, টেক্সাসের মানুষের উচিত স্কুলগুলোকে শিশুদের জন্য নিরাপদ ভাবা। কিন্তু এখনকার বাস্তবতায় তারা বলছে, সমাজে আমাদের কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি, যাতে এ ধরনের বর্বরতা আর কখনও না ঘটে। কিন্তু এরই মধ্যে দলীয় বিভাজনের প্রকাশ ঘটেছে। গুলি করে হত্যার এ ঘটনার পর তার প্রতিক্রিয়ায় আমরা দেখেছি। টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে ফোনে সান্ত্বনা দেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। তিনিও ডেমোক্র্যাটদের সম্মিলিত দাবির সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন- বন্দুকের এই বাড়বাড়ন্ত অবস্থায় আমাদের কিছু করতেই হবে। তিনি বলেছেন, টেক্সাস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আবার গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। কী সুন্দর বাচ্চাগুলো, যারা দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত! নিষ্পাপ এই বাচ্চাদের প্রাণ হরণ করা হলো! জাতি হিসেবে আমাদের জিজ্ঞেস করতে হবে- ঈশ্বরের নামে আমরা কখন এই 'গান লবি'র বিরুদ্ধে দাঁড়াব? বলার অপেক্ষা রাখে না, জো বাইডেন বন্দুকের নতুন আইনের পক্ষে।


যদিও এটি অনিঃশেষ যুদ্ধের আরেক হাতিয়ার। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক যে মতদ্বৈধতা, সেটিই টিকে রইল। অনেকে বলেছেন, এই ভয়ানক ট্র্যাজেডি অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় আমেরিকায় বেশি ঘটছে। আমেরিকায় বন্দুকের অবাধ স্বাধীনতার কারণে এটা ঘটছে। তা ছাড়া আমেরিকার অন্য কিছু জায়গার চেয়ে টেক্সাসে বন্দুক সহজে পাওয়া যায়। টেক্সাসে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে বন্দুক কিনে রাস্তায় কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই তা বহন করা যায়। প্রশিক্ষণ তো আরও দূরের বিষয়।
অন্যদিকে এ ধারণা বদ্ধমূল- এখানে অনেক দুষ্ট লোক রয়েছে, যারা যে কোনো সময় খারাপ কিছু ঘটাতে পারে এবং সরকারের কোনো পদক্ষেপেই তাদের থামানো সম্ভব নয়। কেবল বন্দুকই তাদের থামাতে পারে। ফলে ভালোমানুষদের থেকে বন্দুক কেড়ে নেওয়া মানে তাঁদের অধিকার হরণ করা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর টেড ক্রাজ বন্দুক হামলার পর কয়েক ঘণ্টার পদক্ষেপ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, 'আমরা দেখছি, এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের পর রাজনীতিবিদরা ঘটনাটি রাজনীতিকীকরণ করার চেষ্টা করেন। আপনি ডেমোক্র্যাটদের এবং সংবাদমাধ্যমে কিছু মানুষকে দেখবেন, এ সমস্যার সমাধানে অনেকে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার সীমিত করে ফেলতে চায়। কিন্তু তা কাজের নয়।'

যা হোক, উভালদে স্কুলের বন্দুকধারী সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানার বিষয় রয়েছে। তার মতলব কী ছিল এবং তাকে এ কাজ থেকে ফেরাতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেত। এখনও অনেক কিছু দেখার আছে। শোক মাত্র শুরু। কিছু অভিভাবক হয়তো বিষাদে পিছু হটবেন। অন্যরা পরিবর্তনের জন্য জোরাজুরি করবেন, যেন ভবিষ্যতে কাউকেই এই ভয়ানক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে না হয়। ফ্লোরিডার মার্জরি স্টোনমেন ডগলাস হাই স্কুলে এমন বন্দুকধারীর হামলার ঘটনায় কানেক্টিকাট নিউটনের কিছু শিক্ষার্থীর অভিভাবক তা-ই করেছিলেন।

২০১৯ সালে টেক্সাসের এল পাসোর বর্ণবাদী হামলার পর গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ওই ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে গোলটেবিল আলোচনায় বলেছিলেন, 'এ ধরনের অপরাধ যেন আর না ঘটে, সে জন্য আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি।' ওই সময় বন্দুক সীমিতকরণেরও কিছু বিষয় আলোচিত হয়।
ওই আলোচনার শেষ মুহূর্তে এল পাসোর ডিস্ট্রিক্ট প্রতিনিধি জো মুডি আইনপ্রণেতাদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আমি অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছি। শেষ পর্যন্ত বন্দুক আইন শিথিলকরণের বিষয়টিই টিকে রইল। তাঁর ভাষায়, 'এখন আমাদের অন্ধ চোখ খোলার সময়। নতুবা মানুষ তাদের চোখ খুললে সেটা হবে দুঃখজনক।' আর মুডি মঙ্গলবার বলেছিলেন, 'আজ উভালদেতে বন্দুক দিয়ে যে বর্বরতা সংঘটিত হয়েছে, আগামীকাল তা অন্য জায়গায় হবে। তিন বছর আগে যেমনটি এল পাসোতে হয়েছে।'
ম্যাথু ওয়াটকিনস: টেক্সাস ট্রিবিউনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক; সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইট থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক