বর্তমান সময়ে মানুষের জীবন কতটা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর তা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন নেই। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই আজ বিজ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন যুগ বহুবার এসেছে যখন শুধু খাদ্যের অভাবে একটা জনপদ মানবশূন্য হয়ে পড়েছে; খাদ্যের অন্বেষণে মানুষ জন্মস্থান ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছে; এ নিয়ে স্থানীয় ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে। যার ফলে শুধু মূল্যবান মানবপ্রাণই কাতারে কাতারে ঝরে যায়নি; কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোটা সভ্যতাই ধ্বংস হয়েছে। একটা রোগের কারণে গোটা নগর উজাড় হয়ে গেছে; মানব ইতিহাসে এমন নজিরও কম নেই। অতীতের বহু জাতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে। মানব জাতিকে সেই 'অভিশপ্ত' জীবন থেকে মুক্তি দিয়েছে বিজ্ঞান। আজকের দিনে সেই দেশ বা জাতি অর্থনীতি-সমাজনীতি-সংস্কৃতি বা যে কোনো বিচারে সবচেয়ে উন্নত, যে দেশ বা জাতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিচর্চায় সবচেয়ে অগ্রসর। ফলে বিজ্ঞানচর্চায় আগামী দুই দশকের মধ্যে একটা উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। আর এ কথারই যেন প্রতিধ্বনি শোনা গেল শুক্রবার বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড (বিডিবিও) ও সমকালের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জীববিজ্ঞান উৎসবের জাতীয় পর্বের অনুষ্ঠানে দেওয়া অতিথিদের বক্তৃতায়।

দেশের ১২টি অঞ্চলে ইতোপূর্বে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের নিয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দানকালে শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেছেন, জীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বিশেষ শিক্ষা নিতে হবে। শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এ দেশের উন্নয়ন হবে না। এ জন্য বিজ্ঞান ভবন ও গবেষণাগার নির্মাণের পাশাপাশি প্রায়োগিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। অনুষ্ঠানে উদ্বোধকের বক্তব্য প্রদানকালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিল আফরোজ বেগম জীববিজ্ঞানসহ সব ধরনের বিজ্ঞানের গবেষণা বাড়ানোর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, করোনা মহামারির সময়ে আমরা বুঝেছি এ ধরনের গবেষণা কতটা জরুরি। সত্যিই, মারাত্মক প্রাণঘাতী করোনা জীবাণু গত দু'বছর দুনিয়াব্যাপী যে সংকটের জন্ম দিয়েছিল; মানব জাতি গত একশ বছরে তা দেখেনি। আজকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত দেশগুলোতে যে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ম্ফীতির খÿ নেমে এসেছে তা ওই অণুজীবেরই মুহুর্মুহু আক্রমণের ফল। আশঙ্কা ছিল, এ অতিমারি আরও বহুদিন টিকে থাকবে। সেই সঙ্গে শুধু আক্রান্ত দেশগুলোর অর্থনীতিকেই বিপর্যস্ত করবে না; বিশ্বব্যাপী চরম খাদ্য সংকটেরও জন্ম দেবে। যার ফলে শুধু অনাহারেই মারা যাবে লাখ লাখ মানুষ। তবে আশার কথা, মানুষ ওই অতিমারিকে ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং তা করা হয়েছে বিজ্ঞানের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত হাতিয়ারকে কাজে লাগিয়ে।

এ কথাটা দুঃখজনক হলেও সত্য, বিজ্ঞানের এমন গুরুত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিজ্ঞানচর্চায় এখনও খুব একটা অগ্রগতি ঘটাতে পারেনি। দক্ষ শিক্ষক ও উপযুক্ত অবকাঠামোর ঘাটতি এর পেছনের প্রধান কারণগুলোর অন্যতম হলেও এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ না থাকাও এর জন্য কম দায়ী নয়। আর এখানেই জীববিজ্ঞান উৎসবের মতো আয়োজনগুলোর গুরুত্ব। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় দেশের একেবারে প্রত্যন্ত এলাকার তরুণ-তরুণীরাও অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এ সুযোগ তাঁদের বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহী করে তোলে, যে বিষয়ে অভিজ্ঞতা থেকে আমরা হলফ করে বলতে পারি, অনেক ক্ষেত্রে একাডেমিক কার্যক্রমও ব্যর্থ হয়। এ ধরনের প্রতিযোগিতাই বিভিন্ন এলাকার বিজ্ঞান শিক্ষার্থীকে পরস্পর মেলবন্ধন ঘটানোর সুযোগ দেয়। এমনকি বিশ্বপরিসরেও নিজেদের মেধার ঝলক দেখানোর সুযোগ তৈরি করে দেয়। এভাবে বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যে বিজ্ঞানমনস্কতা সৃষ্টি হয়, তা অন্ধকারের অপশক্তির বিরুদ্ধে একটা দেশের লড়াইয়ে যে শক্তি জোগায়, তা-ই বা কে অস্বীকার করবে! ফলে এ ধরনের আয়োজনে যুক্ত হয়ে সমকাল যুগের দাবিই মেটাচ্ছে।

যা হোক, প্রতিবেদনমতে, 'ইয়েরেভানে বাংলার জয়গান' স্লোগান নিয়ে অনুষ্ঠিত শুক্রবারের প্রতিযোগিতা থেকে বিজয়ী চারজন আর্মেনিয়ায় অনুষ্ঠেয় ৩৩তম আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করবে। তারা সেখানে শুধু বিজয়ীই হবে না; বিশ্বের সঙ্গে আমাদের বিজ্ঞানচর্চার একটা সেতুবন্ধনও রচনা করবে- এমনটাই আমরা কামনা করি। আমরা তাদের আগাম অভিনন্দন জানাই।